“উনারা পছন্দ করেছেন; অন্তত বিরক্ত তো হননি।” উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল বেলা।
ডেলিভারী ডেট থাকা সত্ত্বেও তিনদিনের জন্য লন্ডন উড়ে গেল। যতটা ভেবেছিল তার চেয়েও ভাল হয়েছে ভাইভা কিন্তু মালাগা’তে আসতে আসতে জান বের হবার দশা।
“যতটা সম্ভব দ্রুত জানাবার প্রমিজ করেছেন উনারা? কিন্তু মনে হচ্ছে সব ভালোই হবে-” রামোনকে জানাল বেলা।
চাঁদের আলোয় শুয়ে আছে দু’জনে; এমন সময় শুরু হল প্রসব বেদনা।
চুপচাপ শুয়ে শুয়ে নিশ্চিত হতে চাইল বেলা। বুঝতে পারল সময় হয়ে গেছে। রামোন’কে জাগাতেই তড়িঘড়ি পাজামা পরে ছুটল নিচ তলায় আদ্রা’কে ডাকতে।
ইসাবেলা’র স্যুটকেস তৈরিই ছিল। তিনজনে মিলে উঠে বসল মিনি’তে। পেছনের সিটে ইসাবেলা’কে শুইয়ে দিয়ে ক্লিনিকের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছোটাল মোন।
বাচ্চা বড় হওয়া সত্ত্বেও কোনো সমস্যা হল না। দ্রুত আর প্রাকৃতিকভাবেই সাঙ্গ হল সবকিছু।
বহুকষ্টে একটা কনুই’র উপর ভর দিয়ে উঠে চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দিল ঘামে ভেজা চুল। কী হয়েছে? ছেলে?”
জানতে চাইল উদ্বিগ্ন বেলা। চকচকে লাল ছোট্ট দেহটা তুলে ধরলেন ডাক্তার।
চোখ দুটোকে শক্ত করে বন্ধ রেখেছে ছোট্ট মানুষটা। মুখটা বেগুনি হয়ে আছে। ঘন, কালো চুলগুলো লেপ্টে আছে মাথার সাথে। নিজের হাতের বুড়ো আঙুলের সমান সন্তানের পুরুষাঙ্গ দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠল বেলা, “ছেলে! ছেলে আর একজন কোর্টনি!”
সন্তানের মুখ দেখার সাথে সাথে, ওকে দুধ খাওয়াতে গিয়ে নিজের ভেতরের মাতৃত্ব ভাব টের পেয়ে বিস্মিত হয়ে গেল বেলা। কোথায় লুকিয়ে ছিল এই অনুভূতি; এত শক্তি! বুকের মাঝে চিনচিন করে উঠল আদিম এক ব্যথা।
বাবা’র মতই সুন্দর হয়েছে ছেলেটা। এ সুন্দর কিছু আর কখনো স্পর্শ করেনি বেলা। প্রথম কয়েকদিন তো চোখই ফেরাতে পারে না। রাতের বেলাতেও প্রায় ঘুম ভেঙে দোলনার কাছে গিয়ে দেখে আসে চাঁদের আলোয় ওই ছোট্টমুখখানা। অথবা দুধ খাওয়াবার সময় গোলাপি মুঠি খুলে দেখে ছোট্ট ছোট্ট আঙুলগুলো।
“ও আমার। শুধু আমার।” বারে বারে নিজেকেই যেন শোনায় বেলা; কিছুতেই কাটতে চায় না এই ঘোর।
ক্লিনিকের রৌদ্রস্নাত বড় সড় ঘরটাতে প্রথম তিনদিনের বেশিরভাগটাই ওদের সাথে কাটালো রামোন। বেলার মতো তারও প্রায় একই অবস্থা। দু’জনে মিলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল নাম নিয়ে। আর বিস্তর গবেষণা, কাটছাট শেষে বেলার দিক থেকে ঠিক হল শাসা আর শন আর রামোনের পক্ষ থেকে ঠিক হল হুয়েশা আর ম্যাহন। অবশেষে বাচ্চার নাম ঠিক করা হল নিকোলাস মিগেল রামোন ডি সান্তিয়াগো ই মাচাদো। মাইকেলকে সংক্ষিপ্ত করে ইসাবেলার ইচ্ছে মিগেল রাখা হল।
