এরপর ওর স্ত্রীর দিকে নজর দিলেন সেনটেইন। টেবিলের ওদিকে শাসার পাশে বসে আছে হোলি। গ্যারি’র চেয়ে না হলেও প্রায় দশ বছরের বড়। এই বিয়ে আটকানোর জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন সেনটেইন। কিন্তু সফল হতে পারেন নি। এখন স্বীকার করতে বাধ্য হন যে তখন ভুল করেছিলেন। নয়ত এখন মেয়েটাকে আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। কেননা গ্যারির স্ত্রী হিসেবে নিজেকে পারফেক্ট প্রমাণ করেছে হোলি।
সেনটেইন কিংবা অন্য কেউ যা পারেনি, গ্যারি’র সেসব গুণ’কে যথাযথভাবে মর্যাদা গিয়েছে হোলি আর সেগুলো বিকশিত হতে সাহায্যও করেছে। সত্যি কথা বলতে গেলে গ্যারির সফলতার পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে ওর স্ত্রী। পত্নীর সাহস। সহযোগিতা আর ভালোবাসা পেয়ে তিন পুত্র আর এক কন্যার জনক হয়েছে গ্যারি।
কোর্টনি এন্টারপ্রাইজের হেড অফিস, স্টক একচেঞ্জ সবই জোহানেস বার্গে হওয়াতে পরিবারসহ সেখানেই থাকে গ্যারি। কিন্তু সেনটেইনের ধারণা হোলিই তাদেরকে উনার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। গ্যারি’র মতো করে সন্তানদেরকেও নিজের ছত্রছায়ায় রেখে গাইড করতে চান সেনটেইন। তাই বুঝতে পারলেন পার হতে হবে হোলি নামাক বৈতরুণী। লম্বা টেবিলের ওপাশে বসে থাকা হোলি’র দিকে তাকিয়ে হাসলেন উষ্ণতা,মেশানো প্রশ্রয়ের হাসি। নীল আর বেগুনি দু’চোখে দুই রঙ নিয়ে হাসি ফিরিয়ে দিল হোলি।
এই ফাঁকে শাসা কিছু একটা বলে ফেললেন যা শোনেননি সেনটেইন। হঠাৎ করেই প্রত্যেকে তার দিকে তাকিয়ে হাততালি দেয়া শুরু করল। হাসি মুখে প্রশংসা হজম করে নিলেন সেনটেইন; আবারো কথা বলতে লাগলেন শাসা।
মায়ের সকল গুণ আর পূর্ব বীরত্বের সাত কাহন শোনাতে লাগলেন। বাকিরাও বহুবার শোনা কাহিনী এত মনোযোগ দিয়ে শুনছে যেন আগে আর জানত না।
আর এসব কিছুর ভিড়ে উশখুশ করছে কেবল একজন।
সেনটেইনের আত্মতৃপ্তির মাঝে বিরক্তি উৎপাদন করার সাহস কেবল একজনেরই আছে। নাতী-নাতনীদের মাঝে এই একজনের প্রতিই তেমন কোনো টান অনুভব করেন না সেনটেইন কোর্টনি ম্যালকমস। ছেলেটার চরিত্রের এমন কিছু গভীরতা, এমন গোপনীয় কয়েকটা দিক আছে যা তিনি আজও ঠাওর করতে পারেননি। বিরক্তি তাই বেড়েই যাচ্ছে দিনকে দিন।
তারা’র কাছ থেকে মাইকেলকে সরিয়ে রাখতে ব্যর্থ হওয়াটাও এর আরেকটা কারণ। তারা-ওই মার্কসিস্ট, বিপথগামী, বিশ্বাসঘাতকটার নাম মনে আসার সাথে সাথে পেটের মাঝে পাক খেয়ে উঠল ঘৃণা।
এতটাই তীব্র যে হঠাৎ করেই চোখ তুলে দাদী’র দিকে তাকালো মাইকেল আর সেনটেইনের কালো চোখ জোড়াতে তীব্র ঘৃণা টের পেয়ে সাথে সাথে প্রায় অপরাধীর ভঙ্গিতে চোখ সরিয়ে নিল।
