খুব দ্রুত হাতে কাজ শুরু করল ডাক্তার। বোঝাই যাচ্ছে যে কোন কারণে ভয় পাচ্ছেন। ক্যামেরার দিকে মুখ তুলে সরাসরি ইসাবেলার দিকে তাকালো প্রথম লোকটা।
“আরেকটু হলেই হিসেবের গড়বড় হয়ে যাচ্ছিল। সেফটি লিমিট ক্রস হয়ে গেছে।” এরপর ডাক্তারসহ দু’জনে মিলে খানিক আলাপ সেরে নিলেও কিছুই বুঝল না ইসাবেলা। তারপর আবারো কথা বলে উঠল প্রথম জন, “আজ তাহলে এটুকুই থাক। আশা করছি আর কখনো দেখার প্রয়োজন পড়বে না তোমার। অ্যানেশথেসিয়া ছাড়াই বাচ্চাটার একের পর এক অঙ্গ কেটে ফেলা কিংবা ক্যামেরার সামনে গলা টিপে মেরে ফেলার দৃশ্য দেখতে নিশ্চয়ই ভাল লাগবে না। তারপরেও সবকিছু নির্ভর করবে তোমার উপর। তুমি আমাদের সাথে কতটা সহযোগিতা করবে তার উপর।”
ঝাপসা হতে হতে খালি হয়ে, গেল পর্দা। ইসাবেলার ফোপানির আওয়াজ ছাড়া আর কোনো শব্দ শোনা গেল না অন্ধকার থিয়েটারের ভেতরে। এভাবেই কেটে গেল বহুক্ষণ। এরপর আস্তে আস্তে থেমে গেল সব শব্দ। বাতি জ্বলে উঠতেই ইসাবেলা’র কাছে এলেন জোসেফ সিসেরো।
“এহেন কাজে আমরা কেউই আসলে কোনো আনন্দ খুঁজে পাইনা। তাই ভব্যিষৎতেও চেষ্টা করব যাতে পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে চলা যায়।”
“কেমন করে এটা পারলেন!” ভগ্ন হৃদয়ে বলে উঠল বেলা, “ছোট্ট একটা বাচ্চার সাথে কোনো মানুষ কিভাবে এমনটা করতে পারে?”
“আমি আবারো বলছি, এতে আমরা কোনো আনন্দ পাই না। তুমি নিজেই অপরাধী, লাল গোলাপ। তোমার অবাধ্যতার কারণেই কষ্ট পেয়েছে তোমার ছেলে।”
“কষ্ট! একটা অবুঝ শিশুর উপর নির্যাতন করে একে কষ্ট বলছেন…?”
“সামলাও নিজেকে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল সিসেরো’র গলা।
‘সন্তানের খাতিরে নিজের অবাধ্যতা কমাও।”
“আমি দুঃখিত।” অপোবদনে জানাল ইসাবেলা। “আর কখনো এরকম করব না। শুধু নিকি’কে আর আঘাত করবেন না, প্লিজ।”
“তুমি যদি সহযোগিতা করো, তাহলে ওর কিচ্ছু হবে না। দক্ষ সিস্টার ওর দেখা শোনা করছেন। এতটা যত্ন পাবে যা হয়ত তুমিও দিতে পারতে না। পরবর্তীতে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হবারও সুযোগ পাবে যা কেবল তরুণেরা স্বপ্নেই দেখে।”
হাঁ করে তাকিয়ে রইল ইসাবেলা, “এমনভাবে কথা বলছেন যেন ওকে আমার কাছ থেকে চিরতরের জন্য নিয়ে গেছেন। যেন আমি আমার সন্তানকে আ র কখনো দেখতে পারব না।”
কাশি দিয়ে মাথা নাড়লেন সিসেরো, “ব্যাপারটা তা নয়’ লাল গোলাপ। ছেলের কাছে যাবার সুযোগও তোমাকে দেয়া হবে। শুরুতে নিয়মিত সব খবর পাবে। ভিডিও রেকর্ডিং এর মাধ্যমে দেখবে ও কিভাবে বড় হয়ে উঠছে, একা একা বসতে পারে, হামাগুড়ি দিতে পারে, হাঁটতে শিখবে।”
“ওহ্! না! এভাবে তো মাসের পর মাস লেগে যাবে। এতদিন তো ওকে আমার কাছ থেকে দূরে রাখতে পারেন না।”
