“এখন পাজরের কী অবস্থা?” জানতে চাইল মাইকেল। ইসাবেলা আগেই ভাইকে জানিয়েছে যে ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে পাজরের তিনটা হাড় ভেঙে ফেলেছে রামোন।
“তোমার বোন তো আমাকে বন্দি করে রেখেছে। আমার কিছুই হয়নি-এমন কিছু না যে এই অসাধারণ বার্গান্ডি খেয়ে সারবে না। নিজের চরিত্রের বিশেষ সেই চার্ম প্রদর্শন করল রামোন; যার আকর্ষণ কেউ এড়াতে পারে না। স্বস্তির হাপ ছাড়ল বেলা।
বার্গান্ডি নিয়ে রান্নাঘরে গেল ছিপি খোলার জন্য। ভোলা বোতল আর দুটো গ্লাস নিয়ে ফিরে আসতেই দেখল বিছানার পাশের চেয়ারে বসে মাইকেল; ইতিমধ্যেই গল্পে মজে গেছে দু’জনে।
“ব্যাংকে তোমার গোল্ডেন সিটি মেইল’র কপি পড়তে পারি। তোমার ফিনানসিয়াল আর ইকোনমিক কাভারেজ আমার বেশ পছন্দ।”
“আহ, তো তমি ব্যাংকিং পেশায় আছ, বেলা তো আমাকে বলেনি।”
“মার্চেন্ট ব্যাংকিং। বিশেষ করে সাব-সাহারা আফ্রিকা।” জুতা খুলে নীল জিন্সের নিচের অংশ গুটিয়ে রামোনের পাশে বিছানায় উঠে বসল বেলা। আলোচনায় অংশ না নিলেও মনোযোগ দিয়েই শুনল সবকিছু।
তার জানাই ছিল না আফ্রিকা নিয়ে রামোন এতটা ভাবে। বেলার মাতৃভূমির বিভিন্ন স্থান, ব্যক্তি আর ঘটনা সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান এই ছেলের। এই আলোচনার সাথে বেলার সাথে হওয়া পূর্বের সব গল্পই কেমন ফিকে মনে হল। দু’জনের কথা শুনতে শুনতে একেবারে নতুনভাবে অনেক কিছুই উপলব্ধি করল বেলা।
মাইকেলের অবস্থাও একই। এমন কাউকে পেল, বুদ্ধিমান হওয়া সত্ত্বেও যে কিনা তার মতো করেইভাবে।
মধ্যরাত পার হয়ে গেছে; ওয়াইনের প্রথম, বোতল আর বেলার ছোষ্ট্র রান্নাঘর থেকে নিয়ে আসা বোতল-টা’ও শূন্য হয়ে গেছে। পুরো বেডরুম আচ্ছন্ন হয়ে আছে মাইকেলের সিগারেটের ধোঁয়ায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল বেলা : “তোমাকে তো মাত্র একটা ড্রিংকের জন্য দাওয়াত করেছিলাম মিকি আর রামোনের’ও শরীর খারাপ। এখন বিদায় হও।” ভাইয়ের ওভারকোর্ট তুলে নিল বেলা।
“তুমি যদি রাজনৈতিক প্রবাসীদের নিয়ে কোনো সিরিজ করতে চাও তাহলে তো সেটা রালেই তাবাকাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।” বিছানা থেকে নরম স্বরে জানাল রামোন।
অনুতপ্ত হবার মতো করে হাসল মিকি। “তাবাকা’কে পেলে তো বর্তে যেতাম। রহস্যময় সেই মানুষটা। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়।”
“ব্যাংকের বিভিন্ন কাজের সুবাদে উনার সাথে আমার দেখা হয়েছিল। সবার খবরই রাখতে হয়। তুমি চাইলে আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি।” কোটের হাতায় একটা হাত ঢুকিয়ে বরফের মতো জমে গেল মাইকেল।
