গলি’র মাঝেই মোড় নিয়ে কোণার কাছে থেমে গেল জোভান। মাইকেল কিছু বলতে যেতেই হাত ধরে ওকে থামিয়ে দিল। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করল দু’জন। কেউ তাদেরকে অনুসরণ করছে না নিশ্চিত হবার পরেই কেবল মুঠি আলগা করল জোভান।
“আপনি আমাকে বিশ্বাস করেননি।” হেসে ফেলল মাইকেল। পাশের ডাস্টবিনে ফেলে দিল কার্নেশনস।
“আমরা কাউকেই বিশ্বাস করি না। আবারো পথ দেখাল জোভান। “বিশেষ করে বোয়াদেরকে। প্রতিদিনই তারা নতুন কোনো না কোনো নষ্টামী শিখছে।”
দশ মিনিট পরে বেশ প্রশস্ত আর আলোকিত এক রাস্তায় আধুনিক ফ্ল্যাট ব্লকের বাইরে থামল দু’জনে। সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সব মার্সিডিজ আর জাগুয়ার। যত্ন সহকারে ছেটে রাখা হয়েছে অ্যাপার্টমেন্টের সামনের লন আর বাগান। বোঝাই যাচ্ছে বেশ বড়লোকি হালত এই এলাকার বাসিন্দাদের।
“আমি এখন যাচ্ছি।” বলে উঠল জোভান। “ভেতরে যান। লবি’তে জানাবেন আপনি মিস্টার কেন্দ্রিকের গেস্ট। ফ্ল্যাট-৫০৫।”
ইটালিয়ান মার্বেলের মেঝে, কাঠের প্যানেল লাগানো দেয়াল, সোনালি কারুকাজ করা লিফটের দরজা। উর্দিধারী পোর্টর মাইকেলকে স্যালুট করে জানতে চাইল “ইয়েস, মিঃ কেন্ড্রিক আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন, মিঃ কোর্টনি। প্লিজ ফিফথ ফ্লোরে উঠে যান।”
লিফটের দরজা খুলতেই দেখা গেল শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে দুই কৃষাঙ্গ তরুণ।
“এদিকে আসুন মিঃ কোর্টনি।” কার্পেটে মোড়া প্যাসেজ ধরে ৫০৫ নম্বর ফ্ল্যাটে পৌঁছে গেল মাইকেল।
দরজা বন্ধ হবার সাথে সাথে দ্রুত কিন্তু পুখানুপুঙ্খ বাপে মাইকেলের। দেহ তল্লাশী করল দুই তরুণ। হাত উঁচু করে মাইকেল’ও সাহায্য করল। এরই ফাঁকে সাংবাদিকের দৃষ্টি মেলে দেখে নিল চারপাশ। অর্থ আর রুচির চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছে এই ফ্ল্যাটের সাজসজ্জাতে।
সন্তুষ্ট হয়ে পিছিয়ে দাঁড়াল দুই কৃষ্ণাঙ্গ। একজন আবার মাইকেলের জন্য খুলে দিল সামনের জোড়া দরজা।
বেশ বড়সড় আর সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা একটা রুমে ঢুকল মাইকেল। কনোলী চামড়া দিয়ে মুড়ে রাখা হয়েছে ক্রিম রঙা সোফা আর ইজি চেয়ার। মোটা ওয়াল-টু-ওয়াল কার্পেটের রঙ হালকা কফি। ক্রিস্টাল আর ক্রোম দিয়ে তৈরি হয়েছে টেবিল আর ককটেল বার। দেয়ালে ঝুলছে হনির সুইমিং পুল সিরিজের চারটা বিশাল পেইন্টিং।
একেকটার দাম না হলেও পনের হাজার করে, মনে মনে হিসাব কষে নিল মাইকেল আর তখনি চোখে পড়ল রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার অবয়ব।
ইদানীংকালের ভেতর তার কোনো ছবি ভোলা না হলেও, মেইলের আর্কাইভে থাকা বহু পুরাতন ঝাপসা একটা ছবি দেখাতে, এক নজরেই মানুষটাকে চিনে ফেলল মাইকেল।