এমনভাবে কথা বলে চলল সিসেরো, যেন বেলা কিছুই বলেনি, “এরপর প্রতি বছর ওর সাথে কিছু সময় কাটাতে পারবে। এমনো হতে পারে যে তোমার আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে ছেলের সাথে হলিডে কাটাবার সুযোগও দেয়া হবে-দিন এমনকি সপ্তাহ’ও কাটাতে পারবে ছেলের সঙ্গে।”
“না!” আবারো ফোঁপাতে লাগল বেলা।
“কে জানে কোন একদিন হয়ত সব বাধা তুলে নেয়া হবে। যখন তখন ছেলেকে কাছে পাবে। তবে এসব কিছুর জন্য তোমাকে অর্জন করতে হবে আমাদের বিশ্বাস আর কৃতজ্ঞতা।”
“কে আপনারা?” আস্তে করে জানতে চাইল ইসাবেলা, “রামোন মাচাদো’ই বা কে? ভেবেছিলাম বুঝি ওকে চিনি অথচ সেটা একটু’ও সত্যি না। কোথায় রামোন? ও’ ও কি এই দানবীয় কাজের অংশ…?” গলা ধরে গেল। শেষ করতে পারল না বেলা।
“এ জাতীয় চিন্তা মাথা থেকে বের করে দাও। আর আমরা কে এর উত্তরও খুঁজতে যেও না।” সাবধান করে দিলেন সিসেরো। “রামোন মাচাদো’ও আমাদের হাতের মুঠোয়। ওর কাছ থেকে কোনো সাহায্যের আশা করো না। সন্তান তার’ও; একই নির্দেশ পালন করতে তোমার মতই বাধ্য সে।
“আমাকে কী করতে হবে?” শান্ত ভঙ্গিতে জানতে চাইল বেলা। তপ্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন সিসেরো। যাক আর কোনো সম্ভাবনা নেই যে এই মেয়ে কোনোদিন মাথা তুলবে কিংবা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। মনোবিজ্ঞানীর রিপোর্টও তাই বলে; তারপরেও ক্ষীণ যে দুশ্চিন্তা ছিল তা আজ কেটে গেল। যেভাবে তাকে বঁড়শিতে গাঁথা হয়েছে তা কখনো ছিঁড়বে না। বাচ্চাটা যদি মারাও যায়, আরেকটাকে ধরে এনে ভিডিও গেম খেলা যাবে। ওদের ইশারাতেই এখন নাচবে মেয়েটা।
“সবার প্রথমে তোমার ডক্টরেট প্রাপ্তিতে অভিনন্দন জানাচ্ছি, লাল গোলাপ। আমাদের জন্য কাজ করতে এখন আরো সুবিধা হবে তোমার।”
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইসাবেলা। এরকম ভয়ংকর মানসিক যাতনার পর হঠাৎ করে একথা শুনে মনে হলো তাল হারিয়ে ফেলবে। যাই হোক বুঝতে পারল মন দিয়ে শুনতে হবে লোকটার কথা।
“অনুপস্থিত অবস্থাতেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী গ্রহণের ব্যবস্থা করে যত দ্রুত সম্ভব কেপটাউন তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাবে, বুঝতে পেরেছ?”
মাথা নাড়ল বেলা। “বাড়িতে ফিরে পারিবারিক সব কাজে আগ্রহ দেখাবে। বিশেষ করে বাবার কাছে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলবে। সব কিছুতেই ওনার সহাযযাগিতা করব। বিশেষ করে আর্মামেন্টস করপোরেশনের হেড হিসেবে যে দায়িত্ব তিনি পালন করছেন। এর পাশাপাশি যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হল দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়বে।”
