ওদিকে সেনটেইন কোর্টনি নিজেও বেশ টেনশনে আছেন। মাত্র কিছুদিন আগেই যোগ দিয়েছেন এ খেলাতে; তাই বান্টির মতো ত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতাও নেই। কিন্তু বেশ যত্নে গড়ে তুলেছেন ড্যান্ডি ল্যাসকে। অত্যন্ত গভীর কিংবা ঠাণ্ডা পানিও কোনো বাধাই নয় এই হিরোইনের কাছে। বাতাসের পালকের হালকা গন্ধকেও ঠিকই শুঁকে নেয় ড্যান্ডির নাক। এছাড়া সেনটেইন আর ড্যান্ডির মাঝের সম্পর্ক তো প্রায় টেলিপ্যাথির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
চুপচাপ। শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও ভেতরে ভেতরে উত্তেজনায় কাঁপছেন সেনটেইন কোর্টনি। যা ঠিকই টের পেয়েছে ড্যান্ডি ল্যাস। মৃদু শব্দ কিংবা জোরে গর্জন, যে কোনো ক্ষেত্রেই সাথে সাথে খেলা থেকে বের করে দেয়া হবে। তাই অ্যাম্বার জয়ের নাকানি চুবানি দেখে বহুকষ্টে নিজেকে দমিয়ে রেখেছে ড্যান্ডি ল্যাস। কিন্তু আগ্রহ আর উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে। তখন আসবে তার টান। কয়েক সেকেন্ড পর পরই সেনটেইনের দিকে তাকিয়ে ছুটে যাওয়ার অনুমতি চাইছে।
গান-লাইন থেকে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন শাসা কোর্টনি। বরাবরের মতই প্রশংসায় মুগ্ধ হলেন শাসা। গত নিউ ইয়ারস ডে’তে সত্ত্বর পূর্ণ করা সেনটেইন কোর্টনি ম্যালকম এখনো দেখতে ঠিক টিন এজ ছেলেদের মত। পরিহিত উলের পোশাক ভেদ করেও ফুটে বের হচ্ছে অনিন্দ্য দেহ সৌষ্ঠব।
শাসা’র জন্মের আগেই ফ্রান্সের যুদ্ধে মারা গেছেন শাসা’র বাবা। তখন থেকেই একা হাতে ছেলেকে বড় করে তুলেছেন সেনটেইন। মরুভূমির বুকে একাকী খুঁজে পেয়েছেন প্রথম হীরা, যা থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হানি খনি। ত্রিশ বছর ধরে এই খনি সামলে গড়ে তুলেছেন এক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য যা আজকের কোর্টনি এন্টারপ্রাইজ। শাসা আর তার পরে গ্যারি কোর্টনি এখন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেলেও এখনো নিয়মিত বোর্ডের সভায় আসেন সেনটেইন। সকলে অত্যন্ত মনোযোগ আর শ্রদ্ধা নিয়ে মেনে চলে তার প্রতিটি বাক্য।
শাসা থেকে শুরু করে গ্যারি’র ছেলে মেয়েরা পর্যন্ত সকলেই এক বাক্যে মানতে বাধ্য তার প্রতিটি আদেশ।
বয়স কেড়ে নিতে পারেনি তার সৌন্দর্য; বরঞ্চ এক অন্যরকম মহিমা। লেপন করে দিয়েছে। গর্বিত গাল, বুদ্ধিদ্বীপ্ত উন্নত কপাল। কালো জোড়া চোখ; যা এখন যদি হয় নিষ্ঠুর শিকারীর মতন, পর মুহূর্তেই তা ভরে উঠে কৌতুক আর প্রজ্ঞায়।
বিচারকদের একজন হুইসেল দিতেই অসন্তুষ্টিতে ঝুলে পড়ল বান্টি চার্লসের কাঁধ। ব্যর্থ হওয়াতে তুলে আনা হল অ্যাম্বার জয়’কে।
এরই মাঝে প্রস্তুত হয়ে গেছে ড্যান্ডি ল্যাস। আগ্রহের চোটে রীতিমতো কাঁপছে। জানে এরপর কাকে ডাকা হবে।
