কোনো কোনো প্লট কংক্রিটের দেয়াল গেঁথে কিংবা পুরনো ট্রাকের পেইন্ট করা টায়ার ঝুলিয়ে একে অন্যের কাছ থেকে দূরে সীমানা বানিয়েছে। বেশির ভাগ কুটিরের আবার বাড়তি অংশ বানানো হয়েছে আত্মীয়-স্বজনদের আশ্রয় দেয়ার জন্য। আবার বাতিল জিনিস রাখার কাজও দিব্যি চলে যাচ্ছে।
এখানকার এই মানুষগুলোকেই নিজের শ্রেণি কিংবা জাতির চেয়েও বেশি ভালবাসে মাইকেল। এদের জন্যই হাহাকার করে ওর হৃদয়। মুগ্ধ হয় এদের সামর্থ্য, সহিষ্ণুতা আর বেঁচে থাকার আকাঙ্খা দেখে।
কালো ল্যাব্রাডর কুকুর ছানার মতো সর্বত্র খেলে বেড়াচ্ছে শিশুদের দল।
মাইকেলের শ্বেতাঙ্গ চেহারা দেখে ধীর গতিতে এগোনো ভ্যানের পাশে পাশে দৌড়াতে থাকে কিশোর-কিশোরীর দল। “সুইটি! সুইটি!” মাইকেল’ও তৈরি হয়ে এসেছে পকেট ভর্তি সুগার ক্যান্ডি মুঠো মুঠো ছুঁড়ে দেয় জানালা দিয়ে। তরুণেরা প্রতিদিন শহরে কাজ করতে গেলেও বৃদ্ধ, বেকার আর মায়েদের দল এখানেই রয়ে যায়।
মোড়ে মোড়ে দল পাকিয়ে আড্ডা দিতে থাকা টিনএজারদের দিকে তাকিয়ে কষ্ট পায় মাইকেল। ভালোভাবেই বুঝতে পারে যে, জীবন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগেই এ মুখগুলো জেনে যায় ভালো কিছুর প্রত্যাশা করা ওদের সাজে না।
আর আছে গৃহকর্ম কিংবা ভেজা কাপড় দড়িতে ঝুলিয়ে দিতে ব্যস্ত নারীরা। কালো উঠানে তেপায়া পাত্রে তৈরি করছে ভূট্টার পরিজ। ধূলা আর চুনার ধোয়া একত্রে মিশে দীর্ঘস্থায়ী মেঘ জমে থাকে শহরতলীর উপরে।
চারপাশের এত দৈন্য দশা আর দারিদ্রতা সত্ত্বেও প্রায় প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি কোণা থেকে কানে ভেসে আসছে হাসি আর গানের শব্দ। উজ্জ্বল আর আনন্দমাখা হাসি দিয়েই একে অন্যকে অভ্যর্থনা জানায় সকলে। প্রাণখোলা এই আফ্রিকান হাসিমুখ দেখে অন্তর আর্দ্র হয়ে উঠে বেদনার ভারে।
মাইকেলের মনে হয়, গানই মূল প্রেরণাশক্তি জাগায় এই কৃষাঙ্গদের মাঝে। নিজেকে ওদেরই একজন ভাবতে ভালবাসে; বয়স, জাতি কিংবা সেক্স নয়, এদের প্রত্যেকেই তার বড় আপন।
“আমি তোমাদের জন্য কী করব বলল তো?” ফিসফিস করে নিজের কাছেই উত্তর জানাতে চায় মাইকেল। আমি যাই চেষ্টা করেছি ব্যর্থ হয়েছি। মরুভূমির বুকে বাতাসে চিৎকারের মতই হারিয়ে গেছে আমার সব প্রচেষ্টা।
একটা যদি কোনো রাস্তা খুঁজে পেতাম!”
হঠাৎ করেই গাড়ি উপরে যেতেই নিজের আসনে সিধে হয়ে বসল মাইকেল।
এগারো বছর আগে এখানকার ঘাসের জমিতে ছাগল চড়ে বেড়াতে দেখেছিল।
“নবস পাহাড়।” ওর বিস্ময় দেখে মিটিমিটি হাসছে ভ্যানের ড্রাইভার। “সুন্দর, না?”
