“যদি এই মেয়েটা আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে থাকে তাহলে অপারেশনের পরবর্তী পর্যায়ে যাবার আগে অবশ্য ওকে সময় দিতে হবে বাচ্চাটার সাথে ভাব করার জন্য।”
“কবে হবে সেটা?” জানতে চাইলেন সিসেরো।
“হয়েও গেছে ইতিমধ্যে। ফসল তোলার জন্য প্রস্তুত। সবকিছুই ঠিকঠাক মতো চলছে। শুধু এই শেষ দৃশ্যেও আপনার সহযোগিতা দরকার। এ কারণেই এই মিটিং এর জন্য প্যারিসকে বেছে নিয়েছি।”
মাথা নাড়লেন সিসেরো। “চালিয়ে যাও।”
এরপর পাঁচ মিনিট ধরে কথা বলে চলল রামোন। কোনো মন্তব্য ছাড়াই শুনলেন সিসেরো। কিন্তু মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন যে অপূর্ব হয়েছে প্ল্যানটা।
“ঠিক আছে।” অবশেষে জানালেন জেনারেল। “তোমাকে আগে বাড়ার অনুমোদন দেয়া হলো। আর অনুরোধ করেছ তাই শেষটার দেখভাল করব।”
বাস্টিলে ট্রেন পৌঁছাতেই কাগজ ভাঁজ করে উঠে দাঁড়ালেন সিসেরো।
দরজা খুলে যেতেই একবারও পিছনে না তাকিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে গেলেন
***
রামোন যেদিন চলে গেল সেদিনই সন্ধ্যায় লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নোটিশ এলো বেলা’র কাছে।
ইসাবেলা কোর্টনিকে ডক্টর অব ফিলোসফী ডিগ্রিতে ভূষিত করা হয়েছে।
সাথে সাথেই ওয়েল্টেভ্রেদেনে ফোন করল বেলা। মালাগা আর কেপ টাউনের সময়ের পার্থক্য খুব বেশি না। মাত্রই পোলো মাঠ থেকে ফিরেছেন
নিচ তলার স্টাডিতে মেয়ের ফোন ধরেই চিৎকার করে উঠলেন, “সন অফ আ গান!” বাবার উচ্ছ্বাস টের পেল বেলা। “ওরা তোমাকে কবে টুপি পরাবে ডার্লিং?”
“জুন-জুলাইয়ের আগে না। ততদিন পর্যন্ত থাকতে হবে।” এই বাহানাই মনে মনে খুঁজছিল বেলা।
“অবশ্যই।” সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলেন শাসা। “আমি’ও আসব তখন।”
“ওহ ড্যাডি, কতটা দূর!”
“বাজে কথা বলো না ড, কোর্টনি। আমি এটা কোনো মতেই মিস্ করতে চাইনা। তোমার দাদীও হয়ত আসতে চাইবেন সঙ্গে।” অদ্ভুত হলেও বেলা ভাবল যাক এই সুযোগে রামোন আর নিকি’র সাথে ওদের দেখা করিয়ে দেওয়া যাবে।
এই মুহূর্তে অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে রামোনের সঙ্গেই বেশি অভিপ্রেত হলেও সে রাতে কিংবা পরের দিনও ফোন করল না ছেলেটা। বৃহস্পতিবার সকাল হতে হতে তো চিন্তায় পাগল হবার দশা।
অবশেষে যখন ফোন বেজে উঠল তখন রসুনের কোয়া নিয়ে রান্নাঘরে ঝগড়া করছে বেলা আর আদ্রা।
“রামোন ডার্লিং, আমি তো চিন্তায় অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম। তুমি ফোন করোনি কেন?”
“অ্যায়াম সরি বেলা।” ভরাট কণ্ঠস্বর শুনে গলে গেল বেলা।
“তুমি কি এখনো আমাকে ভালবাসো?”
“প্যারিসে এসো, প্রমাণ দিচ্ছি।”
“কখন?”
“এখনি। এয়ার ফ্রান্স’র এগারোটার ফ্লাইটে তোমার জন্য রিজার্ভেশন দিয়েছি। এয়ারপোর্টে টিকেট পেয়ে যাবে। দুটোর মধ্যে পৌঁছে যাবে এখানে।”
“তোমার সাথে কোথায় দেখা করব?”