সেনটেইনের নিষেধ সত্ত্বেও পুত্রের পছন্দের পেশায় তাকে প্রতিষ্ঠা লাভে সাহায্য করার জন্য গোল্ডেন সিটি মেইলে ইন্টারেস্ট দেখিয়েছেন শাসা। যাই হোক মাত্র ডেপুটি এডিটর অব্দি পৌঁছেছে মাইকেল। শাসা’র কনজারভেটিভ মতাদর্শের কেবল বাম দিকেই ঘেষছে। তাই সরকারই শুধু নয় বরঞ্চ শিল্পপতিরাও এর পিছনে লেগেছে। এর আগে তিন বার নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়াতে মেইলের আর্থিক লোকসান নিয়ে গ্যারি আর সম্মান হারিয়ে বেজায় ক্ষেপে আছেন সেনটেইন।
মাইকেলের সুন্দর মুখখানা দেখে তিক্ত স্বাদ এলো মনের ভেতর। ভাবলেন এই ছেলে আসলে সত্যিকারের কোর্টনি নয়।
আগন্তুক আর পরাজিতদের জন্য মাইকেলের দরদ দেখে তাই ক্ষুব্ধ সেনটেইন। কত বড় সাহস যে বেলাকেও দলে ভেড়াতে চায়। দু’ ভাইবোনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে একত্রে বণর্বাদের র্যালিতে যাবার কথা ভালই জানেন সেনটেইন।
ভাগ্য ভালো যে সময় মতো সব সামলাতে পেরেছেন। লোথার ডি লা রে’র সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার পর সাউথ আফ্রিকান ইন্টেলিজেন্সের জন্য আন্ডারকাভার হিসেবে কিছু কাছ করেছিল বেলা। সেই লোথার এখন সংসদের সদস্য আর ল’ অ্যান্ড অর্ডার মিনিস্ট্রির ডেপুটি মিনিস্টার।
ব্যক্তিগতভাবে লোথারকে ডেকে পাঠিয়েছেন সেনটেইন। তাকে আশ্বস্তও করেছে ছেলেটা; জানিয়েছে, “র্যালিতে ওর উপস্থিতির স্বপক্ষে সবকিছু লিখে রাখব ইসাবেলা’র ফাইলে। ওতো আগেও আমাদের জন্য কাজ করেছে। কিন্তু মাইকেলের ব্যাপারে কিছু প্রমিজ করতে পারব না। এরই মাঝে ওর ফাইলে বহু কালো দাগ জমে গেছে।
অবশেষে শেষ করেছেন শাসা। সকলে আবার উৎসুক ভঙ্গিতে তাকাল সেনটেইনের দিকে। বক্তা হিসেবে পুত্রের চেয়েও এক কাঠি সরেস হলেও আজ সকলে আশা হত হল সেনটেইনের কথা শুনে।
সরাসরি নিজের দর্শন তুলে ধরার চেয়ে অন্যদের প্রশংসাই আজ বেশি করে করলেন। গ্যারি’র আর্থিক সাফল্য, ইসাবেলা’র অ্যাকাডেমিক অর্জন, জুলুল্যান্ডের উপকূলে কোর্টনি লাক্সারী হোটেলের জন্য হোলিসহ সকলেই দাদীমা’র প্রশংসার বন্যায় ভেসে গেল। এমনকি মাইকেল’ও বাদ গেল না। নতুন বই প্রকাশের জন্য তাকেও বাহবা দিলেন সেনটেইন।
এরপর সকলকেই উঠে দাঁড়িয়ে পরিবারের সাফল্য কামনা করে টোস্ট করার আদেশ দিতেই বিনা বাক্য ব্যয়ে উঠে দাঁড়ালো প্রত্যেকে। শাসা এসে মা’র হাত ধরে নিয়ে গেলেন ড্রইং রুমে।
ইসাবেলা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই তাড়াতাড়ি ওর পাশে চলে এলো মাইকেল। বোনের হাত ধরে জানালো, তোমাকে অনেক মিস্ করেছি বেলা। আমার চিঠির উত্তর দাওনি কেন? রামোন আর নিকি, বেলা’র অভিব্যক্তি বদলে যেতেই সচকিত হলো মাইকেল।