“মিঃ তাবাকা” অস্ফুটে বলে উঠল। মাইকেলের মতই লম্বা হলেও কাঁধ বেশ চওড়া আর কোমর সরু।
“মিঃ কোর্টনি” এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিলেন রালেই তাবাকা। পদক্ষেপে বক্সার সুলভ আচরণ।
দৃঢ় আর গম্ভীর গলার স্বরে আফ্রিকার স্পষ্ট অনুরণন পাওয়া গেল। পরনে খাঁটি উলের নতুন স্যুট, সিল্পের টাই’য়ে গুচির নকসা। দেখতেও বেশ সুদর্শন রালেই তাবাকা।
“আপনার সাথে দেখা করার সুযোগ পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ।” বলে উঠল মাইকেল।
“আপনার” রেজ “সিরিজটা আমি পড়েছি।” কালো পাথরের মতো চোখ জোড়া দিয়ে মাইকেলকে দেখছেন তাবাকা, “আমার জনগণকে ভালোই বুঝতে পারেন। তাদের আশা আকাঙ্ক্ষাকেও ভালোভাবেই তুলে ধরেছেন।”
“সবাই অবশ্য আপনার সাথে একমত হবে না। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়িত্বে আছেন যারা।”
হেসে ফেললেন রালেই। পরিষ্কার চকচকে সাদা নিখুঁত দাঁতের সারি। “আমি আপনাকে যা বলব সেটা শুনেও উনারা তেমন খুশি হবেন না। যাই হোক তার আগে একটা ড্রিংক নিন?”
“জিন আর টনিক।”
“হুম, এই জ্বালানি পেয়েই সচল থাকে সাংবাদিকদের মগজ। তাই না?” তাবাকার গলার স্বরে টের পাওয়া গেল অবজ্ঞার ভাব। তারপর বারে গিয়ে নিয়ে এলেন স্বচ্ছ ড্রিংকটুকু।
“আপনি ড্রিংক করেন না?” মাইকেলের প্রশ্ন শুনে আবারো ভ্রুকুটি করলন রালেই।
“এত এত কাজ বাকি আছে, শুধু শুধু মাথা জ্যাম করে লাভ কী?” হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন; “এক ঘন্টা সময় দিচ্ছি আপনাকে, এরপর আমাকে যেতে হবে।”
“আমি এর এক মিনিটও নষ্ট করব না।” মাথা নাড়ল মাইকেল। ক্রিম রঙা কনোলী চামড়ায় মোড়া চেয়ারে মুখোমুখি বসে পড়ল দুজনে : “আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে মোটামুটি সবই জানিঃ জন্ম তারিখ, স্থান, সোয়াজিলল্যান্ডের ওয়াটারফোর্ড স্কুরে আপনার শিক্ষা জীবন। মোজেস গামার সাথে সম্পর্ক, এ এন সি’তে আপনার বর্তমান অবস্থান। তাহলে এখন আগে বাড়ি?”
সম্মতি দিলেন রালেই।
“সন্ত্রাসী” শব্দটা বলতে…” মাইকেলের সংজ্ঞা শুনতে শুনতে রেগে গেলেন রালেই। শরীর শক্ত করে বসে রইলেন। তারপর জানালেন, দক্ষিণ আফ্রিকাতে নিরাপরাধ বলে কেউ নেই এটা একটা যুদ্ধ। তাই কেউই নিজেকে নিরপেক্ষ বলে দাবি করতে পারবে না। আমরা সবাই যোদ্ধা।”
“তরুণ কিংবা বৃদ্ধ কোনো ব্যাপারই না? আপনার জনগণের আকাঙ্খার প্রতি কতটা সহানুভূতিশীল সেটাও ধর্তব্যের বিষয় নয়?”
“না।” আবারো একই কথা বললেন রালেই। “দোলনা থেকে সমাধি, আমরা সবাই যুদ্ধ করছি। দুটো ক্যাম্পের যেকোনো একটাতেই যেতে হবে সবাইকে-নিপীড়িত কিংবা নিপীড়নকারী।”
