কোনো কথা না বলেই ক্রেড়লে রিসিভার নামিয়ে রাখল বেলা।
পাঁচ দিন কেটে গেল। কিছুই ঘটল না। আশায় আশায় ফ্ল্যাট ছেড়ে বাইরে যাওয়া তো দূরের কথা, ফোনের আশপাশ থেকেই সরলো না। কিন্তু হাউজকীপার ছাড়া আর কারো সাথেই কথাও বলে না। শুধু বই পড়ে আর টিভি দেখে। যদিও তাকিয়ে থাকাই সার হয়। নিজের ব্যথা ছাড়া বাকি সবকিছুই এখন অর্থহীন।
কিছুই খেতে ইচ্ছে না করাতে তিন দিনের ভেতর বুকের দুধ শুকিয়ে গেল। ওজন কমতে লাগল হু হু করে। তার সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় একটি অংশ চুলগুলো শুকিয়ে নিষ্প্রাণ হয়ে গেছে। আয়নায় নিজেকে দেখতে একটুও ভাল লাগে না। চোখের চারপাশে গভীর দাগ, সোনালি দেহত্বক এখন হলুদ হয়ে দেখায় ম্যালেরিয়া রোগীর মত।
শাস্তির মতো মনে হচ্ছে এই অপেক্ষার পালা। একেকটা ঘণ্টা যেন অনন্ত কাল। অবশেষে ষষ্ঠ দিনে বেজে উঠল ফোন। দ্বিতীয় রিং’র সাথে সাথেই ছো মেরে কানে দিতেই শুনল মধ্য ইউরোপীয় এক নারীর স্বর।
“আমার কাছে রামোনের একটা মেসেজ আছে। এখনি বাসা থেকে বের হয়ে ট্যাক্সি নিয়ে রয়্যাল হাসপাতাল জংশনে চলে যান। ওয়েস্ট মিনিস্টার পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে। এরপর কেউ একজন এসে “লাল গোলাপ : নাম ধরে ডেকে জানাবে বাকি নিদের্শনা। এবারে কী শুনেছেন বলুন।”
এক নিঃশ্বাসে গড়গড় করে বস বলে গেল ইসাবেলা। “গুড” বলেই কানেকশন কেটে দিল নারী কণ্ঠ।
টেমস এর উপর দিয়ে একশ গজও যায়নি; এমন সময় ছোট্ট একটা ভ্যান ওর পাশে চলে এলো। ধীরে ধীরে চলতে লাগল একই দিকে। একটু পরে পেছনের দরজা খুলতেই দেখা গেল গ্রে ওভারঅল পরে বসে আছে এক মাঝ বয়সী রমণী।
“লাল গোলাপ” কণ্ঠ শুনেই বেলা চিনে নারীকে। “উঠে বসো!”
দ্রুত ভ্যানে উঠে মহিলার বিপরীত দিকে বসে পড়ল বেলা। চলতে শুরু করল ভ্যান।
জানালা বিহীন ভ্যানটার অন্য কোন দরজাও নেই। কেবল মাথার উপরে ভেন্টিলেটর ছাড়া। তাই টার্ন আর স্টপ গুনে গুনে কোথায় যাচ্ছে আন্দাজ করতে চাইলেও একটু পরেই ক্ষান্ত দিল সে চেষ্টায়।
“আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?” বিপরীত পাশে বসা নারীকে প্রশ্ন করতেই উত্তরে শুনল, “একদম চুপ।” তাই করল বেলা। হাতঘড়িতে তেইশ মিনিট কেটে গেছে এমন সময় আবার থেমে গেল ভ্যান। বাইরে থেকে খুলে গেল পেছনের দরজা।
একটা পার্কিং গ্যারেজে এসে থেমেছে ভ্যান। চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারল জায়গাটা আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গ্রে ওভারঅল পরিহিত নারী হাত ধরে বেলা’কে নামতে সাহায্য করল। স্পর্শেই এই রমণীর শক্তি টের পেয়ে বিস্মিত হয়ে গেল বেলা। ঠিক যেন একটা গরিলা’র থাবা। মাংসল কাঁধ নিয়ে টাওয়ারের মতো উঁচু হয়ে আছে ওর মাথার উপরে। হাত ধরা অবস্থাতেই ওকে ভ্যানের বিপরীত দিকের লিফটে নিয়ে গেল। চারপাশে দ্রুত চোখ বুলিয়ে নিল বেলা। ডজনখানেক আরো অন্যান্য ভেহিকেল দেখা গেল যেগুলোর অন্তত দু’টোতে ডিপ্লোম্যাটিক প্লেট লাগানো আছে।
