হেসে, খেলে, নানা আর পুরনো বন্ধুদের সাথে দিন কাটালেও কিছুতেই কাটতে চায় না একাকী দীর্ঘ রাত। একেক বার মাঝরাতে মনে হয় বাবার কাছে গিয়ে সব খুলে বলে; কিন্তু দিনের বেলা মনে পড়ে : “বাবা’ই বা কি করতে পারবে? আমাকে কেউ সাহায্য করতে পারবে না।” মনে পড়ে যায় পানির নিচে নিকি’র নাক থেকে বেরিয়ে আসা রুপালি বুদবুদগুলোর কথা। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো সময়ের সাথে সাথে আরো বেড়ে যাচ্ছে এই বেদনা মনে হচ্ছে সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।
আর এরপরই শুনতে পেল যে মাইকেল জোহানেসবার্গ থেকে ওয়েন্ট্রেদ্রেদেন আসছে। একমাত্র ওর সাথেই সবকিছু শেয়ার করতে পারবে বেলা। জানে মিকি কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।
মাইকেলের আসার আগের শুক্রবারে আবারো ক্যাম্পস বে’তে বক্স চেক করতে গিয়েছিল। সন্ধ্যায় ছয়টা বেজে যাওয়াতে পোস্ট অফিসের মেইন বিল্ডিং ছুটি হয়ে গিয়েছিল। এক জোড়া টিন এজার হলে থাকলেও ইসাবেলাকে দেখে অপরাধীর ভঙ্গিতে দূরে সরে গিয়েছে ছেলে-মেয়ে দুটো। যাই হোক, কখনো কারো সামনে নিজের বক্স খোলে না বেলা।
পঞ্চম সারির নিজের বক্সের ছোট্ট স্টিলের দরজার তালাতে চাবি ঢুকাতেই কেঁপে উঠল সারা শরীর।
সবসময়কার মতো এবারেও খালিই দেখবে ভেবেছিল। নিঃশ্বাস আটকে মরে যাবার জোগাড় হলো।
মোটা বাদামি খামটাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়েই কাঁধের ঝোলা ব্যাগে রেখে দিল বেলা। আর তারপর প্রায় চোরের মতো করে হেঁটে হেঁটে চলে এলো পার্ক করে রাখা মিনির কাছে। হাত এতত কাঁপছে যে গাড়ির দরজাও খুলতে পারছে না।
পাম গাছের সারির নিচে সৈকতের উপরে পার্ক করল গাড়ি। এই সময়ে বী প্রায় পুরোটাই খালি।
গাড়ির সব জানালা নামিয়ে দরজাগুলো লক করে বাদামি খামটাকে বের করে কোলের উপর রাখল বেলা।
ট্রাফালগার স্কোয়ার পোস্ট অফিসের স্ট্যাম্প লাগানো খামটা খুলতেও যেন ভয় হচ্ছে। না জানি ভেতরে কী আছে! ফিরতি ঠিকানার জায়গায় কিছুই লেখা নেই। দেরি করার জন্যই ধীরে ধীরে ব্যাগ থেকে পেননাইফ বের করে চোখা মাথা দিয়ে খুলে ফেলল খামের মুখ।
রঙিন একটা ছবি গড়িয়ে পড়তেই কেঁপে উঠল বুক। নিকি!
একটা বাগানের লনে নীল ব্লাঙ্কেটের উপর শুধু একটা ন্যাপকিন গায়ে দিয়ে বসে আছে নিকি! কারো সাহায্য ছাড়াই বসে আছে, বয়স প্রায় সাত মাস হয়ে গেছে। ফোলা ফোলা গাল, লম্বা ঘন কালো-কোকড়া চুল, এমেরাল্ডের মতো সবুজ চোখ জোড়া নিয়ে হাসছে নিকি। “ওহ্ ঈশ্বর! কী সুন্দর হয়েছে দেখতে!” আলোর সামনে ছবিটাকে ধরে মনোযোগ দিয়ে দেখল বেলা, “এত বড় হয়ে গেছে যে একা একাই বসতে পারে, আমার ছোট্ট বাবাটা?”
