বৃহত্তর জোহানেসবার্গের বাণিজ্যিক আর খনি সমৃদ্ধ এই এলাকার চারপাশে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট শহর ড্রেকস্ ফার্ম, সোয়েটো আর আলেকজান্দ্রিয়া, সেখানে কেবল কৃষাঙ্গ উপজাতি গোষ্ঠীগুলোই বাস করে।
‘শেষবার কখন খেয়েছে?” বাচ্চাটার কাছে নম্রভাবে জানতে চাইল মাইকেল।
“গতকাল সকালে।”
নিজের ওয়ালেট খুলে পাঁচ অঙ্কের একটা ব্যাংক নোট বের করল মাইকেল। বাচ্চার ছোট্ট চোখ জোড়া একেবারে বিস্ময়ে থ।
মাইকেল হাত বাড়িয়ে দিতেই নোটটা ছোঁ মেরে নিয়ে হাচোড়-পাচোড় করে দৌড় লাগালো ছোট্ট ছেলেটা। ধন্যবাদ দিতেও দাঁড়াল না; ভয় পেল পাছে না যাতে ওর এই উপহার আবার ফিরিয়ে নেয় শ্বেতাঙ্গ লোকটা।
হা হা করে হেসে ফেলল মাইকেল আর তারপরই প্রচণ্ড রাগও হল। আধুনিক এই বিশ্বের আর কোনো দেশ কি আছে সেখানে ছোট্ট শিশুরাও রাস্তায় ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়? মনে ছেয়ে গেল হতাশা।
“একটু যদি কিছু করতে পারতাম!” অনুতপ্ত হয়ে ভাবতে গিয়ে এত জোরে সিগারেটে টান দিল যে পুরো এক ইঞ্চি পরিমাণ ছাই গড়িয়ে পড়ল। সাথে টাইয়ের উপর আগুনের ফুলকি বানিয়ে দিল ছোট একটা ফুটো।
এ সময়ে মেইন হাইওয়ে থেকে কারপার্কের দিকে মোড় নিল ছোট্ট নীল একটা ডেলিভারী-ভ্যান। এটাই সেই গাড়ি।
নির্দেশ মতো নিজের গাড়ির লাইট জ্বালালো মাইকেল। ভ্যানটা সোজা চলে এলো মাইকেলের গাড়ির সামনে। ভ্যালিয়ান্ট থেকে নেমে দরজা লক করে ভ্যানের দিকে এগোল মাইকেল। পেছনের খোলা দরজা দিয়ে উঠে বসল ভেতরে। ভ্যানের ভেতরে ভর্তি হয়ে আছে ঝুড়ি ভর্তি কাঁচা মাংসের প্যাকেট আর মৃত ভেড়া।
“এদিকে আসুন।” জুল ভাষায় ডাইভার নির্দেশ দিতেই ঝুলিয়ে রাখা ভেড়ার নিচ দিয়ে এসে দুটো মাংসের ঝুড়ির মাঝখানে বসে পড়ল মাইকেল। ইন্সপেকশনের সময় তাই ধরা পড়ার ভয় নেই।
“ব্যস, আর কোনো ঝামেলা হবে না।” জুলু ভাষায় নিশ্চয়তা দিল ড্রাইভার। “এই ভ্যানকে কেউ কখনো থামায় না।”
গাড়ি চলতেই নোংরা, আঘোয়া মেঝেতে বসে পড়ল মাইকেল। এ ধরনের নাটকীয় সাবধানতাগুলো বিরক্তিকর হলেও গুরুত্বপূর্ণ। টাউনশিপ ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিলের সাথে আলোচনা আর লোকাল পুলিশ স্টেশনের পারমিশন ছাড়া কৃষাঙ্গ শহরে যেতে পারে না কোনো শ্বেতাঙ্গ।
সাধারণভাবে এ ধরনের পারমিশন জোগাড় করা কঠিন না হলেও মাইকেল কোর্টনি বিখ্যাত পরিবারের সন্তান হওয়াতে ফ্যাকড়াটা বেঁধেছে। এছাড়াও পাবলিকেশন কন্ট্রোল অ্যাক্টের আওতায় তিন বার নিষিদ্ধ হয়ে মোটা অংকের ফাইল গুনেছে সে আর তার সংবাদপত্র।
কোনো রকম বাধা ছাড়াই ড্রেকস্ ফার্মের মেইন গেইট দিয়ে ভেতরে ঢুকে কেল নীল ভ্যান। আফ্রিকান লুডু খেলাতে ব্যস্ত কৃষাঙ্গ গার্ডেরা একবার চোখ তুলে তাকালো না পর্যন্ত।