“গত পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছি। যদি তুমি পারো…”
“আগামীকাল লাঞ্চ টাইমের দিকে ফোন দিও। দেখি কী করতে পারি।” জানাল রামোন।
দরজায় দাঁড়িয়ে বোনকে বিদায় জানানোর সময় মাইকেল বলে উঠল, “তার মানে আজ রাতে তুমি ঘরে ফিরছ না।”
“এটাই তো ঘর।” ভাইকে জড়িয়ে ধরল বেলা। “তোমাকে দেখানোর জন্যই তো সাময়িকভাবে ছিলাম কাভোগান স্কয়ারের ফ্ল্যাটে। এখন আর তার দরকার নেই।”
“তোমার রামোন তো বেশ আকর্ষণীয়।” মাইকেলের কথা শুনে বেলার মনে হঠাৎ করেই কেমন যেন হিংসা জন্ম নিল। মনে হল অন্য কোনো নারী এমনটা বলছে। নিজেকে সামলাতে চাইল বেলা। এই প্রথম মিকি’র কোনো কিছু এতটা খারাপ লাগল। বেডরুমে এসে রামোনের কথা শুনে আরো বেড়ে গেল এই ব্যথ্য বোধ : “তোমার ভাইকে আমার পছন্দ হয়েছে। ওর মতো মানুষ দেখা পাওয়া সত্যিই ভার।”
নিজের কথা ভেবে লজ্জা পেয়ে গেল বেলা। শুধু শুধু মিকি’কে সন্দেহ করল। জানে মাইকেলের প্রাণশক্তি আর বুদ্ধিমত্তার জন্যই ওকে পছন্দ করেছে রামোন-কিন্তু তারপরেও কিসের যেন কাঁটা খোঁচাচ্ছে মনের ভেতর।
বিছানার উপর ঝুঁকে এতটা আবেগ নিয়ে রামোনকে কিস করল যে বেলা নিজেই নিজের উপর অবাক হয়ে গেল। প্রথমে বিস্মিত হলেও পরে রামোনও সাড়া দিল।
অবশেষে শান্ত বেলা বলল, “আমাকে ছেড়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ইউরোপে ঘুরে বেড়িয়েছ; যাও বা এলে বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুধু খাও আর ঘুমাও। “
নিজের প্রয়োজন জানাতে ব্যাকুল হয়ে উঠল বেলা, “নার্সের কথা একটু খেয়াল নেই। এখন আমার সবকিছু শোধ করো মাস্টার রামোন।”
“আমি তো সাহায্য ছাড়া পারব না।” সাবধান করে দিল রামোন।
“ঠিক আছে তুমি শুধু শুয়ে থাকো। বাকি সব আমি দেখছি।”
বুকের ব্যান্ডেজের যেন একটুও ক্ষতি না হয়; এরকম সাবধানে রামোনের উপর উঠে বসল বেলা। সবুজ চোখ জোড়াতে ভেসে উঠতে দেখল ওর মতই ব্যাকুলতা। কেটে গেল সব সংশয়। রামোন তার শুধু তার।
রামোনের সুস্থ বুকের ওমে নিরাপত্তা খুঁজে নিল তৃপ্ত বেলা। আধো ঘুম আধো জাগরণে কথা বলতে শুরু করল দু’জনে। কিন্তু রামোন আবারো মাইকেলের কথা তোলায় ঝিলিক দিয়ে উঠল খানিক আগের দ্বিধা। এতটাই রিলাক্সড মুডে আছে যে ভাবল রামোন’কে সব বলে দেয়া যাক।
“বেচারা মিকি, কখনো বুঝতেই পারি নি যে এত বছর ধরে ও কতটা যন্ত্রণা সহ্য করছে। অন্য যে কারো চেয়ে আমি ওর সবচেয়ে কাছের হয়েও কিছুই টের পাইনি। মাত্র কদিন আগে দুর্ঘটনাবশত জেনে গেছি যে ও হোমো…”
কী বলছে বুঝতে পেরেই চুপ করে গেল বেলা। কাঁপতে কাঁপতে ভাবতে লাগল যে এটা সে কী কল। মাইকেল ওকে বিশ্বাস করে। যাই হোক এরপর যা শুনল তা মোটেও আশা করেনি।
