“কিছু হয়েছে?”
“এখন না, নিকি” তাড়াতাড়ি ভাইকে সাবধান করে দিল বেলা। নিকি চলে যাবার পর প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। এর মাঝে এই প্রথম কথা বলছে দু’জনে। আজ সকালে ওয়েল্টেভ্রেদেনে পৌঁছানোর পর থেকেও মাইকেলকে এড়িয়ে চলছে বেলা।
“নিশ্চয় কিছু হয়েছে, আমাকে বলছ না।” চাপ দিল মাইকেল।
“চুপ! মুখ হাসি হাসি করে রাখো! কোনো ঝামেলা করো না। আমি পরে তোমার রুমে আসব।” ভাইয়ের হাতে চাপ দিয়ে দুজনে মিলে হাসতে হাসতে ড্রয়িং রুমে চলে গেল বেলা আর মাইকেল।
প্রথাগতভাবে ফায়ার প্লেসের দিকে মুখ করে রাখা লম্বা সোফাটাতে বসলেন সেনটেইন।
“আজ রাতে আমার সাথে মেয়েরা বসবে।” ঘোষণা করলেন কোর্টনি সম্রাজ্ঞী। হোলিকে ডেকে নিজের পাশে বসিয়ে আরেক পাশে বসার জন্য ডাকলেন বেলাকে।
যুক্তি ছাড়া খুব কমই কোনো কাজ করেন সেনটেইন। আজও তার ব্যতিক্রম হল না। পরিচারকেরা কফি দিয়ে যাবার পর বের করলেন নিজের তুরুপের তাস।
“আমি অনেক দিন ধরেই এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম হোলি।” সকলে মনোযোগ দিল এদিকে। “আর এর জন্য তোমার জন্মদিনের চেয়ে আর ভালো কিইবা হতে পারে। নিজের গলা থেকে হাজার ক্যারেটের চেয়ে বেশি নিখুঁত হলুদ হীরের হার খুলে হোলি’র দিকে তাকালেন; কালো চোখে দেখা গেল সত্যিকারের অশ্রু বিন্দু। “এত চমৎকার একটা হার অসম্ভব সুন্দরী কারো গলাতেই কেবল শোভা পাবার যোগ্য।” মূর্তির মতো বসে থাকা হোলির গলায় হার পরিয়ে দিলেন সেনটেইন। দশ বছর ধরে একটা একটা করে পছন্দের হীরে জমিয়ে, লন্ডনের গ্যারাজ থেকে প্লাটিনাম আর নকশার পর সৃষ্টি করেছেন এই অসাধারণ অলংকার।
বিস্ময়ে থ বনে গেল সকলে। সবাই জানে সেনটেইনের কাছে এই নেকলেসের কতটা গুরুত্ব আছে।
ডান হাত দিয়ে নিজের গলায় বসে থাকা নেকলেসটাকে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না হোলি। ফোঁপাতে ফোঁপাতে সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে জড়িয়ে ধরল দাদী শ্বাশুড়িকে। একে অন্যকে ধরে বসে রইল দুই নারী, এরপর আস্তে করে হোলিই প্রথম কথা বলল,
“ধন্যবাদ, নানা।” সেনটেইনের একেবারে কাছের মানুষেরাই কেবল এতদিন এ নামে সমোধন করত; হোলি এর আগে কখনোই এই ডাক ব্যবহার না করাতে সেনটেইন চোখ বন্ধ করে হোলি’র সোনালি চুলের মাঝে মুখ ডুবিয়ে দিলেন। কেউই তাই তার চোখে সন্তুষ্টির আভা আর ঠোঁটে বিজয়ীর হাসিটা দেখতে পেল না।
***
ইসাবেলা’র স্যুইটে অপেক্ষা করছে ন্যানি।
“একটা’র বেশি বাজে। আমি তো বলেছি আমার জন্য অপেক্ষা করো না
বুড়ি!” চিৎকার করে উঠল বেলা।
“পঁচিশ বছর ধরেই তোমার জন্য আমি অপেক্ষা করছি। কাছে এসে বেলার ড্রেস খুলে দিল ন্যানি।
“আমার একটুও ভাল লাগে না।”
“আমার তো লাগে। তোমাকে নিজ হাতে গোসল না করানো পর্যন্ত আমার একটুও শান্তি হয় না।”
“এখন! রাত একটায় গোসল!” ফেরার পর থেকে ন্যানি’র সামনে কখনোই নিজেকে নিরাভরণ করেনি বেলা। কিন্তু এই বুড়ির ঈগলের মতো চোখ এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। সন্তান ধারণের যে কোনো তুচ্ছ চিহ্নও এই শকুনির চোখ এড়াবে না।
বুঝতে পারল ওর আচরণে ন্যানি সন্দেহ করছে। তাই কাটাবার জন্য বলে উঠল, “এখন তুমি যাও তো ন্যানি, গিয়ে বস্মি’র বিছানা গরম করো।”
শোকের চোটে বধির হয়ে গেল ন্যানি, “কে তোমাকে এসব বলে?”
