সাতটার খানিক আগে গ্যালারিতে ইসাবেলার কাছে এলো দ্বাররক্ষী।
“আপনার জন্য ভালো একটা সংবাদ এনেছি মারকুইসা। একটা রুম খালি হয়েছে। আপনার ব্যাগজেও পাঠিয়ে দিয়েছি উপরে।”
একশ ফ্রাংক টিপস্ দিয়ে রুমে ঢুকেই মালাগাতে ফোন করল বেলা। আশা করেছিল রামোন হয়ত আদ্রার কাছে কোনো মেসেজ রাখবে; কিন্তু না, ঘটনা তার চেয়েও ভয়াবহ। একশ বার রিং হলেও কোনো উত্তর এলো না। ভয় পেয়ে গেল বেলা। রাতে আরো দু’বার চেষ্টা করেও কোনো লাভ হলো না।
“ফোন বোধহয় কাজ করছে না। নিজেকে বোঝাতে চাইলেও সারারাত একটুও ঘুমোত পারল না।
সকালে এয়ারলাইন রিজার্ভেশন অফিস খোলার সাথে সাথেই মালাগার ফ্লাইটে সিট বুক করে নিয়ে দুপুরেরও পরে নিজ অ্যাপার্টমন্টে পৌঁছে গেল বেলা।
ট্যাক্সি থেকে নেমে ব্যাগটাকে কোনোমতে হেঁটে হেঁচড়ে সদর দরজার কাছে এসে থামল। দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তিতে অবসন্ন হাতে কাঁপতে কাঁপতে চাবি ঢোকাল তালা’তে।
ভূতের বাড়ির মতো নির্জন হয়ে আছে পুরো অ্যাপার্টমেন্ট। খোলা দরজা দিয়ে শুনতে পেল নিজের গলার আওয়াজ।
“আদ্রা, আমি ফিরে এসেছি। কোথায় তুমি?”
আত্রা’র রুমের দিকে যেতে যেতে রান্নাঘরেও চোখ বুলালো বেলা। ধুপধাপ করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে নিজের বেডরুমের সামনে গিয়ে দেখে হাট করে খুলে রয়েছে দরজা। নিকির দোলনাটা থাকলেও দেখল না আর টেডি বিয়ারগুলো উধাও।
ছাদের দরজাতে গিয়েও দেখে এলো। নেই নিকির প্র্যাম।
“আদ্রা!” অসম্ভব ভয় পেয়ে গেল বেলা, “তুমি কোথায়?”
দৌড়ে অন্য রুমগুলোতেও কেবল ঘুরে ঘুরে চিৎকার করতে লাগল, “নিকি! মাই বেবি! ওহ্ গড় প্লিজ। তুমি নিকি’কে কোথায় নিয়ে গেছ?”
আবারো বেডরুমে নিকির শূন্য দোলনার কাছে ফিরে এলো বেলা।
“আমি কিছুই বুঝতে পারছি না? কী হয়েছে সবার?”
কী মনে হতেই নিকি’র ড্রয়ার খুলতেই কেঁপে উঠল সারা গা। ন্যাপি, ভেস্ট, জ্যাকেট কিছু নেই।
“হাসপাতাল!” ফোঁপাতে ফোঁপাতে নিজেকেই শোনাল, “নিশ্চয় কিছু হয়েছে ওর!”
দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে টেলিফোনে হাত দিয়েই জমে গেল বেলা। টেপ দিয়ে একটা খাম আটকে রাখা হয়েছে যন্ত্রটার ক্রেডলে। ধপ করে রিসিভার ফেলে দিয়ে খামটা খুলল বেলা। হাত এতটাই কাঁপছে যে নোটের লেখা প্রায় কিছুই পড়তে পারছে না।
যাই হোক রামোনের হাতের লেখা দেখার সাথে সাথে চিনতে পারলেও স্বস্তি উড়ে গেল পড়তে গিয়ে :
“নিকোলাস আমার কাছেই আছে। কিছু সময়ের জন্য নিরাপদে থাকবে। তুমি যদি আবার ওকে দেখতে চাও, তাহলে বিনা বাক্য ব্যয়ে নিচের নির্দেশগুলো অনুসরণ করো। মালাগা’তে কারো সাথে কিছু বলবে না। এখনি ফ্ল্যাট ছেড়ে লন্ডন চলে যাও।
কাদোগান স্কোয়ারেই তোমার সাথে যোগাযোগ করা হবে। কাউকেই বলবে না যে কী ঘটেছে, এমনকি তোমার ভাই মাইকেলকে’ও না। সবকিছু অক্ষরে অক্ষরে পালন না করলে নিকি’র পরিণাম হবে ভয়াবহ। হয়ত কখনো আর ওকে দেখবেই না। এই নোটটাও নষ্ট করে ফেলল।
বেলা’র মনে হল কোমরের কাছ থেকে সবকিছু অবশ হয়ে গেছে। দেয়ালের সাথে ঘসে ঘসে টাইলসের মেঝেতে বসে পড়ল অথবের মত। বারে বারে পড়ল হাতের নোট; কিন্তু মাথা যেন কাজ করছে না।
কোলের উপর কাগজের টুকরাটাকে ফেলে দিয়ে শূন্য চোখে তাকিয়ে রইল ওপাশেরে দেয়ালের দিকে।
জানে না কতক্ষণ বসে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বহুকষ্টে টেনে তুলল নিজেকে। দেয়াল ধরে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। আরো একবার সিঁড়ি দিয়ে উঠে সোজা এগিয়ে গেল বেডরুমে রামোনের কার্বাডের দিকে। দরজা খুলতেই দেখতে পেল খালি কার্বাড। এমনকি কোট হ্যাঁঙ্গারগুলোও নেই, চেস্ট অব ড্রয়ারের কাছে গিয়েও দেখা গেল সব শূন্য। কিছুই রেখে যায়নি রামোন।
আবারো নিকির দোলনার কাছে ফিরে এলো বেলা। বোমা বিস্ফোরণে আহত ব্যক্তির মতো দিকবিদিগ জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে মেয়েটা। ছেলের নাম ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল, “ওহ্ নিকি, বাছা আমার, ওরা তোমার সাথে কী করছে?”
হঠাৎ করেই দোলনার কাঠের বার আর বেবি ম্যাট্রেসের ফাঁক গলে কিছু একটা পড়ে গেল মাটিতে। মনে হল বেদীর সামনে থেকে প্রসাদ নিচ্ছে; এমনভাবে হাঁটু গেড়ে বসে নিকি’র উলের নরম জুতায় মুখ ডুবিয়ে দিল বেলা, প্রাণ ভরে গন্ধ নিল ছোট্ট দেহটার। এতটা কাদল যে নিঃশেষ হয়ে গেল সব শক্তি। ততক্ষণে ছাদ গলে বেডরুমেও নেমে এলো অন্ধকার। কোনোমতে বিছানায় উঠেই ঘুমিয়ে পড়ল বেলা। গালের কাছে ধরে রইল উলের ছোট্ট জুতাটা।
ঘুম থেকে জেগে উঠেও দেখল অন্ধকার হয়ে আছে চারপাশ। বহুক্ষণ পর্যন্ত বুঝতেই পারল না কোথায় আছে, কী হয়েছে। এরপর চেতনা ফিরে পেতেই ধড়মড় করে উঠে বসল।
বিছানার পাশের টেবিলে পড়ে আছে রামোনের নোট। হাতে নিয়ে আবারো পড়ল। তারপরেও মনে হল কিছুই বুঝতে পারছে না।
“রামোন, মাই ডার্লিং, কেন আমাদের সাথে এমন করছ?” ফিসফিস করে বলে উঠলেও বাধ্য মেয়ের মতো বাথরুমে গিয়ে টয়লেট বোলের উপর ছোট্ট ছোট্ট কুচি করে ফেলল পুরো কাগজ। তারপর ফ্লাশ করে দিল। জানে যা পড়েছে মাথা থেকে তা কখনোই যাবে না, তাই এই ভয়ংকর কাগজটা সাথে রাখার কোনো প্রয়োজন কিংবা ইচ্ছে কিছুই নেই।
গোসল করে কাপড় পরে টোস্ট আর কফি বানাল। সবকিছুই বড় বেশি বিস্বাদ লাগল মুখের ভেতরে।
