“আমি ডাক্তারকে ফোন করছি।” বলে উঠল বেলা।
“না, কোনো ডাক্তার ডেকো না!” দুর্বলতা সত্ত্বেও সেই চির পরিচিত শীতল কণ্ঠে আদেশ দিল রামোন। যা অবাধ্য করার সাহস নেই বেলা’র।
“তাহলে কী করব?”
“টেলিফোন আমার কাছে নিয়ে এসো।” তাড়াহুড়া করে সিটিং রুমে দৌড় দিল বেলা।
“রামোন, তোমার অবস্থা বেশ খারাপ। কিছু অন্তত করতে দাও এক বাটি স্যুপ নিয়ে আসি?”
মাথা নেড়ে সম্মতি দিল রামোন। এক মনে ডায়াল করছে ফোন। রান্না ঘরে গিয়ে ক্যান থেকে ঘন ভেজিটেবল স্যুপ নিয়ে গরম করল বেলা। কাজ করতে করতেই কানে এলো স্প্যানিশে কারো সাথে ফোনে কথা বলছে রামোন। কিন্তু এ বিষয়ে জ্ঞান দুর্বল থাকায় আলাপচারিতার কিছুই বুঝল না বেলা। স্যুপ আর প্রো-ভিটা বিস্কেটের ট্রে নিয়ে এসে দেখল ফোন রেখে দিয়েছে রামোন।
“ডার্লিং, কী হয়েছে তোমার? কেন ডাক্তারকে ফোন করতে দিলে না?”
মুখ বাঁকা করে ঠোঁট উল্টালো রামোন। কোনো ব্রিটিশ ডাক্তার যদি দেখে ফেলে এ ক্ষত; তাহলে রিপোর্ট করতে বাধ্য হবে। অন্যদিকে কিউবান অ্যামবাসির ডাক্তার দেখলেও রক্ষে নেই। ফাঁস হয়ে যাবে রামোনের কাভার। তাই বাধ্য হয়ে অন্য ব্যবস্থা করতে হয়েছে। যাই হোক বেলার প্রশ্নের জবাব না দিয়েই জানাল, “এখনি একটু বাইরে যেতে হবে তোমাকে। শ্লোয়ান স্কোয়ার আগ্রাউন্ড স্টেশনের পশ্চিম দিকে প্লাটফর্মে গিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকবে। কেউ একজন তোমাকে একটা খাম দিয়ে যাবে…”
“কে? তাকে চিনবই বা কিভাবে?”
“তুমি চিনবে না।” বেলা’র চিন্তা খারিজ করে দিল রামোন। “সে-ই তোমাকে চিনে নেবে। কিন্তু কোনোভাবেই তার সাথে কথা বলবে না কিংবা চেনার চেষ্টা করবে না। খামের ভেতরে আমার প্রেসক্রিপশন আর চিকিৎসার : যাবতীয় কিছু লেখা থাকবে। পিকাডেলী সার্কাসে গিয়ে প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে দরকারি ওষুধগুলো নিয়ে আসবে। যাও।”
“ঠিক আছে রামোন; কিন্তু এটা তো বলবে যে আঘাত পেলে কিভাবে?”
“যা বলেছি সেভাবেই কাজ করা শিখতে হবে-এত্ত প্রশ্ন করো না তো। এখন যাও!”
