“আমার কথা মনে রেখো, বেলা নিজের লক্ষ্য ঠিক করে ফেলেছে আর আমাদের মতই শক্ত আর নির্দয় হয়েই নিজেকে প্রমাণ করে দেখাবে।”
“তোমার মতো এত বজ্রকঠিন নয় নিশ্চয়ই?”
“মাকে নিয়ে মজা করলেন শাসা।”
“সময় হলে দেখবে আমার কথাই সত্যি হয়েছে শাসা কোর্টনি। নিজের ভাবনায় মগ্ন হয়ে গেলেন সেনটেইন। মায়ের এই আত্মপ্রত্যয় ভালোই চেনেন শাসা। “ও অনেক দূর যাবে শাসা-এতটা, যতটা হয়ত তুমি আর আমি কেবল স্বপ্নই দেখেছি। যাই হোক, আমি আমার সাধ্যমতো ওকে সাহায্য করব।”
আর এখন নাতনীর মাঝে সেই ঋজুতাই দেখতে পেলেন সেনটেইন।
“তো ইংল্যান্ডের শীতকাল কেমন লাগল তোমার?” ইসাবেলার কাছে জানতে চাইলেন ভরসটার। মনে মনে আশা করলেন চপল কোনো উত্তর শুনবেন। কিন্তু চমককৃত হয়ে গেলেন বেলার জবাব শুনে বুঝতে পারলেন এই সৌন্দর্যের পেছনে লুকিয়ে আছে অদম্য মেধা। গলার স্বর নামিয়ে খানিক আলোচনা সেরে নিলেন বেলার সাথে। এরপর আবারো তাগাদা নিলেন সেনটেইন, “এই তো কদিন আগে মাত্র লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল থিওরীর উপরে ডক্টরেট করেছে ইসাবেলা।”
“ওহ! তাই নাকি। তো আমাদের মাঝে আরেকজন হেলেন সুজমান আসছেন!” মাথা নেড়ে সাউথ আফ্রিকান পার্লামেন্টের একমাত্র নারী সদস্যের কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী।
হেসে ফেলল ইসাবেলা। তার সেই বিখ্যাত যৌনাবেদনময়ী হাসি। যা দেখে সবচেয়ে কঠিন নারী বিদ্বেষী’ও টলে উঠতে বাধ্য।
“সম্ভবত। হাউজে একটা আসন পাওয়া আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলেও হতে পারে। কিন্তু সে তো এখনো বহু দূর। তাছাড়া আমার বাবা আর দাদীমা’র নীতিতেই বিশ্বাসী আমি, প্রধানমন্ত্রী। তার মানে মেয়েটা কনজারভেটিভ! এবারে আর তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল ভরসটারের নীল চোখ।
“দুনিয়া বদলাচ্ছে। মিঃ প্রাইম মিনিস্টার। কোনো একদিন হয়ত আপনার কেবিনেট মেম্বারও হবে নারী, তাই না?” আলতো করে আগুনে ঘি ঢাললেন সেনটেইন।
হেসে ফেললেন ভরসটার। দ্রুত আবার ইংরেজ থেকে আফ্রিকান হয়ে গেলেন।
“ডক্টর কোর্টনি নিজেও সে দিন’কে বহু দূর হিসেবে ভাবছে। যাই হোক আমাদের মতো বুড়োদের ভিড়ে এমন সুন্দর মুখ দেখতে খারাপ লাগবে না।”
ভাষার এই পরিবর্তন অনেকটা ইচ্ছাকত। কেননা আফ্রিকান ভাষা জানা ব্যতীত রাজনৈতিক উচ্ছাকাঙ্ক্ষা পূরণ অসম্ভবই বলা চলে।
কিন্তু এই পরীক্ষাও উৎরে গেল ইসাবেলা। ওর নিখুঁত ব্যাকরণ, শব্দ ভাণ্ডার আর সুললিত কণ্ঠস্বর শুনে যে কেউ মুগ্ধ হবে।
এবারে আনন্দ নিয়েই হাসলেন ভরসটার। আরো খানিক কথা বলে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সেনটেইনকে জানালেন, “এবারে আমাকে যেতে হবে। আরেকটা ফাংশন আছে।”
তারপর ইসাবেলাকে বললেন, ‘আবার দেখা হবে ডা. কোর্টনি।
গাড়ি পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে এগিয়ে দিলেন শাসা আর সেনটেইন।
ফিরে আসতেই দেখা গেল ইসাবেলার চারপাশে পুরুষদের ভিড় জমে গেছে।
“দেখ কাণ্ড! বেলাকে দেখে সবকটা কুকুর ছানার মতো হাপাচ্ছে। মনে মনে হাসি চেপে নাতনীর দিকে তাকালেন সেনটেইন। সাথে সাথে দাদীর দিকে এগিয়ে এলো ইসাবেলা। আদর করে ওর হাত ধরলেন সেনটেইন। “ওয়েল ডান, বাছা, আংকেল জন তো খুবই খুশি। আমরা ঠিক পথেই এগোচ্ছি। কী বল?
