এরপর তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখল পুরো ফ্ল্যাট। আদ্রার রুম থেকে শুরু করল। কাপড়, কসমেটিকস, অয়েন্টমেন্ট এমনকি বিছানার চাদরের উপর আদ্রা অলিঙারেসের একটা চুলও পাওয়া গেল না। সব নিশানা উধাও।
লিভিং রুম আর রান্নাঘরেরও একই অবস্থা।
আবারো উঠে বেডরুমে গেল বেলা। রামোনের কার্ডের পিছনে স্টিলের একটা ওয়াল সে আছে। খুলতেই দেখা গেল একটাও ডকুমেন্টস নেই। নিকির বার্থ সাটিফিকেট আর অ্যাডপশন পেপারসও গায়েব।
বিছানার উপর ধপ করে বসে পড়ে পরিষ্কার মাথায় চিন্তা করতে চাইল বেলা। এই পাগলামির পেছনে কোনো যুক্তি থাকতে পারে! সম্ভাব্য সব অ্যাংগেল থেকেই ভাবতে চাইল ঠাণ্ডা মাথায়।
কিন্তু ঘুরে ফিরে মন শুধু একটাই উপসংহারে আসছে; রামোন কোনো গভীর সমস্যায় পড়েছে। তাই বাধ্য হয়েছে নিকি’কে নিয়ে সরে পড়তে। তাই ওর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ দু’জনের নিরাপত্তার জন্য রামোনের কথা মানতেই হবে বেলাকে।
অ্যাপার্টমেন্টে ছেড়ে নিচের রাস্তায় নেমে এলো বেলা। ওপারে একটা বেকারি শপ আছে আর বেকারস্ এর স্ত্রীর সাথে গত কয়েক মাসে ভালই খাতির হয়ে গেছে। দোকানের শাটার টানছিলেন মহিলা। এমন সময় এগিয়ে গেল বেলা।
“হ্যাঁ, আপনি বৃহস্পতিবারে চলে যাবার পর আদ্রা নিকোলাসকে এ্যামে করে বীচের দিকে নিয়ে গিয়েছিল আর দোকান বন্ধ করার আগেই দেখেছি। ফিরে এসেছে। অ্যাপার্টমেন্টেও যেতে দেখেছি কিন্তু তারপর আর দেখিনি।”
অ্যাপার্টমেন্টে ব্লকের আশেপাশে আরো কয়েকজন দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেও সকলে একই কথা জানালো। কয়েকজনে ওদেরকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দেখলেও এরপর আর দেখেনি। একমাত্র বাকি রইল পার্কের কর্ণারের জুতা পালিশওয়ালা। এই লোকটার কাছেই রামোন সব সময় জুতা পালিশ করাতো, মুক্ত হস্তে টিপসও দিত। বেলাও বেশ পছন্দ করে।
“হাই, সিনোরা” বেলা’কে দেখে হাসল লোকটা। জানালো, “বৃহস্পতিবারে আমি অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করি। সিনেমা আর আর্কেড থাকে। দশটার সময় মারকুইসকে দেখেছি। দু’জন লোককে নিয়ে এসেছেন, সাথে বড় একটা কালো গাড়ি। রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে সবাই উপরে উঠে গেছে।
“অন্য লোকগুলো দেখতে কেমন ছিল চিকো? তুমি চেনো? আগে কখনন দেখেছ?”