ছবিটার উপর হাত বুলাতেই মনে হলো আঙুলের ছাপ পড়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি তাই কাপড় দিয়ে মুছে ফেলল।
ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল বুকের ভেতর, “ওহ মাই বেবি!”
আটলান্টিকের দিগন্তে পাল্টে যেতে বসেছে সূর্য। নিজেকে বহুকষ্টে সামলালো বেলা। ছবিটাকে খামের ভেতরে ঢুকাতে গিয়ে দেখল বাকি কাগজগুলোকে।
প্রথমটা থেকে বোঝা গেল কোনো শিশু ক্লিনিকের মেডিকেল রেজিস্টার কপি’র ফটোকপি। নাম আর ঠিকানা গাঢ় কালি দিয়ে ঢেকে রেখে শুধু নিকি’র নাম, ডেথ অব বার্থ আর ক্লিনিকে উইকলি ভিজিটের রেকর্ড লেখা আছে। জানা গেল চার মাসের সময় নিক্রির প্রথম দুটো দাঁত দেখা গেছে আর ওজন প্রায় ষোল কিলো।
ভাঁজ করা দ্বিতীয় কাগজটা খুলতেই চিনতে পেল আদ্রা’র গোটা গোটা হাতের লেখা।
সিনোরিটা বেলা,
দিনকে দিন নিকি বেশ শক্ত-পোক্ত আর বুদ্ধিমান হয়ে উঠছে। আর রাগ তো একেবারে ক্ষাপা মোষের মত। আর আমি যত জোরে দৌড়াতে পারি নিকি ঠিক ততটা গতিতে হাত আর হাঁটু দিয়ে হামাগুড়ি দেয়; হয়ত কিছু দিনের মাঝেই হাঁটতে শুরু করবে।
ওর মুখের প্রথম কথা ছিল “মাম্মা”; আপনি কত সুন্দর, প্রতিদিন আমি ওকে সেই গল্প শোনাই; এও বলি যে একদিন ঠিকই ওর কাছে আসবেন। এখন হয়তো বুঝতে পারে না, তবে ভবিষ্যতে বুঝবে।
আপনার কথা প্রায় মনে হয়, সিনোরিটা। বিশ্বাস করুন, আমি নিজের জীবন দিয়েই নিকি’র সেবা-যত্ন করব। প্লিজ, এমন কিছু করবেন না। যা ও’কে বিপদে ফেলবে।
বিশ্বস্ত
আদ্রা অলিভারেস
শেষ লাইনটা পড়ে যেন বুকের হাড়ে ছুরির খোঁচা খেল বেলা। বুঝে গেল কাউকে বলা যাবে না ওর কষ্ট, বাবা, নানা কিংবা মাইকেল, কাউকে না।
আবারো দ্বিধা ভরে নিজ বেডরুমের হাতলে হাত রাখল বেলা। “তোমাকে মিথ্যে বলার জন্য দুঃখিত মিকি। হয়ত কোনদিন সত্যিটা জানাতে পারব।”
এত বড় বাড়িটা একেবারে ভূতের বাড়ির মতই নিঝুম হয়ে আছে। পারশিয়ান কার্পেটের উপর দিয়ে খালি পায়ে নিঃশব্দে হেঁটে এলো বেলা। রুমে ঢুকতেই দেখল বিছানায় বসে বই পড়ছে মাইকেল। বোনকে দেখে বেড় সাইড টেবিলে বই রেখে চাদর সরিয়ে দিল বসার জন্য
ভাইয়ের পাশে উঠে বসল বেলা। কিছু একটা টের পেল মাইকেল। জানতে চাইল, “আমাকে বলল, বেলা।
আদ্রা’র সাবধান বাণী মনে পড়া সত্ত্বেও নিজেকে কিছুতেই ধরে রাখতে পারছে না ইসাবেলা। রামোন আর নিকি’র অস্তিত্ব তো মাইকেল জানে। ইচ্ছে হচ্ছে ভাইকে সব খুলে বলতে।
কিন্তু ভিডিওতে দেখা নিকি’র মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই চুপসে গেল বেলা। ভাইয়ের বুকে মাথা রেখে কেবল জানালো, “নিকি মারা গেছে।”