চতুর্থ দিনে রামোনের সাথে ক্লিনিকে এলো কালো স্যুট পরিহিত তিনজন অসম্ভব ভদ্রলোক। সবার হাতেই ব্রিফকেস। একজন অ্যাটনী, একজন স্টেট রেজিস্টার অফিসের কর্মকর্তা আর তৃতীয় জন হল স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেট।
প্রত্যক্ষদশী হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অ্যাডপশন পেপারে সাইন করল বেলা। নিকোলাসের গার্জিয়ান হিসেবে মেনে নিল মারকুইস ডি সান্তি য়াগো-ই-মাচাদা’কে। রামোন’কে পিতা হিসেবে দেখিয়ে বার্থ সার্টিফিকেট দিল রেজিস্ট্রার।
অবশেষে মাতা-পুত্রের সুস্থ জীবন কামনা করে বিশাল বড় গ্লাসে শেরী পান করে বিদায় নিল তিন ভদ্রলোক। এতক্ষণে ইসাবেলা’কে গভীর আবেগে জড়িয়ে ধরল রামোন।
“তোমার ছেলের পদবী নিশ্চিত হয়ে গেল। ফিসফিসিয়ে বলল রামোন।
“আমাদের ছেলে।” ওকে কিস্ করল বেলা।
ক্লিনিক থেকে তিনজনে মিলে বাসায় ফিরতেই ফুল ভর্তি রোল নিয়ে আদ্রা’কে দেখা গেল দাঁড়িয়ে আছে; ওদেরকে স্বাগত জানানোর জন্য। ইসাবেলা চাইল নিজেই নিকি’কে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠবে।
কিন্তু নিয়ে নিল আদ্রা। “ও ভিজে গেছে। আমি চেঞ্জ করে দিচ্ছি।” নিজেকে ইসাবেলার মনে হল যেন এক সিংহী মা, যার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে ছোট্ট শাবক।
পরবর্তী দিনগুলোতে দেখা গেল অনুচ্চ এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল এই দুই নারীর মাঝে। ইসাবেলা জানে যে শিশু লালন-পালনে আদ্রা সিদ্ধহস্ত। তারপরেও নিজেকে সংবরণ করতে পারে না। তাই নিকি সবকিছু একাই করতে চায়।
নিকি’র চেহারায় ধীরে ধীর ফুটে উঠল পিচু রঙা আভা। ঘন কালো চুলগুলোও কোকড়া হয়ে গেল। প্রথমবার চোখ মেলতেই দেখা গেল ঠিক বাবার মতো সবুজ চোখ পেয়েছে। ইসাবেলা’র মনে হলো এটাই বোধহয় দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মিরাকল।
দুধ খাওয়াতে গিয়ে ছেলেকে শোনায়, “তুমি ঠিক বাবার মতই সুন্দর হয়েছ, সোনা। একমাত্র এই কাজটাতেই ভাগ বসাতে পারে না আদ্রা।
য়েক মাসের মাঝেই সবার বেশ প্রিয় হয়ে উঠল ইসাবেলা। ওর সৌন্দর্য, সদয় আচরণ, গর্ভাবস্থা আর ভাষা শেখার দারুণ আগ্রহ দেখে বেজায় খুশি দোকানদাররা।
তাই, প্রায় দশদিনের দিন নিকি’কে প্র্যামে বসিয়ে পুরো গ্রাম ঘুরিয়ে আনল বেলা। এও মজা হল যে ফ্ল্যাটে ফিরল একগাদা প্রশংসা আর অসংখ্য উপহার নিয়ে।
ইস্টার ডে’তে বাড়িতে ফোন করার পর চিৎকার করে উঠলেন নানা : “স্পেনে এত কিসের জরুরি কাজ যে ওয়েল্টেভ্রেদেনে বাসায় ফিরতে পারছ না?”
“ওহ নানা, আই লাভ ইউ অল। কিন্তু এখন যে কিছুতেই সম্ভব না।”
“ইয়াং লেডি, তোমাকে আমি ভালই চিনি। জানি কোনো অ-কাজ নিয়ে তুমি ব্যস্ত; ট্রাউজার তাই না?”