“না। তবে বেশ কঠিন চেহারা পুলিশের মত। এরা এত ঝামেলা করে, তাই আমি পুলিশধ পছন্দ করি না। সবাই মিলে উপরে গিয়েও একটু পরেই নেমে এসেছে। সঙ্গে আদ্রা। আদ্রা’র কোলে নিকো বেবি। গাড়িতে উঠে সবাই একসাথে চলে গেছে। এরপর আর দেখিনি ওদেরকে।”
পুলিশ ছিল, তার মানে ইসাবেলা’র সন্দেহই সত্যি। রামোন বাধ্য হয়ে এসব করেছে। বুঝতে পারল রামোনের কথামতো কাজ করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। তাই অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এসে তাড়াতাড়ি প্যাক আপ শুরু করে দিল। ম্যাটারনিটি ক্লথসগুলো মেঝেতে ফেলে রেখে ভালো কাপড়গুলো দুটো সুটকেসে ভরে নিল।
কসমেটিকস্ এর ড্রয়ার খুলতেই দেখল নিকির জন্মের পর থেকে তোলা ছবিসহ মোটাসোটা অ্যালবামটা নেই। এমনকি লেগেটিভগুলো’ও নিয়ে গেছে ওরা। ভাবতেই দুলে উঠল সারা পৃথিবী যে ওর কাছে সন্তানের কোন চিহ্নই রইল না। কোনো ছবি, রেকর্ড, ব্যবহারী জিনিস, কিছু না; শুধু উলের জুতাটা কেমন করে যেন পেয়ে গেছে।
পেটমোটা স্যুটকেস দুটো নিয়ে নিচে নেমে তুলে ফেলল মিনি’র পেছনে। তারপর রাস্তা পার হয়ে গেল বেকার’পত্নীর দিকে।
“যদি আমার হাজব্যান্ড ফিরে এসে আমার কথা জানতে চায়, বলবেন যে লন্ডনে চলে গেছি।”
“আর নিকো? আপনি ঠিক আছেন তো সিনোরা?” মহিলার সহৃদয়তা দেখে হাসল বেলা,
“নিকো আমার হাসব্যান্ডের কাছেই আছে। শীঘ্রিই লন্ডনে ওদের সাথে দেখা হবে। ভাল থাকবেন সিনোরা।”
***
উত্তর দিকে যাত্রা মনে হলো আর কখনো শেষই হবে না। গত কয়েকদিন মাথার ভেতর শুরু নিকোলাসের খেলার দৃশ্যই ঘুরছে; মনে পড়ে যাচ্ছে ছেলের সাথে কাটানো শেষ মুহূর্তগুলো। পাগল হতে বুঝি আর দেরি নেই।
ক্রস-চ্যানেল ফেরিতে স্যালুনের হৈ-হট্টগোল এড়াতে ডে’কে উঠে গেল বেলা। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। শীতল বাতাস আর নিজের বিষণ্ণতায় কাঁপতে কাঁপতে অবশেষে নেমে এলো নিচে উইমেনস টয়লেটে। দুধের ভারে ব্যথা হয়ে আছে স্তন। তাই বাড়তি অংশ একস্ট্রা পাম্প করে ফেলে দিতে হল, যা নিকি’র পাওনা ছিল।
“ওহ নিকি, নিকি?” নিঃশব্দে কাঁদতে কাঁদতে ছেলের মুখ মনে করার চেষ্টা করল বেলা। এখনো স্পষ্ট অনুভব করে শিশু শরীরের সেই ঘ্রাণ আর ওম।
বহুকষ্টে অবশেষে নিজেকে সামলে মনে করিয়ে দিল, “এখন কিছুতেই ভেঙে পড়া চলবে না। নিকি’র জন্য আমাকে শক্ত হতেই হবে। সুতরাং আর কোনো কান্না নয়।”
বৃষ্টির মাঝে কাদোগান স্কোয়ারের ফ্ল্যাটে পৌঁছাল বেলা। লাগেজ খুলতে খুলতে মনে হল বাবার কাছে করা প্রমিজের কথা। আর কী যে হল, হাতের ড্রেস ছুঁড়ে ফেলে দুদ্দাড় করে দৌড় দিল ড্রইং রুমে।
“আমি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউনে একটা ইন্টারন্যাশনাল কল করতে চাই।”
রাত হয়ে যাওয়াতেও মাত্র দশ মিনিটেরও কম সময়ে লাইন পাওয়া গেল। ওপাশে পরিচারকদের কেউ একজন ফোন তুলতেই আর বাবাকে চাইতে পারল না হতভম্ব বেলা। এটা সে কী করতে যাচ্ছিল। মনে পড়ে গেল রামোনের হুমকি। “অবাধ্য হলে নিকি’র পরিণাম হবে ভয়াবহ।”