লিফটের দরজা খুলে যেতেই ইসাবেলা ধাক্কা খেয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। কন্ট্রোল প্যানেলের আলো দেখে বোঝা গেল ওর সন্দেহই সঠিক। বেসমেন্ট লেভেল-২। থার্ড ফ্লোরের বোতামে চাপ দিল গরিলা। নিঃশব্দে দু’জনে উঠে এলো লেভেল-থ্রি’তে। খালি করিডোরের দু’পাশের সবক’টি দরজাই আটকানো।
একেবারে শেষ মাথার দরজাটা খুলে বের হয়ে এলো আরেক স্লাভিক নারী। একই রকম গ্রে ওভারঅল পরনে। ওদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল ছোট্ট একটা লেকচার রুমে, কিংবা বলা যায় মুভি থিয়েটার। উঁচু মঞ্চের দিকে মুখ করে পাতা হয়েছে দুই সারি ইজি চেয়ার, দূরের দেয়ালের সাথে লাগানো হয়েছে পর্দা।
সামনের সারির মাঝখানে ইসাবেলা’কে বসিয়ে দেয়া হলো।
নরম প্লাস্টিকের চেয়ারে ডুবে গেল যেন। দুই নারী এবার ইসাবেলার পেছনে দাঁড়িয়ে গেল। কয়েক মিনিট পর্যন্ত কিছুই ঘটল না। এরপরই মঞ্চের ডানদিকের ছোট দরজাটা খুলে গিয়ে ভেতরে এলেন এক পুরুষ।
ভদ্রলোক অসুস্থ মানুষের মতো আস্তে আস্তে হাঁটাচলা করছেন। চুলগুলো সব সাদা, প্রায় হলুদও বলা চলে, লেপ্টে আছে কানে-কপালে। বয়স আর রোগের ভারে লোকটাকে এতটাই কাবু মনে হল যে খারাপই লাগল; আলো পড়ল চোখের উপর।
বিতৃষ্ণার ঝাঁকি খেয়েই মনে পড়ে গেল ওই চোখ জোড়া। একবার কৃষ্ণ সাগরে বাবার সাথে চার্টার করা ফিশিং বোটে গিয়েছিল বেলা। মরিশাসের দ্বীপে বাবা’র বঁড়শিতে গেঁথে যায় দানবীয় এক হাঙর। দুই ঘণ্টা যুদ্ধের পর তীরে তোলা হয়েছিল প্রাণীটাকে। রেইলের কাছে ঝুঁকে হাঙরের চোখ দেখেছিল বেলা। মায়া মমতাহীন কালো চোখ দুটোতে কোনো পিউপিল ছিল না। শুধু দুইটা গর্ত যেন নরকের অতল তল পর্যন্ত চলে গেছে। ঠিক সেরকম দুটো চোখ এখন তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
নিঃশ্বাস আটকে বসে রইল বেলা। অবশেষে কথা বললেন লোকটা। নিচু আর ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠস্বর শুনে কিছুটা অবাকই হলো। সামনে ঝুঁকে এলো শব্দগুলো ভালভাবে শোনার জন্য।
“ইসাবেলা কোর্টনি, এখন হতে যোগাযোগ করার জন্য এই নামটা আর কখনোই ব্যবহার করব না। তুমি নিজে এবং অন্যরাও তোমাকে সম্বোধন করবে লাল গোলাপ নামে। বুঝতে পেরেছো?”
মাথা নাড়ল বেলা। হাতে ধরা সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে একরাশ ধোঁয়ার মেঘের মধ্য দিয়ে আবারো কথা বললেন লোকটা। জানালেন,
