সাথে সাথে কোনো উত্তর দিল না মাইকেল।
“সত্যি।” মনে মনে নিজেকে বোঝাল বেলা, “নিকি আমাদের মাঝে আর নেই।” কিন্তু কিছুই করার নেই। বাধ্য হয়েই এমনটা করছে বেলা।
“কিভাবে?” মাইকেলের প্রশ্নটা তো প্রথমে বুঝতেই পারল না।
“খাওয়াতে গিয়ে দেখি যে ঠাণ্ডা হয়ে আছে।”
বোনের দিকে তাকিয়ে কেঁপে উঠল মাইকেল, “ওহ্ ঈশ্বর! কী বলছ বেলা? কী ভয়ংকর!”
বাস্তবটা তার চেয়েও বেশি নিষ্ঠুর আর ভয়ংকর; কিন্তু মাইকেলকে তা বলার কোনো উপায় নেই।
দীর্ঘ একটা মুহূর্ত কেটে যাবার পর মাইকেল আবারো জানতে চাইল, “রামোন? ও কোথায়? ওর তো এখন তোমার পাশে থাকার কথা ছিল।”
“রামোন” নামটা আউরাতে গিয়ে কণ্ঠের ভয় লুকাতে চাইল বেলা।” নিকি চলে যাবার পর রামোন পুরোপুরি বদলে যায়। আমাকেই দোষারোপ করে সবকিছুর জন্য। নিকি’র সাথে সাথে আমার জন্য ওর ভালোবাসাও মরে গেছে।” বহুদিন ধরে জমিয়ে রাখা কান্না এবারে বেরিয়ে এলো অঝোর ধারায়। “নিকি নেই, রামোন নেই। আমি আর কোনোদিন ওদেরকে দেখব না।”
বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মিকি। এরকম একটা নির্ভার আশ্রয়ই প্রয়োজন ছিল।
বহুক্ষণ বাদে কথা বলতে পারল মাইকেল। ভালোবাসার, যন্ত্রণা, আশা; একাকীত্ব আর সবশেষে মৃত্যু নিয়ে অনেক সুন্দর সব কথা শোনাল মাইকেল।
ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল বেলা।
ভোরের আগে ঘুম ভেঙে যেতেই দেখে যে একইভাবে বসে আছে মাইকেল; যেন বেলার ঘুম না তুটে যায়।
“থ্যাঙ্ক ইউ, মিকি। আমি যে কতটা একা ছিলাম।”
“আমি জানি বেলা। জানি একাকীত্ব কাকে বলে।” বুঝতে পারল এবারে ভাইকে সান্ত্বনা দেয়ার পালা এসেছে। বেলা তাই বলে উঠল, “তোমার নতুন বইয়ের কথা বলো মিকি। আমি আসলে এখনো পড়ি নি। সরি।”
“আমি রালেই তাবাকা’র সাথে কথা বলেছি।” হঠাৎ করে মাইকেলের মুখে নামটা শুনে অবাক হয়ে গেল বেলা।
“কোথায়? কোথায় দেখা করেছ?”
মাথা নাড়ল মাইকেল। “আমি দেখা করি নি। ফোনে খানিক কথা বলেছি। মনে হয় অন্য কোন দেশ থেকে ফোন করেছিলেন, কিন্তু শীঘ্রিই দেশে ফিরবেন। ছায়ার মতই বর্ডার পারাপার করেন।”
“দেখা করার ব্যবস্থা করেছ?”
