“ডার্লিং, তুমি কোথায়?”
“এথেন্স।”
“ওহ, খানিকটা চুপসে গেল বেলা। “আমি আরো ভেবেছিলাম বোধহয় হিথ্রোতে।”
“আমার দেরি হবে। আরো অন্তত তিনদিন থাকতে হবে এখানে। তুমিও চলে এসো না?”
“এথেন্সে?” এখনো আধো ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে বেলা।
“হ্যাঁ। কেন নয়? তুমি চাইলে দশটার বি ই এ ফ্লাইট ধরতে পারো। তিন দিন কাটানো যাবে একসাথে। চাঁদের আলোয় অ্যাক্রোপলিস কেমন লাগবে বলো তো? দ্বীপে ঘুরে বেড়ানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষের সাথে তোমাকে পরিচয় করিয়ে দিব।”
“ঠিক আছে। তোমার ফোন নাম্বার দাও। প্লেনে উঠেই তোমাকে ফোন দেব।” ব্রিটিশ ইউরোপীয়ান এয়ারওয়েজের রিজার্ভেশনের প্রতিটা লাইন ব্যস্ত থাকায় মিনি’তে করে ওকে এয়ারপোর্টে নিয়ে এলো মাইকেল। হাতে সময়ও বেশি নেই।
“তোমার রিজার্ভেশন কনফার্ম না হওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করছি।” জানাল মাইকেল।
“না, মিকি, আমি জানি তুমি অনেক লক্ষ্মী। হলিডে সিজন তো শেষ। তাই কোনো সমস্যা নেই। তুমি যাও। রামোন আর আমি বাসায় ফেরার সময় ফ্ল্যাটে তোমাকে ফোন করব।”
টার্মিনাল দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো নিরাশ হয়েই না ফিরতে হয় শেষমেষ। উদ্বিগ্ন মুখে লাগেজ নিয়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে পর্যটকেরা। বহুকষ্টে অবশেষে ইনফর্মেশন ডেস্কে পৌঁছাতে শোনা গেল ফরাসি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের স্ট্রাইকের কারণে সব ফ্লাইট পাঁচ ঘণ্টা করে ডিল হয়ে গেছে। এছাড়া এথেন্সের ফ্লাইট’ও পুরো বুকড়। তাই ফাস্ট ক্লাসে সিট পেতে হলেও ওয়েটিং লিস্টে অপেক্ষা করতে হবে।
পাবলিক টেলিফোন ব্যবহার করার জন্য দাঁড়াতে হলো আরেকটা লাইনে। রামোনকে জানাতেই বেলার মতো সেও মন খারাপ করে ফেলল।
“আমি এত সহজে হাল ছাড়ছি না। দরকার হয় সারাদিন এখানে বসে থাকব।” ঘোষণা করল বেলা।
হতাশা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে পার হল পুরো দিন। অবশেষে বিকেল পাঁচটায় ফ্লাইট ছাড়ার কথা শুনে প্রার্থনা করতে করতে চেক ইন কাউন্টারে দাঁড়াল বেলা। সামনে না হলেও আরো আধডজন লোক একই প্রার্থনাই করছে। কিন্তু কোনো লাভ হল না। অনুতপ্ত হবার মতো করে মাথা নাড়ল। বুকিং ক্লার্ক।
“আয়্যাম সো সরি, মিস্ কোর্টনি।”
আগামীকাল সকাল দশটার আগে এথেন্সের আর কোনো ফ্লাইট নেই। আশা হত ইসাবেলা আবারো রামোনকে ফোন করল। কিন্তু ওকে না পেয়ে মেসেজ রেখে দিল বেলা। আশা করল রামোন বুঝতে পারবে যে বেলা নিরুপায় হয়ে যাবার আশা বাতিল করেছে।