“হা যাচ্ছি।” নিজের জ্যাকেট আর স্কার্ফ নিয়ে ঝুঁকে রামোনকে কিস্ করল বেলা।
“আই লাভ ইউ।”
সিঁড়ি দিয়ে অর্ধেক নেমেও গেছে। হঠাৎ করেই একটা কথা মনে পড়াতে থেমে গেল ইসাবেলা। শৈশবের পর থেকে নানা ছাড়া আর কেউ ওর সাথে এতটা হুকুমের স্বরে কথা বলেনি। এমনকি বাবাও অনুরোধ করেন, আদেশ নয়। অথচ এখন স্কুল গার্লের মতই রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে নির্দেশ পালনের জন্য। রাস্তায় নেমে এলো বেলা।
আন্ডারগ্রাউন্ড প্লাটফর্মের শেষ মাথায় তখনো পৌঁছেনি; এমন সময় কে যেন আলতো করে কব্জি ছুঁয়ে পেছন থেকে খাম্ ঢুকিয়ে দিল হাতের মাঝে। কাঁধের উপর দিয়ে তাকাতেই দেখা গেল লোকটা এরই মাঝে উল্টো দিকে হাঁটা ধরেছে।
ডিসপেনসারীর বিক্রেতা প্রেসক্রিপশনটা পড়ে জানতে চাইল : “আপনার কেউ কি খুব মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে?” মাথা নাড়ল বেলা।
“আমি ডাক্তার এলভিসের রিসেপশনিস্ট। এত কিছু জানি না।”
আর কিছু না বলেই ওষুধ প্যাক করে দিল লোকটা।
মনে হচ্ছিল রামোন ঘুমাচ্ছে। কিন্তু বেলা ঢোকার সাথে সাথে চোখ মেলে তাকাল। সে চেহারা দেখেই মনের মাঝে ভয় ফিরে এলো বেলা’র। দুদিনের বাসী মরা’র মতো গায়ের চামড়া; গাঢ় দাগের মাঝে গর্তের ভেতরে ঢুকে আছে চোখ জোড়া। যাই হোক এসব আজে বাজে চিন্তা একপাশে সরিয়ে নিজেকে শান্ত করতে চাইল বেলা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় রেডক্রসের উপর একটা কোর্স করেছিল। এছাড়া ওয়েন্টেলেদেনে ভিজিটিং ডাক্তারের সাথে কুষাঙ্গ কর্মচারীদের। চিকিৎসায় সাহায্যও করেছে। তাই আঙুল কাটা, থেতলানো পা কিংবা ফার্মের মেশিন থেকে পাওয়া অন্যান্য আঘাতও যথেষ্ট দেখেছে।
কেমিস্টের কাছ থেকে আনা ওষুধ বের করে তাড়াতাড়ি পড়ে নিল খামে রাখা টাইপ করা নির্দেশিকা। বেসিনে হাত ধুয়ে পানিতে হাফ কাপ ডেটল মিশিয়ে রামোনকে তুলে বসাল; তারপর খুলতে শুরু করল ব্যান্ডেজ।
রক্ত শুকিয়ে যাওয়ায় ক্ষতের সাথে লেগে গেছে ব্যান্ডেজ। চোখ বন্ধ করে ফেলল রামোন। কপাল আর চিবুকে গড়িয়ে পড়ল হালকা ঘামের ফোঁটা।
“আয়্যাম স্যরি।” ফিসফিস করে ওকে ভোলাতে চাইল বেলা। “চেষ্টা করছি যত কম ব্যথা দেয়া যায়।”
অবশেষে খুলে এলো ড্রেসিং আর ক্ষত দেখে মনে হল গলা ছেড়ে চিৎকার করে উঠবে বেলা। বহুকষ্টে নিজেকে থামাল। বুকের একপাশে বেশ গভীর একটা গর্ত আর দ্বিতীয় ক্ষতটা মসৃণ পিঠের উপর একই জায়গায় জমাট বাঁধা কালো রক্তও দেখা যাচ্ছে। তেতে আছে ক্ষতের চারপাশের চামড়া। ইনফেকশনের হালকা গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে।
দেখা মাত্রই এর কারণ বুঝে গেল বেলা। শেষবার শর্তনের সাথে জাম্বেজী উপত্যকায় শিকারে যাবার পর সন্ত্রাসদের হামলার পর বাটোঙ্কা গ্রামে সাহায্যের জন্য যেতে হয়েছিল। সেখানেই প্রথম দেখেছে একপাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় তৈরি ক্ষত। রামোন ওর দিকে তাকিয়ে থাকায় কিছুই বলল না বেলা; চেষ্টা করল মনের ভাব মুখে না আনতে। চুপচাপ ডিসইনফেক্টাষ্ট দিয়ে ক্ষতের চারপাশ মুছে দিল। এরপর ফ্রেশ ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল।
নিজেও বুঝতে পারল যে ভালই হয়েছে ওর সেবা; তারপরেও নিশ্চিত হল বালিশে শুইয়ে দেবার সময় রামোনের বিড়বিড়ানি শুনে। “গুড়। তুমি ভালোভাবেই জানো কী করছ।”