“প্লাজা এথেনী’তে স্যুট বুক করেছি আমাদের জন্য।”
“তুমি আমাকে নষ্ট করে ফেলছ রামোন ডার্লিং?”
“এর কম কিছুও তোমার প্রাপ্য নয়।”
তৎক্ষণাৎ তৈরি হয়ে বের হয়ে এলো বেলা। কিন্তু এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইট চল্লিশ মিনিট ডিলে হলো। ব্যাগেজ পেতে দেরি হওয়ায় বিকেল পাঁচটারও পরে রাজসিক প্লাজা অ্যাথনী’র সামনে এসে পৌঁছাল বেলা’র ট্যাক্সি।
মনে ক্ষীণ আশা ছিল যে কাঁচের দরজা ঠেলে ঢুকতেই দেখবে উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছে রামোন। কিন্তু না, কেউ নেই। রিসেপশন ডেস্কের উল্টো দিকে সোনালি কারুকাজ করা আর্মচেয়ারে বসে থাকা লোকটার দিকে খেয়াল না করেই কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল বেলা।
“আপনাদের গেস্ট মারকুইস ডি সান্তিয়াগো ই মাচাদো’র স্ত্রী আমি।”
“এক মিনিট, ম্যাডাম।” লিস্ট চেক করে কিছুই পেল না উর্দিধারী ক্লার্ক। তারপর কী ভেবে দ্বিতীয়বার চেক করল।
“আমি দুঃখিত, মারকুইসা। মারকুইস এখানে নেই।”
“হয়তো উনি মঁসিয়ে মাচাদো নামে রেজিস্টার করেছেন।
“না। এই নামেও কেউ নেই এখানে।”
দ্বিধায় পড়ে গেল ইসাবেলা। “আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আজ সকালেও তো কথা বলেছিলাম।”
“ঠিক আছে, আমি আবার চেক করছি।” বুকিং ক্লার্কের সাথে কথা বলে সাথে সাথে ফিরে এলো লোকটা। “আপনার হাজব্যান্ড এখানে নেই আর কোনো রিজার্ভেশনও দেননি।
“হয়ত ওর দেরি হচ্ছে। নিজেকে সামলাতে চাইল বেলা, “কোনো রুম পাওয়া যাবে?”
“হোটেলের সব রুম বুকড় হয়ে গেছে।” ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে হাত জড়ো করল লোকটা, “এখন বসন্ত। বুঝতে পারছেন মারকুইসা। প্যারিস পর্যটকের ভিড়ে ভরে গেছে।”
“ও নিশ্চয় আসবে।” জোর করে হাসতে চাইল ইসাবেলা “আমি যদি গ্যালরিতে অপেক্ষা করি, কিছু হবে?”
“মোটেই না, মারকুইসা। ওয়েটার আপনাকে কফি এনে দিবে। স্টোরে ব্যাগেজের দিকে খেয়াল রাখবে পোর্টার।”
বেলা লম্বা গ্যালারির দিকে এগোতেই আর্মচেয়ার থেকে উঠে বসল সে ভদ্রলোক। কিন্তু নিজের ভাবনায় মগ্ন হয়ে থাকা ইসাবেলা খেয়ালই করল না অসুস্থের মতো হাঁটতে থাকা লোকটাকে। রাস্তায় নেমে ডোরম্যানের এনে দেয়া ট্যাক্সিতে চড়ে গ্রেনেল চলে এলেন সিসেরো। শেষ ব্লক হেঁটে পৌঁছে গেলেন সোভিয়েত অ্যামব্যাসিতে। নাইট ডেস্কের গার্ড দেখা মাত্র চিনতে পারল জেনারেলকে।
দ্বিতীয় তলার মিলিটারি অ্যাটাশে’র অফিস থেকে মালাগা’তে ফোন করলেন সিসেরো।
“মেয়েটা হোটেলে পৌঁছে গেছে।” খসখসে কণ্ঠে জানালেন অপর পার্শ্বের শ্রোতাকে। আগামীকাল দুপুরের আগে ফিরতে পারবে না। পরিকল্পনা মতো কাজ শুরু করে দাও।”
