“কফি’র গন্ধটা বেশ লাগছে।” নীল চোখ জোড়ায় একরাশ অপরাধ বোধের ছায়া নিয়ে সিল্কের ড্রেসিং গাউন পরে দাঁড়িয়ে আছে মাইকেল। ঠোঠের কোণে অনিশ্চয়তা আর আত্মপ্রত্যয়হীনতা নিয়ে বলে উঠল; “আমি ভেবেছিলাম তুমি এথেন্সে চলে গেছ-স্যরি।”
রান্নাঘরের দু’প্রান্ত থেকে কয়েক সেকেন্ড মাত্র পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল দু’ ভাই-বোন। অথচ মনে হল অনন্তকাল পার হয়ে গেছে। উঠে দাঁড়াল। ইসাবেলা। বুড়ো আঙুলের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের গালে কিস্ করল। বলল,
“আই লাভ ইউ মিকি। আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয়তম ব্যক্তি হলে তুমি।”
গভীরভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল মাইকেল। “থ্যাঙ্ক ইউ বেলা। আমার বোঝ উচিত ছিল যে তুমি কতটা আন্ডারস্টান্ডিং। তারপররে’ও ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। হয়ত আমাকে প্রত্যাখ্যান করে বসবে ভাবতে গিয়ে আমি যে কতটা ভয় পেয়েছি তুমি জানো না।”
“না, মিকি। তোমার ভয় পাবার কিছু নেই।”
“আমিই তোমাকে বলতাম। শুধু সঠিক সময়টার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”
“আমাকে কিংবা অন্য কাউকেই দোহাই দেয়ার কিছু নেই। এটা একান্তই তোমার ব্যাপার।”
“না, আমি চাই তুমি পুরোটা জানো। আমাদের মাঝে কোনো সিক্রেট তো কখনো ছিল না। জানতাম যে আগে কিংবা পরে তুমি ঠিকই জানবে। শুধু চেয়েছিলাম ওই ঈশ্বর, যেভাবে জেনেছে সেরকমই কখনো চাইনি। পুরো ব্যাপারটা নিশ্চয় তোমাকে প্রচণ্ড ঠাক্কা দিয়েছে।”
চোখ বন্ধ করে ফেলল বেলা। মন চাইল, যা দেখেছে তা দূর হয়ে যাক মাথা থেকে। কোনো হরর সিনেমার দৃশ্যের মতো এখনো চোখে ভাসছে মাইকেলের সেই নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণাক্লিস্ট চেহারা।
“কোনো সমস্যা নেই মিকি। কিছুই যায় আসে না এতে।”
“অবশ্যই যায়, বেলা।” আলতো করে বোন’কে চোখের সামনে ধরে চাইল মেয়েটার মনের ভাব বুঝতে। যা দেখল তাতে মনটা আরো বেশি খারাপ হয়ে গেল। ইসাবেলা’র কাঁধে হাত রেখে ব্রেকফাস্ট টেবিলের চেয়ারে বসিয়ে দিল মাইকেল।
“অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো, একদিকে স্বস্তি পেয়েছি যে তুমি জেনে গেছ। যেভাবে দেখেছ তা মেনে নিতে কষ্ট হলেও, পৃথিবীতে একটাই মানুষ আছে, যার কাছে আমি আমার মতো করেই থাকতে পারি। যার কাছে আমাকে মিথ্যে বলতে হবে না।”
“কেন লুকিয়ে রেখেছিলে মিকি। ১৯৬৯ সালে এসে এখনো কেন নিজেকে মেলে ধরতে পারো না? কেভাবে কার কথা?”
