‘মন খারাপ করো না, মিকি ডার্লিং।”
“না।” স্বীকার করল মাইকেল। “যতক্ষণ তুমি আমার পাশে আছে।”
***
দুদিন পর। ইন্টারভিউ নিতে বাইরে গেছে মাইকেল। ডেস্কের উপর রাজ্যের বই আর কাগজ পত্র ছড়িয়ে নিয়ে বসে আছে ইসাবেলা। এমন সময় বেজে উঠল ফোন। অন্যমনস্ক থাকায় প্রথমে বুঝতেই পারল না যে কী শুনছে কিংবা কে কথা বলছে।
“রামোন? তুমি? কোনো সমস্যা হয়েছে? কোথায় তুমি? এথেন্সে?”।
“আমি আমাদের ফ্ল্যাটে…”
“এখানে? লন্ডনে?”
“হ্যাঁ। জলদি আসতে পারবে? আই নিড ইউ।”
লাঞ্চ আওয়ারের ট্রাফিকের মাঝ দিয়ে দ্রুত গতিতে মিনি চালিয়ে ফ্ল্যাটে পৌঁছে একেকবারে দুটো করে সিঁড়ি টপকে যখন দরজার সামনে পৌঁছাল মনে হল দম বেরিয়ে যাবে এক্ষুনি।
“রামোন!” কোনো সাড়া না পেয়ে বেডরুমের দিকে দৌড় লাগাল বেলা। রামোনের কিট ব্যাগ বিছানার উপর খোলা পড়ে আছে। মেঝের উপর দুমড়ানো শার্টের গায়ে রক্তের দাগ শুকিয়ে যাওয়া পুরনো রক্ত ছাড়াও নতুন তাজা রক্ত।
“রামোন! ওহ্ ঈশ্বর! রামোন!
শুনছ?
বাথরুমের দরজার দিকে দৌড় দিল বেলা। কিন্তু দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। একটু পিছিয়ে হিলসহ লাথি দিল তালা’য়। জুড়ো’র এই কৌশল ওকে রামোন শিখিয়েছিল। ঠুনকো তালাটা ভেঙে পড়তেই খুলে গেল দরজা।
টয়লেটের পাশে টাইলসের মেঝেতে পড়ে আছে রামোন। পড়ে যাবার সময় বোধহয় ওয়াশবেসিনের উপরকার শেফ ধরে ফেলেছিল, বেসিন আর পুরো মেঝেতে ছড়িয়ে আছে বেলা’র কসমেটিকস্। কোমর থেকে উপর পর্যন্ত পুরোপুরি নিরাভরণ রামোনের বুকে ভারী ব্যান্ডেজ। এক নজর দেখেই বুঝতে পারল যে দক্ষ হাতে কেউ ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছে। শার্টের মতো ব্যান্ডেজের গায়েও ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। কিছু পুরনো, কিছু একেবারে তাজা।
হাঁটু গেড়ে বসে রামোনের দিকে তাকাল বেলা। পার মুখে নাকে সিকনির ঘাম। কোলের উপর রামোনের মাথা নিয়ে ঝুলতে থাকা তোয়ালে দিয়ে কাছের ঠাণ্ডা পানির নল থেকে পানিতে ভিজিয়ে মুছে দিল মুখ আর গলা।
পিট পিট করে উঠল রামোনের চোখের পাতা। তাকাল বেলার দিকে।
“রামোন।”
দৃষ্টি পরিষ্কার হতেই বিড়বিড় করে বলে উঠল, “আমার সারা পৃথিবী দুলছে।”
“মাই ডার্লিং, তোমার কী হয়েছে? কিভাবে এত আঘাত পেয়েছ?”
“আমাকে বিছানায় নিয়ে চলো।” রাইডিং আর টেনিস খেলা বেলা নিজেও যে কোনো পুরুষের মতই শক্তিশালী। কিন্তু রামোন’কে উঠে বসাতে গিয়ে মনে হলো কারো সাহায্য ছাড়া এ কাজ সম্ভব না।
“যদি আমি ধরে রাখি, দাঁড়াতে পারবে?”
