“পুরুষ। নারী কিংবা শিশু কারোরই কিছু বলার নেই?” জানতে চাইল মাইকেল।
“হ্যাঁ, বলতে পারবে-যে কোনো একটা দিক বেছে নিতে পারবে। কিন্তু নিরপেক্ষ থাকার কোনো অপশন নেই।”
“ভিড়ে-ভিড়াক্কার কোনো সুপার মার্কেটে বোমা বিস্ফোরণ হয়ে মারা গেল আপনার নিজের লোক, অনেকে আহতও হল। আপনি অনুতপ্ত হবেন না?”
“অনুশোচনা কোন বৈপ্লবিক অনুভূতি নয়। যেমন বণর্বাদের অপরাধীদের কাছেও এটা কোনো অনুভূতিই নয়। তাই যারা মৃত্যুবরণ করে হয় তারা সাহস আর সম্মানের সাথে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে, নতুবা শত্রুর ক্ষয় ক্ষতিতে সামিল হয়েছে। যুদ্ধ ক্ষেত্রে এদেরকে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই, বরঞ্চ কাঙিক্ষতই বলা চলে।”
নোটপ্যাডের উপর খসখস করে লিখে চলেছে মাইকেল। ভয়ংকর এসব ঘোষণা শুনে রীতিমতো কাঁপছে, একই সাথে বেশ উত্তেজনাও বোধ করছে।
মনে হচ্ছে। মথ পোকার মতই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে আগুনের কাছে। মানুষটার ক্রোধের উত্তাপে না জানি পুড়েই যায় সে। জানে শব্দগুলোর হুবহু রেকর্ড রাখলেও এতটা আবেগ কিছুতেই ফুটে উঠবে না ছাপা কাগজে।
সময় এতটা দ্রুত চলে যাচ্ছে যে একটা সেকেন্ডও যাতে নষ্ট না হয়, হিমমিস খাচ্ছে মাইকেল। তাই হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে রাতেই তাবাকা উঠে দাঁড়ালেও চাইল বাধা দিতে।
“আপনার যে শিশু যোদ্ধাদের কথা বলেছেন, তাদের বয়স কত?”
“অস্ত্র হাতে সাত বছর বয়সী বাচ্চাদেরকেও দেখাতে পারি আপনাকে আর সেকশনের কমান্ডার হিসেবে পাবেন দশ বছর বয়সীদেরকে।”
“আমাকে দেখাবেন?” হতবাক হয়ে গেল মাইকেল, “সত্যিই কি আমাকে দেখাবেন?”
দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত মাইকেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন রালেই। মনে হচ্ছে রামোন মাচাদো’র কথাই ঠিক। লোকটা অসম্ভব বুদ্ধিমান। একে ভালই কাজে লাগানো যাবে। তার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য পুরোপুরি ফিট এই মাইকেল। লেনিনের “উপকারী বোকার” মত। প্রথমে একে ব্যবহার করতে হবে কোদাল আর লাঙলের ফলা দিয়ে জমি চাষ করার মতো করে। আর তারপরই যখন সময় এসে যাবে, হয়ে উঠবে যুদ্ধের তলোয়ার।”
“মাইকেল কোর্টনি” নরম স্বরে জানালেন তাবাকা, “আমি আনপাকে বিশ্বাস করছি। মনে হচ্ছে আপনি আসলেই বেশ ম্ল আর জ্ঞানী। যদি আপনিও আমার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পারেন। তাহলে এমন সব জায়গায় নিয়ে যাবো যা নিয়ে কেবল স্বপ্নই দেখেছেন এতদিন। সোয়েতো’র রাস্তায় নিয়ে যাব। আমার লোকদের হৃদয়ে আর হ্যাঁ, শিশুদেরকেও দেখাব।”
“কবে?” জানে সময় আর বেশি নেই, তাই উদ্বিগ্ন মুখে জানতে চাইল মাইকেল।
“শীঘ্রিই।” প্রমিজ করল রালেই আর সাথে সাথে সদর দরজা খোলার আওয়াজ পাওয়া গেল। “আমি আপনাকে কিভাবে খুঁজে পাবো?”