ড্রেসিং গাউনের পকেট থেকে সিগারেট বের করে একটা জালিয়ে নিল মাইকেল। জ্বলন্ত সিগারেটটার দিকে মুহূর্তখানেক তাকিয়ে থেকে বলে উঠল : “অন্যদের জন্য এটা সত্যি হতে পারে; কিন্তু আমার জন্য না। পছন্দ করি বা না করি, আমি একজন কোর্টনি, এখানে নানা আছে, বাবা, গ্যারি, শ পারিবারিক সুনাম সব জড়িত।”
ইসাবেলার মন চাইল প্রতিবাদ করে। কিন্তু বুঝতে পারল এটাই চরম সত্যি।
“নানা আর বাবা” আবারো বলে উঠল মাইকেল, “জানতে পারলে পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।”
ভাইয়ের হাতের উপর হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে চাইল ইসাবেলা। জানে সত্যি কথাই বলছে মাইকেল। কখনোই নানা কিংবা বাবাকে জানানো যাবে না। তাদের জন্য এটা বহন অসম্ভব দুঃসহ হবে এমনকি তারার চেয়েও বেশি। তারা তো বাইরের মানুষ; কিন্তু মাইকেলের দেহে বইছে কোর্টনি বংশের রক্ত। দাদীমা আর বাবা কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। কবে তুমি নিজের এই দিকটা সম্পর্কে জানতে পারলে?” আস্তে করে জিজ্ঞেস করল বেলা।
প্রিপারেটরী স্কুলের সময় থেকে।” খোলামেলাভাবেই উত্তর দিল মাইকেল। “আমি বহুবার চেষ্টা করেছি নিজেকে সামলাতে। চাইনি এমন কিছু হোক। কখনো মাস, এমনকি বছর পর্যন্ত কিন্তু পারি নি বেলা। মনে হয়েছে এমন একটা পশু আছে ভেতরে যে আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এর উপর।”
প্রশ্রয় দেয়ার ভঙ্গিতে হাসল বেলা। “ন্যানি কী বলবে জানো-হট কোর্টনি ব্লাড়। আমাদের সবার মাঝেই এটা আছে। কেউই খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি; বাবা, গ্যারি, শন, তুমি কিংবা আমি কেউই না।”
“এ ব্যাপারে কথা বলতে তোমার খারাপ লাগছে না তো? আমি তো সবসময় ঢেকে রাখতেই চেয়েছি।”
“যেভাবে ইচ্ছে বলল। আমি শুনছি।”
“পনের বছর ধরে এভাবেই আছি আর মনে হচ্ছে আরো পঞ্চাশ বছরও এভাবেই কেটে যাবে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো-পারিবারিক কারণে যা জানলে সবাই বেশি আহত হবে-কৃষণাঙ্গরাই কেবল আমাকে আকর্ষণ করে। নানা, বাবা আর আমাদের গৃহ আদালতে এ কারণেই বেশি দোষী হব!” থর থর করে কেঁপে উঠেই সিগারেট ফেলে দিল মাইকেল। আর প্রায় সাথে সাথেই আরেকটা জ্বালালো।
“কালো পুরুষরা যে কেন আমায় এত আকর্ষণ করে বুঝি না। অনেক বার ভেবেছি। মনে হয়, তারা’র মতো হয়েছি। হয়ত অবচেতন মনে একটা অপরাধবোধ কিংবা আকাঙ্খা রয়ে গেছে ওদের উন্মা প্রশমন করার। মিটমিট করে হেসে ফেলল মাইকেল। অনেক দিন ধরেই তো ওদেরকে দমিয়ে রাখছি, তাই কিছু যদি ফেরত দেয়া যায়?”
“নাহ!” নরম স্বরে জানাল ইসাবেলা। এমনভাবে কথা বলে নিজেকে ছোট করো না মিকি। তুমি অসম্ভব সুন্দর আর ভদ্র একজন মানুষ। আর প্রবৃত্তির জন্য আমরা কেউ দায়ী নই।”
ইসাবেলা’র মনে পড়ল যে মাইকেল কতটা লাজুক, স্নেহশীল আর পরোপকারী; তারপরেও কেমন যেন বিষণ্ণ। এবারে এই বিষাদের কারণও বুঝতে পারল। আপন হৃদয়ে অনুভব করল যে, যা দেখেছে তা নিয়ে আর কোনো ঘৃণ্য ভাব নেই মনে। শুধু খারাপ লাগছে এই ভেবে যে তার প্রিয়। মানুষটা কতটাই না মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করছে।