“আপনি এবার সামনে আসতে পারেন।” ড্রাইভারের কথা শুনে মাংসের ঝুড়িগুলোর মাঝখান দিয়ে ক্যাবের প্যাসেঞ্জার সিটে চলে এলো মাইকেল।
এই শহরতলীগুলো ওকে সবসময়ই বিস্মিত করে। মনে হয় যেন কোন ভিনগ্রহে চলে এসেছে।
১৯৬০ সালে প্রথমবারের মতো পা রেখেছিল ড্রেকস্ ফার্মে; যেখান থেকে ফিরে গিয়ে লিখেছে “রেজ” সিরিজ। সাংবাদিক হিসেবে খ্যাতি প্রাপ্তি আর পাবলিকেশন কন্ট্রোল অ্যাক্টের হাতে নিষিদ্ধ হওয়া উভয়েরই শুরু তখন থেকে।
স্মৃতি মনে করতে করতে চারপাশ দেখতে লাগল মাইকেল। শহরতলীর প্রাচীন অংশটা দিয়ে এগিয়ে চলেছে নীল ভ্যান। আশপাশে গলির পর গলি, ভাঙ্গা চোড়া দালান, পলেস্তারা ওঠা বস্তির দেয়াল, লাল মরচে পড়া করোগেটেড টিনের ছাদ।
চিকন রাস্তাটার মাঝে মাঝেই উঁচু নিচু গর্ত। চড়ে বেড়ানো মুরগিগুলো বিষ্টাতে ভর্তি হয়ে আছে চারপাশ। দুর্গন্ধে টেকা দায়। আবর্জনা পঁচা গন্ধের সাথে মিশে গেছে খোলা ড্রেন আর মাটির টয়লেটের গন্ধ।
সরকারের স্বাস্থ্য পরিদর্শক বহু আগেই ড্রেকস্ ফার্মের পুরাতন অংশের সাফ সুতরো করার আশা ছেড়ে দিয়েছে। কোনো একদিন বুলডোজার এসে সব গুঁড়িয়ে দেবে আর মেইলের প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হবে ভয়ংকর মেশিনটার দিকে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকা কৃষাঙ্গ পরিবারগুলোর ছবি। ডার্ক স্যুট পরিহিত কোনো সিভিল সার্ভেন্ট স্টেট টেলিভিশন নেটওয়াকে জানাবে “স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে তৈরি নতুন আরামদায়ক বাংলোর” কথা। সেদিনটার কথা কল্পনা করেই রাগে ফুঁসতে লাগল মাইকেল।
এরপর ভ্যান নতুন অংশে ঢুকতেই ফ্রান্সের সামরিক সমাধি ক্ষেত্রের কথা মনে পড়ে গেল। বৃক্ষহীন প্রান্তরে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে ছাই রঙা করোগেটেড অ্যাসবেস্টস ছাদ লাগানো হাজার হাজার ইটের বাক্স।
তারপরেও, কেমন করে যেন নিজেদের রঙচটা জীবনের খানিকটা রঙের ছোঁয়া নিয়ে এসেছে এলাকার কৃষাঙ্গ অধিবাসীরা। এখানে-সেখানে লাগানো গোলাপি আকাশী নীল আর জমকালো কমলা, আফ্রিকার উজ্জ্বল রঙ প্রীতিকেই মনে করিয়ে দেয়। এরকমই একটা বাড়িতে উত্তরের নেডেবল উপজাতির প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী সুদৃশ্য জ্যামিতিক নকশা দেখতে পেল মাইকেল।
সামনের ছোট্ট বাগানটাতে ফুটে আছে বাড়ির বাসিন্দার ব্যক্তিত্ব। কোনটাতে একেবারে রুক্ষ ধূলিমলিন মাটি; কোনটাতে ভূট্টা গাছের সাথে সাথে দুধ দেয়া ছাগলও চড়ে বেড়াচ্ছে। কোনোটাতে আবার জিরেনিয়াম লতা: আরেকটাতে তো আগাছা ভরা বাগানে ভয়ংকর দর্শন কুকুর গার্ডও চোখে পড়ল।
