ইসাবেলা’কে স্প্যানিশ সেখানের দায়িত্বও নিয়েছে আদ্রা। আর বেলার উন্নতি দেখে তো রামোন নিজেই অবাক হয়ে গেছে। মাসখানেকের ভেতর স্থানীয় সংবাদপত্র পড়ার পাশাপাশি প্লাম্বার, টেলিভিশন রিপেয়ার ম্যান কিংবা বাজারের মুদি দোকানদারদের সাথে ঝগড়ার সময় আদ্রা’কে সাহায্য করার পুরোপুরি পাকা হয়ে গেছে বেলা।
ইসাবেলা’র পরিবার নিয়ে জানতে চাইলে নিজের কথা কিছুই বলে না আদ্রা। বেলা ভেবেছিল হয়ত স্থানীয়-ই হবে। কিন্তু একদিন সকালবেলা পোস্ট বক্সে নিজেদের মেইলের সাথে দেখেছে হাভানা, কিউবার স্ট্যাম্প লাগানো। আদ্রার চিঠি।
“তোমার স্বামী কিংবা পরিবারের কেউ কি লিখেছে আদ্রা? কিউবা থেকে তোমাকে কে লিখে?” জানতে চাইতেই রূঢ়ভাবে আদ্রা বলে উঠল, “আমার বান্ধবী লিখেছে সিনোরা। স্বামী তো কবেই মরে গেছে।” দিনের বাকি সময়টুকু জুড়ে কেমন যেন মৌন হয়ে রইল। সপ্তাহের শেষ নাগাদ গিয়ে পুরোপুরি স্বাভাবিক হল। তাই কিউবা বিষয়ে আর কোনো কথা তুলল না বেলা।
ইসাবেলা’র ডেলিভারীর সময় কাছে চলে এসেছে। তাই আদ্রা আর বেলা। মিলে শিশুদের পোশাক সংগ্রহের কাজে লেগে গেল। একেবারে সবার আগে এ উদ্যোগ নিয়েছে মাইকেল। জোহানেসবার্গ থেকে উৎকৃষ্টমানের তুলা দিয়ে তৈরি বালিশের কাভার, দোলনার চাদর আর উলের বেবি জ্যাকেট এসে পৌঁছেছে এয়ারমেইলে। এছাড়া প্রতিদিন মিনি’তে চড়ে ঘণ্টাখানেক লাগবে এরকম দূরত্বে যতগুলো বেবি শপ আছে সব কয়টা ঘুরে বিশাল কালেকশন বানিয়ে ফেলল বেলা। সাহায্য করল আদ্রা।
বিজনেস ট্রিপ থেকে ফেরার পথে প্রায় এটা সেটা নিয়ে আসে রামোন। মাঝে মাঝে কাপড়ের সাইজ টিন এজারদের মতো হয়ে গেলেও ভুল ধরিয়ে দেয় না মুগ্ধ বেলা। একবার তো এমন একটা প্রাম নিয়ে এলো যে এটার ধারণ ক্ষমতা, চকচকে রঙ দেখে মনে হল রোলস রয়েসের ওয়ার্কশপে তৈরি হয়েছে। নিজের দাদীমা’র বিয়ের পোশাক থেকে নেয়া অ্যান্টিক লেস্ দিয়ে বানানো সিল্কের বাপ্তিম্মের রোব উপহার দিল আদ্রা। ইসাবেলা এতটাই আপ্লুত হয়ে গেল যে রীতিমতো কেঁদে ফেলল। বারে বারে মনে পড়ল ওয়েল্টেভ্রেদেনের কথা, বাবা কিংবা নানা’র সাথে কথা বলার সময় বহুকষ্টে নিজেকে সংবরণ করতে হয় যেন রামোন কিংবা সন্তানের কথা মুখ ফসকে বের হয়ে না যায়। সকলে ভাবছে থিসিসের কাজে কিংবা ছুটি কাটাতেই স্পেন গেছে বেলা।