“ওয়েল্টেভ্রেদেনে কী হচ্ছে না হচ্ছে তুমি একাই সেসব খবর রাখো না, বুঝলে? ভালোভাবেই জানি বম্মি বুড়াটা তোমার পেছনে লেগে আছে আর তুমি’ও তাকে নিয়ে খেলছ।”
“হু, হু, ভদ্র মেয়েরা এসব আজে-বাজে কথা বলে না। “ দরজার দিকে যেতে যেতে বলে উঠল ন্যানি আর স্বস্তির শ্বাস ফেলল বেলা।
দ্রুত নিজের বেডরুমে গিয়ে মেক-আপ তুলে সিল্কের বাথরোব পরে নিল। রোবের বেল্ট লাগাতে লাগাতে হাত রাখল দরজার হ্যান্ডেলে।
“মিকি’কে আমি কী বলব?” তিনদিন আগে হলেও উত্তরটা নিয়ে এত ভাবতে হত না; কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। প্যাকেটটা এসে গেছে। লন্ডন ছাড়ার আগের দিন জো সিসেরোর সাথে শেষ কথা হয়েছিল।
“লাল গোলাপ, তোমাকে তোমার কনট্যাক্ট এড্রেস দিয়ে দিচ্ছি। শুধু এমারজেন্সি হলেই ব্যবহার করবে। হফম্যান,
C/o ম্যাসন এজেন্সি, ১০ ব্লাশিং লেন, সোহো। মুখস্থ করে নাও কোথাও লিখে রেখো না।”
“ঠিক আছে।” ফ্যাসফ্যাসে গলাটা শুনে সবসময় আতঙ্কে জমে যায় বেলা।
“বাড়িতে ফিরে ওয়েল্টেলেদেন থেকে দূরে ছদ্মনামে একটা পোস্ট অফিস বক্স খুলবে। তারপর লোহোর ঠিকানায় আমাকে নাম্বার পাঠিয়ে দেবে ঠিক আছে?”
ওয়েল্টেভ্রেদেনে পৌঁছানোর কিছুদিন পরেই ক্যাম্পস বে’তে এলে গিয়েছিল গাড়ি চালিয়ে। বহু দূরে হওয়াতে স্টাফরা কেউই তাকে চেনেনি। মিসেস রোজ কোহেন নামে বক্স ভাড়া করে সিসেরোকে নাম্বার পাঠিয়ে দিয়েছে।
মধ্য কেপ টাউনের নিজের অফিস সেনটেইন হাউজ থেকে ফেরার সময়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বক্স চেক্ করে আসে বেলা। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাক্সটা খালি পড়ে থাকলেও রুটিনের একটুও নড়চড় হয় না।
নিকি’র কোনো খবর না পেয়ে ভেতরে ভেতরে যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছে বেলা। প্রতিদিনের জীবনে মনে হচ্ছে কেবল অভিনয় করে যাচ্ছে। যদিও নিজের সবটুকু ক্ষমতা দিয়ে শাসার সহকারী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে তারপরেও যতটা ভেবে ছিল ততটা লাঘব হচ্ছে না এ যন্ত্রণার ভার।