যাত্রাপথের হাজারো কাটা অতিক্রম করে কেবল স্থির সংকল্প আর ধৈর্যের কল্যাণে একজন মানুষ যে কোথায় পৌঁছে যায় কল্পনা, করা যায় না। ড্রেকস ফার্মের এ অংশে বাস করে তেমনই কৃষাঙ্গ ব্যবসায়ী, ডাক্তার, উকিল আর সফল অপরাধী। যে বাড়ি তারা এখানে বানিয়েছে তা অনায়াসে শ্বেতাঙ্গদের স্যান্ডটন, লা লুসিয়া কিংবা কনস্টানশিয়ার মতো অভিজাত পাড়ার শোভা বর্ধন করতে পারত।
“দেখুন!” গর্বিত ভঙ্গিতে একের পর এক বাড়ি চেনাতে লাগল ভ্যানের ড্রাইভার। “বড় বড় জানালাঅলা গোলাপি বাড়িটাতে থাকেন জোশিয়া জুবু। সিংহের এমন হাড় বিক্রি করে যা আপনাকে ব্যবসা কিংবা আর্থিক কাজে সফলতা এনে দেবে। চোখের জন্য শকুনের চর্বির মলম। নতুন চারটা ক্যাডিলাক মোটর গাড়ির মালিক এই কবিরাজের ছেলেরা আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে।”
“আমাকেও তো তাহলে সিংহের হাড় নিয়ে যেতে হবে।”
মিটমিট করে হেসে ফেলল মাইকেল। গত চার বছরে মেইলে’র কারণে এত ক্ষতি হয়েছে যে বেজায় ক্ষেপে আছে নানা আর গ্যারি।
“এবারে ওই সবুজ ছাদ আর উঁচু দেয়ালঅলা বাড়িটা দেখুন। এখানে পিটার গোনিয়ামা বাস করে। উনার উপজাতির লোকেরা ক্যানাবিস উৎপন্ন করে। পাহাড়ের গোপন জায়গায় এগুলোর চাষ করে ট্রাকে করে পাঠিয়ে দেয় কেপ টাউন, ডারবান আর জোহানেসবার্গ। উনার আছে এত এত টাকা আর পঁচিশ জন স্ত্রী।”
পুরনো এবড়ো-থেবড়ো রাস্তা ছেড়ে ভ্যান এবার উঠে এলো মসৃণ নীল অ্যাসফাল্ট লাগানো বুলেভাদের উপর।
এরপর হঠাৎ করে বিলাসবহুল এক ম্যানশনের স্টিলের গেইটের সামনে এসে থেমে গেল গাড়ি। নিঃশব্দে ইলেকট্রিক গেইট খুলে যেতে ভেতরে সবুজ লনে ঢুকে গেল ভ্যান। পেছনে বন্ধ হয়ে গেল গেইট। মাঝখানে পাথরের ঝরণাঅলা একটা সুইমিং পুল দেখা যাচ্ছে। ওভারঅল পরিহিত দুই কুষাঙ্গ মালি কাজ করছে বাগানে।
হাল আমলের নকশা করা বিল্ডিংটাতে প্লেট-গ্লাস, পিকচার-উইনডো আর কাঠের কাজ সবই আছে। ড্রাইভার মূল চত্বরে গাড়ি পার্ক করতেই মাইকেলকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলেন দীর্ঘদেহী এক ব্যক্তি।
“মাইকেল!” রালেই তাবাকার সম্ভাষণ শুনে অপ্রস্তুত হয়ে গেল মাইকেল। লন্ডনে শেষ মিটিং এর চেয়ে সবকিছুই আলাদা মনে হল। রালেই’র মতো এত সুপুরুষ আর কখনো দেখেনি।
“সু-স্বাগতম।” চারপাশে চোখ বুলিয়ে–কুঁচকালো মাইকেল।
“এখানেও আপনি বেশ ঠাট-বাট নিয়েই চলেন দেখছি রালেই; নট ব্যাড!”
“এগুলোর কিছুই আমার নয়।” মাথা নাড়লেন রালেই। “পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই আমার নিজের নয়।”
“তাহলে কার?”
“প্রশ্ন, শুধু প্রশ্ন।” খানিকটা তিরস্কারের সুরে বলে উঠলেন তাবাকা।