***
ওয়েল্টেভ্রেদেনের মেইন ডাইনিং রুমের লম্বা টেবিলটাতে ডিনার করতে বসেছে পুরো কোর্টনি পরিবার। চারপাশ সুরভিত করে রেখেছে মোমাবাতি আর একগাদা হলুদ গোলাপ।
এহেন পারিবারিক সন্ধ্যায় সরাচর যা হয়, পুরুষেরা কালো টাই আর নারীরা লম্বা ড্রেস পরে এসেছে।
শুধু শন্ অনুপস্থিত। শ’কেও ডেকেছিলেন সেনটেইন; কিন্তু শিকার অভিযানে ক্লায়েন্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকায় অপারগতা জানিয়েছে শন।
জ্যেষ্ঠ পৌত্রকে বেশ মিস করছেন সেনটেইন। তিন ভাইয়ের মধ্যে শন হচ্ছে সবচেয়ে সুদর্শন আর স্বভাবে’ও বন্য। নিজের চারপাশে সবর্দা বিপদ আর উত্তেজনার বাতাবরণ তৈরি করে রাখে শন্। আর এ কারণে মাঝে মাঝেই শত শত ডলার গুণতে হয় কোর্টনি পরিবারকে। কিন্তু তাতে ভ্রূক্ষেপ না করলেও সেনটেইনের একমাত্র চিন্তা কবে না ছেলেটা এমন এক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে যে, সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়া সত্যিই কঠিন হবে। যাই হোক জোর মাথা থেকে এ জাতীয় চিন্তা সরিয়ে দিলেন সেনটেইন।
আজ রাত শুধুই আনন্দের।
লম্বা টেবিলটার একেবারে মাঝখানে আলো ছড়াচ্ছে রুপার ট্রফি। অজস্র ঘণ্টা কঠিন পরিশ্রমের যথার্থ ফসল এই ট্রথি।
টেবিলের অপর প্রান্তে বসে থাকা শাসা রুপার চামচ দিয়ে ক্রিস্টালের গ্লাসে টুং টাং করে ভাঙ্গলের নীরবতা। স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে শুরু করলেন বক্তৃতা-এতটা সহজ আর বুদ্ধিদ্বীপ্ত, কৌতুকে ভরা থাকে এ অংশ যে ক্ষণিকের মধ্যেই হাসির হল্লার সাথে সাথে গভীর চিন্তা করতেও বাধ্য হয় সকলে।
পুত্রের মুখে নিজের প্রশংসা শুনতে শুনতে অন্যদের দিকে তাকালেন সেনটেইন।
ডান দিকে বসে আছে কোর্টনি সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, গ্যারি। ছোটবেলায় মায়োপিয়া আর প্যাজমা’তে ভুগতে থাকা ছেলেটা তার কিংবা অন্য কারো সাহায্য ছাড়াই আত্মবিশ্বাসের জোরে আজ কোর্টনি এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান হয়ে গেছে। বহন করে চলেছে পারিবারিক সৌভাগ্যের বিশাল দায়িত্ব। মাথার উপর মুরগির ঝুরির মতো চূড়া হয়ে আছে কালো ঘন চুল। মোমবাতির আলোতে চমকাচ্ছে চোখের চশমা। গ্যারির সাথে হাসছে পুরো ডাইনিং রুম।