মাথা নেড়ে চেষ্টা করতে গিয়েই দুলে উঠল রামোন। ব্যথার চোটে খামচে ধরল বুকের ব্যান্ডেজ।
“আস্তে আস্তে।” ফিসফিস করে উঠল বেলা। মিনিট খানেকের মতো উপুড় হয়ে থেকে আস্তে আস্তে সোজা হল রামোন।
“অল রাইট।” দাঁতে দাঁত ঘসল রামোন। নিজের কাঁধে ওর বেশির ভাগ ভার নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল বেলা।
“তুমি কি এথেন্স থেকে এভাবেই এসেছ?” অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে জানতে চাইল ইসাবেলা।
মাথা নেড়ে মিথ্যেটাতে সম্মতি দিল রামোন। আসল কথা হল কুরিয়ারের কাজ করার জন্যই বেলা’কে এথেন্সে ডেকে পাঠিয়েছিল। হঠাৎ করেই তৈরি হয়েছিল প্রয়োজনটা। অন্য কোনো এজেন্ট খালি না থাকায় আর বেলার জন্যও সময় হয়ে যাওয়ায় ঠিক করেছিল এটাই উপযুক্ত সময়। এখন মেয়েটার যা অবস্থা বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিবে রামোনের নিদেশ। প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে তেমন কষ্টও হবে না। সুন্দরী সরল আর গর্ভবতী হওয়ায় চট করে সহানুভূতি আদায় করাটা ওর জন্য সহজ হত। এছাড়া পৃথিবীর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে একেবারেই নতুন মুখ হিসেবে অচেনা মেয়েটাকে মোসাদ’রাও চিনবে না। এর উপরে আবার বেলা’র কাছে আছে দক্ষিণ আফ্রিকার পাসপোর্ট। আর এই দেশটার সাথে ইস্রায়েলের সম্পর্ক বেশ অন্তরঙ্গই বলা চলে।
প্ল্যান ছিল এথেন্স থেকে ফ্লাইটে চডে তেল আবিব গিয়ে পিক আপ সেরে আবার একই পথ ধরে ফিরে আসবে বেলা। খুব বেশি হলে একদিনের কাজ। কিন্তু এথেন্সে পৌঁছাতে না পারায় পাল্টে গেল পুরো ব্যাপারটা। পিক্ আপটা বেশ জরুরি ট্র্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার ওইপন্স সিস্টেম উন্নয়নের কাজে জড়িত ইসরায়েল আর দক্ষিণ আফ্রিকান বিজ্ঞানের সবকিছু ছিল এই প্যাকেটের মাঝে। মোসাদ ওর আদ্যপান্ত জানে জেনেও রিস্কটা নিয়েছে রামোন।
যতটা সম্ভব ছদ্মবেশ ধারণ করে রওনা দিয়েছে সাথে কোনো অস্ত্র ছাড়াই। সাথে অস্ত্র নিয়ে ইসরায়েলি সিকিউরিটি চেক পার হবার চেষ্টা করা পাগলামি ছাড়া আর কিছু না। মেক্সিকান পাসপোর্ট বহন করলেও নিশ্চয়ই বেন গারিয়ান। এয়ারপোর্টে ওকে চিনে ফেলে টিকটিকি লাগিয়ে দিয়েছে পেছনে।
ফেউ’টাকে রামোনও চিনে ফেলেছিল। কিন্তু খসাতে পারেনি। তাই মোসাদ এজেন্টের ঘাড় ভেঙে দেয়ার সময় নিজেও গুলি খেয়েছে। পরে ভয়ংকর রকম আহত হলেও তেল আবিবের পি এল ও সেফ হাউজে চলে, গেছে। বারো ঘন্টার ভেতরে সিরিয়াতে ওদের পাইপ লাইনের মাধ্যমে রামোনকে বের করে দিয়েছে ওরা।
যাই হোক, লন্ডন হচ্ছে সবচেয়ে বড় সেফ হাউজ। ইনজুরী আর রিস্কের কথা চিন্তা করে দামাস্কাসও ছেড়ে আসতে হয়েছে। স্থানীয় কেজিবি’র স্টেশন হেড পাহারা দিয়ে অ্যারোফ্লোট ফ্লাইট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেছে। সেখান থেকে। লন্ডন। বহুকষ্টে ফ্ল্যাটে পৌঁছেই ফোন করেছে বেলা’কে। আর তারপর কোনো মতে বাথরুমে গিয়েই আবার পড়ে গেছে।