কুকুরটার দিকে না তাকিয়েও নিজের টেলিপ্যাথিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে মনে হল পশুটাকে শান্ত করে রেখেছেন সেনটেইন। ইচ্ছে করে দেরি করছেন বিচারকেরা, একে অন্যের সাথে পরামর্শ করার ভান করছেন, নোট লিখছেন; আদতে ড্যান্ডি লেসের ধৈর্য পরীক্ষা করছেন। যে কোনো ধরনের শব্দ করলেই বাদ্য দিয়ে দেয়া হবে কুকুরটাকে।
বাস্টার্ড! মনে মনে ক্ষেপে উঠলেন সেনটেইন।
অবশেষে নোট বুক থেকে চোখ তুলে তাকালেন সিনিয়র জাজ।
“থ্যাঙ্ক ইউ, নাম্বার থ্রি।” জাজের চিৎকার শুনে চেঁচিয়ে উঠলেন সেনটেইন; “যা!” সোনালি বর্শার মতো করে ছুটে গেল ড্যান্ডি ল্যাস।
পানির কাছে এসে সামনের পাগুলোকে ভাজ করে লাফ দিল ড্যান্ডি। গর্বে সেনটেইন কোর্টনির বুক ভরে গেল একেই বলে চ্যাম্পিয়ন।
কিন্তু একটু পরেই ভয়ে হাত-পা ঠাণ্ডা হবার জোগাড়। অ্যাম্বার জয়ের মতো একই ভুল করতে যাচ্ছে ড্যান্ডি। হয়ত অতিরিক্ত দেরি হওয়াতেই জায়গাটা ভুলে গেছে কুকুরটা।
একবারের জন্য মনে হল হুইসল বাজিয়ে ড্যান্ডিকে সঠিক জায়গায় নিয়ে যাবেন, তাতে কিছু পয়েন্ট খোয়া গেলেও সমস্যা হবে না। কিন্তু এরই মাঝে বিজয়ের ভাবনায় বিভোর সেনটেইন দাঁড়িয়ে রইলেন পাথরের মতো মুখ করে।
পানির মাঝে ঘুরপাক খেতে খেতে তীরে দাঁড়ানো সেনটেইনের দিকে তাকাল ড্যান্ডি ল্যাস।
ইচ্ছে করেই নিজের বাম হাত’কে কোমরের কাছের পকেটে ঢোকালেন– সেনটেইন। ঈগলের মতো শ্যেন দৃষ্টিঅলা বিচারকদের কেউই বুঝতে পারল না এই ইশারা; কিন্তু শাসা’র চোখ এড়ালো না।
“এই বুড়ী আর বদলাবে না। মনে মনে হাসলেন শাসা। যুদ্ধে জেতার জন্য যে কোনো অস্ত্র ব্যবহারে প্রস্তুত।”
ওদিকে পানির মধ্যে সাথে সাথে বাম দিকে ঘুরে গেল ড্যান্ডি ল্যাস। স্রোতের বিপরীতে অত্যন্ত পরিশ্রম করে এগোতে এগোতেই গন্ধ পেয়ে নাক উঁচু করে ফেলল পশুটা। বুনো হাসের রক্তের গন্ধ পেয়েই মাথা ডুবিয়ে দিল ঠাণ্ডা বাদামি রঙা পানির ভেতরে।
অন্যদিকে তীরের দর্শকেরা হাত তালি দিয়ে উঠল। আবারো মাথা তুলল ড্যান্ডি, কান দুটো লেপ্টে গেছে মাথার সাথে, দাঁতের ফাঁকে ঝুলছে বুনো হাঁস।
তীরে উঠে একটুও গা ঝাড়া দিল না ড্যান্ডি; এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট না করে দৌড়ে এলো ডেলিভারী পৌঁছে দিতে।
ড্যান্ডি মায়ের সামনে এসে এমনভাবে বসে গেল যে দেখে শাসা’র চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। কেমন অদ্ভুত এক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে এই নারী আর কুকুরটার মাঝে।
ড্যান্ডি’র মুখ থেকে বুনো হাঁসের মৃতদেহটা নিয়ে বিচারকদের কাছে। গেলেন সেনটেইন। পাখা সরিয়ে খুব সাবধানে “দাঁতের দাগ দেখা যায় কিনা খুঁজে দেখলেন বিচারকেরা। নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন সেনটেইন, যতক্ষণ পর্যন্ত না শুনলেন, “ধন্যবাদ, নাম্বার থ্রি।”