এর মাঝে বার কয়েক রামোনের কথা মতো ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটা জায়গায় গেছে বেলা। প্রতিবার কোনো একটা খাম কিংবা ছোট প্যাকেট নিয়ে বাসায় ফিরে আসত। তেল আবিবে গেলে নিজের দক্ষিণ আফ্রিকান পাসপোর্ট ব্যবহার করে। কিন্তু বেনগাজী আর কায়রোতে ব্যবহার করে ব্রিটিশ পাসপোর্ট। একদিন কিংবা এক রাতের এসব ট্রিপে কিছুই ঘটে না বলা চলে। কিন্তু বেরির জন্য শপিং করার প্রচুর সুযোগ পাওয়া যায়। একবার তো বেনাগাজী থেকে ফেরার সপ্তাহখানেক পর কর্নেল মুয়ামার গাদ্দাফী সামরিক অভ্যুত্থান করে পতন ঘটান রাজা প্রথম ইদ্রিশের রাজতন্ত্র। নিজের আর শিশু’র নিরাপত্তার কথা ভেবে, স্বস্তি পায় বেলা। তাই বাচ্চার জন্ম না হওয়া পর্যন্ত এরকম আর কোনো কাজ দেয়া হবে না বেলাকে বলে প্রমিজ করে রামোন। এ সমস্ত কাজ কি ব্যাংক নাকি তার জীবনের অন্ধকার দিকের সাথে জড়িত সন্দেহ করলেও কখনো কিছু জানতে চায় না বেলা।
সপ্তাহে একবার রামোনের ঠিক করে দেয়া ক্লিনিকে যায় চেক আপের জন্য। সবসময় সাথে যায় আদ্রা। গাইনোকোলজিস্ট বেশ ভদ্র আর অভিজাত।
“সবকিছুই চমৎকারভাবে এগোচ্ছে সিনোরা। প্রকৃতি তার কাজ করে যাচ্ছে আর সন্তান জন্মদানের জন্য আপনিও বেশ তরুণ আর স্বাস্থ্যবান।
“ছেলে হবে তো?”
“হ্যাঁ। খুব সুন্দর স্বাস্থ্যবান একটা ছেলে। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি।”
প্রাক্তন মুরিশ রাজপ্রাসাদকে ঘষামাজা করে তৈরি হয়েছে এই ক্লিনিক। আধুনিক সব ব্যবস্থা আর যন্ত্রপাতিও আছে।
একবার চেক আপের পর পর্দা ঘেরা কিউবিকলে ইসাবেলা যখন ড্রেস পড়ছে, ওয়েটিং রুমে আদ্রা আর ডাক্তারের কথোপকথন শুনে ফেলে। স্প্যানিশ এতদিনে এতটাই রপ্ত করে ফেলেছে যে দুজনের আলাপ শুনে বেশ টেকনিক্যাল আর স্পেসিফিক মনে হল। ঠিক যেন একই পেশার দু’জন মানুষ কথা বলছে। অবাক হয়ে গেল বেলা।
বাসায় ফেরার সময় অন্যান্য রাবের মতই সমুদ্রের দিকে মুখ করে থাকা রেস্টোরেন্টে বসে আইসক্রীম আর চকলেট সস্ অর্ডার করল বেলা। তারপর আদ্রার কাছে জানতে চাইল,
“তোমাকে ডাক্তারের সাথে কথা বলতে শুনেছি। নিশ্চয় কখনো নার্স ছিলে, তাই না। তুমি তো অনেক কিছু জানো-টেকনিক্যাল শব্দগুলো যে বলছিলে।”
আরো একবার সেই অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া দেখাল আদ্রা।
“আমি তো একটা হাঁদা। এসব কিভাবে জানব।” ককভাবে উত্তর দিয়েই একেবারে ভোম মেরে গেল আদ্রা।
ডাক্তারের কথা মতো এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ডেলিভারী হবে। তাই এর আগেই থিসিস শেষ করতে চায় বেলা। মার্চের শেষ দিনে ফাইনাল পেইজ টাইপ করে লন্ডনে পাঠিয়ে দিল। চিন্তা হল এই ভেবে কেমন হল পুরো গবেষণা। পাঠিয়ে দেয়ার পর মনে হতে লাগল আরো কী কী সংশোধন করা যেত।
যাই হোক এক সপ্তাহের ভেতর ফোন আসল ইউনিভার্সিটি থেকে। ফ্যাকাল্টি এক্সামিনারদের সামনে থিসিস নিয়ে ভাইভা দেবার জন্য ডাকা হল বেলাকে।