“হ্যাঁ, নিজের কথা রাখতে জানেন লোকটা।”
“সাবধানে, মিকি। প্রমিজ করো যে নিজের খেয়াল রাখবে। উনি অনেক ভয়ংকর।”
“চিন্তা করো না।” বোনকে আশ্বস্ত করল মাইকেল। “আমি তো শন কিংবা গ্যারির মতো হিরো নই। প্রমিজ করছি সাবধানে থাকব।”
***
জোহানেসবার্গ টু-ডারবান মেইন হাইওয়ের পাশের একটা রেস্টোরেন্টে গাড়ি। থামাল মাইকেল কোর্টনি।
ইগনিশন সুইচটা বন্ধ করলেও খানিক সময় লাগত পুরোপুরি স্তব্ধ হতে। সতুর হাজার মাইল পথ পাড়ি দেয়া গাড়িটা আরো দুই বছর আগে বিক্রি করে দেয়া উচিত ছিল।
ডেপুটি এডিটর হিসেবে প্রতি বারো মাসে নতুন লাক্সারী কার পাবার কথা থাকলেও পুরনো ভাঙ্গা-চোড়া ভ্যানিয়ান্টের মায়া কিছুতেই ছাড়তে পারে না মাইকেল।
কার পার্কের অন্য গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকে দেয়া বর্ণনার সাথে মেলাতে চাইল। না, কাক্ষিত গাড়িটা নেই। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝল বিশ মিনিট আগেই পৌঁছে গেছে। তাই সিগারেট ধরিয়ে গাড়ির সিটে গা এলিয়ে বসে রইল।
নিজের গাড়ি আর ঘড়ির কথা ভাবতে গিয়ে মনে মনে হেসে ফেলল মাইকেল। কোর্টনি পরিবারের মধ্যেও আসলেই বেমানান। নানা থেকে শুরু করে বেলা সকলেই কেবল পার্থিব সম্পত্তি নিয়ে ব্যস্ত। নানা প্রতি বছর নতুন মডেলের ডেইমলার কেনে; বাবা ক্লাসিক কার বিশেষ করে রেসিং গাড়ি কিনে ভর্তি করে ফেলেছে গ্যারাজ। গ্যারি ফেরারি, ম্যাজেরাতি আর শন্ নিজের টা-গাই ইমেজ রক্ষার জন্য চালায় ফোর হুইল ড্রাইভ হান্টিং ভেহিকেল। এমনকি বেলা’র গাড়িও নতুন ভ্যালিয়ান্টের ডাবল দামি হবে।
“বস্তু”, ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে ভাবল মাইকেল, “সবাই কেবল বস্তুটাকেই দেখে, ব্যক্তিকে নয়। এটাই এদেশের প্রধান অসুস্থতা।”
গাড়ির পাশের জানালায় টোকা দেয়ার শব্দ শুনে আশা নিয়ে তাকাল মাইকেল।
কিন্তু কেউ কোথাও নেই।
অবাক হয়ে গেলেও আবার এগিয়ে এলো ছোট্ট কালো একটা হাত।
জানালার কাঁচ নামিয়ে মাথা বের করে দিল মাইকেল। ছেঁড়াফাড়া শাটস গায়ে। খালি পায়ে দাঁড়িয়ে হাসছে বছর পাঁচ কি ছয়েকের একটা কৃষাঙ্গ শিশু। নাকের নিচে সর্দি শুকিয়ে থাকলেও হাসিতে একেবারে ঝলমল করছে চারপাশ।
“প্লিজ” ভিখারীর মতো হাত বাড়িয়ে বলে উঠল, “আমার অনেক ক্ষুধা পেয়েছে। প্লিজ এক সেন্ট দিন!”
মাইকেল দরজা খুলতেই অনিশ্চিত ভঙ্গিতে সরে গেল বাচ্চাটা। সিটের উপর থেকে নিজের কার্ডিগান নিয়ে ছেলেটার মাথায় পরিয়ে দিল মাইকেল।
দেখা গেল পা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে কার্ডিগান। জানতে চাইল, “কোথায় থাকো তুমি?”
শ্বেতাঙ্গ একজনের এই ব্যবহার পেয়ে আর তার মুখে নিজের ভাষা ‘জোসা’ শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল শিশুটা। ছয় বছর আগে যখন থেকে মনে হয়েছে যে আপন ভাষা ব্যতীত কারো কাছে পৌঁছানো অসম্ভব তখন থেকে এ ভাষা শিখছে মাইকেল। এখন সে জোসা আর জুলু দু’ভাষাতেই অনর্গল কথা বলতে পারে।
“ড্রেস ফার্মে থাকি, নকোসী।” এলোমেলো ভাবে গড়ে উঠা এ শহরটাতে না হলেও এক মিলিয়ন কৃষাঙ্গ বাস করে। প্রতিদিন বাস কিংবা ট্রেনে চড়ে উইটওয়াটার স্ট্রান্ডের শ্বেতাঙ্গ এলাকায় যায় শ্রমিকের কাজ করার জন্য।