“আপনি পাবেন না। আমিই আপনাকে খুঁজে নেব।”
সিটিং রুমের জোড়া দরজা খুলে যেতেই দোরগোড়ায় দেখা গেল এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। রালেই তাবাকা’কে নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও লোকটাকে দেখে জমে গেল মাইকেল। স্ট্রিট ক্লথ পরনে থাকলেও দেখার সাথে সাথে তাকে চিনে ফেলল। কেন্ড্রিক নামটা শুনে আগেই ঠাওর করার দরকার ছিল আসলে।
“ইনি হচ্ছেন আমাদের হোস্ট, এই অ্যাপার্টমেন্টের মালিক।” পরিচয় করিয়ে দিলেন তাবাকা। “অলিভার কেন্ড্রিক, ইনি মাইকেল কোর্টনি।”
হাসলেন অলিভার কেন্ড্রিক। ব্যালে ডাঙ্গার সুলভ ঝরণার মতো এগিয়ে এসে মাইকেলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। ঠাণ্ডা হাতটা’র হাড়গুলো ঠিক পাখির মতই হালকা। পরিস্কার বোঝা গেল কেন লোকে তাঁকে “দ্য ব্ল্যক সোয়ান” নামে ডাকে। পাখির মতই লম্বা, অভিজাতগলা আর চোখ জোড়া তো দ্রুতটাই আলো ছড়াচ্ছে যেন চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে কোন পুল। একই রকম গাঢ় দ্যুতি ছড়াচ্ছে দেহত্বক।
কেন্ড্রিক এগিয়ে আসতেই মনে হল দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে মাইকেল। স্টেজের রোমান্টিক আলোর চাইতেও বেশি সুদর্শন লাগছে বাস্তবের অলিভারকে। মাইকেলের হাত ধরা অবস্থাতেই রালেই’র দিকে তাকালেন অলিভার। “এত তাড়াহুড়া কিসের, রালেই?” মনে হল যেন পশ্চিম ভারতীয় গানের ছন্দে আকুতি জানালেন।
“আমাকে যেতেই হবে।” মাথা নাড়লেন তাবাকা। “প্লেন ধরতে হবে।”
আবারো মাইকেলের দিকে ফিরলেন অলিভার। এখনো ওর হাত ধরে আছেন। “এত জঘন্য একটা দিন গেছে না। মনে হচ্ছে মরেই যাবো। আমাকে একা রেখে যাবেন না মাইকেল। এখানে থাকুন। মনে হচ্ছে বেশ মজা হবে। তাই না?”
অলিভারকে ভেতরে রেখে ফ্ল্যাট ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন তাবাকা। কিন্তু বিল্ডিং এর বাইরে নয়। এর বদলে লোক এসে রালেই’কে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল খানিক দূরের দ্বিতীয় আরেকটা ফ্ল্যাটে। ছোট্ট রুমটাতে তাবাকা’কে দেখেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল দ্বিতীয় আরেকজন। লোকটাকে ইশারায় বসতে বলে জানালার দিকে এগোলেন রালেই। লম্বা আর চিকন কাঠামোটা দেখতে পুরোপুরি একটা ফুল লেংথ ড্রেসিং-মিররের মত। আয়না দেখে বোঝা গেল দু’পাশ থেকেই অন্য পাশের সব দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যায়।
আয়নার অপর দিকে দেখা যাচ্ছে অলিভার কেন্দ্রিকের অ্যাপার্টমেন্ট। হালকা অয়েস্টার আর মাশরুম রঙা রুমের বেড কাভারটা চমৎকারভাবে মিশে গেছে কার্পেটের সাথে। আয়নার টাইলস করা সিলিং-এ আলো ফেলছে লুকানো বাতি। বিছানার দিকে মুখ করে থাকা কুঠুরিতে রাখা আছে হিন্দু মন্দির থেকে আনা এক মূল্যবান অ্যান্টিক। রুমটা খালি থাকায় টু ওয়ে আয়নার এপাশের ক্যামেরা ইকুপমেন্টের দিকে চোখ দিলেন রালেই।