বেলার মতো অন্য শত শত প্যাসেঞ্জার’ও নিরাশ হয়ে বাড়ির পথ ধরাতে কোনো ট্যাক্সিও পাওয়া যাচ্ছে না। ফুটপাতে ব্যাগ রেখে শহরে ফেরার জন্য। বাসস্ট্যান্ডে লাইনে দাঁড়াল বেলা।
আটটার’ও পরে বাসে উঠে ফ্ল্যাটে পৌঁছে মনে হল কেঁদে দেবে। সুস্বাদু রান্নার গন্ধ নাকে আসতেই বুঝতে পারল কতটা ক্ষিধে লেগেছে। লবি’তে ব্যাগ রেখে জুতা ছুঁড়ে ফেলে কিচেনে দৌড় দিল বেলা। বোঝাই যাচ্ছে যে মাইকেল নিজেই ডিনার তৈরি করেছে। ব্রেকফাস্টের বাসন-কোসন এখনো পড়ে আছে। নিজের জন্য বেঁচে যাওয়া চিকেন কিয়েভ আর চিজ কেক নিয়ে নিল বেলা। সিঙ্গের দিকে চোখ যেতেই দেখা গেল দুটো এন্টো ওয়াইন গ্লাস আর বাবার নুটস্ সেন্ট জর্জেস ১৯৬১। তার পরেও মাথায় অন্য কোনো সন্দেহ এলো না।
উপরের তলায় মাইকেলের বেডরুম থেকে হার্ড মিউজিকের শব্দ আসছে। সোজা পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে মাইকেলের রুমের দরজা খুলেই থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বেলা।
এমন কিছু দেখবে কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি; তাই কী দেখছে বুঝতেই কেটে গেল ক্ষাণিক সময়।
এরপরই মনে হল মাইকেলকে বোধ হয় কেউ আক্রমণ করেছে। মন চাইল চিৎকার করে উঠে। তাড়াতাড়ি মুখে হাত চাপা দিতেই বুঝতে পারল কী ঘটছে।
ডাবল বেডের উপর হাঁটু গেড়ে আছে নিরাভরণ মাইকেল। মেঝেতে গড়াচ্ছে সাটিনের বিছানার চাদর।
একইভাবে উলঙ্গ অবস্থায় পাশেই হাঁটু গেড়ে বসে আছে নেলসন। মাইকেলের চির পরিচিত অনিন্দ্য সুন্দর মুখখানায় এমন একটা অভিব্যক্তি দেখতে পেল যে কেপে উঠল বেলা।
চোখের দৃষ্টি স্পষ্ট হতেই বোন’কে দেখতে পেল মাইকেল, শরীরে ভয়ংকর রকম ঝাঁকি দিয়েই নেলসনের কাছ থেকে সরে গিয়ে চাইল বালিশ দিয়ে নিজেকে ঢাকতে।
তাড়াহুড়া করে রুম থেকে চলে এলো ইসাবেলা।
সারদিনের ক্লান্তির কল্যাণে ঘুমিয়ে পড়লেও আধ-ছেঁড়া সব স্বপ্ন দেখল। একবার তো মনে হল উলঙ্গ অবস্থায় ভয়ংকর কোনো দানবের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে যুঝছে মাইকেল। ঘুমের মাঝেই এত জোরে চিৎকার করে উঠল যে ঘুমই ভেঙে গেল।
ভোর হবার আগেই রেস্ট নেবার চেষ্টা ছেড়ে উঠে গেল বেলা। রান্নাঘরে যেতেই দেখা গেল গত রাতের নোংরা প্লেট গ্লাস সব পরিষ্কার করে জায়গামতো রেখে দেয়া হয়েছে। খালি ওয়াইন গ্লাস আর বোতল উধাও হয়ে ঝকঝক করছে পুরো রান্নাঘর।
কফি পার্কোলেটরের সুইচ্ অন্ করে লেটার বক্স চেক করতে গেল বেলা। এত ভোরে নিউজ পেপার আসার সম্ভাবনাও নেই। তাই ফিরে এসে এক কাপ কফি ঢেলে নিল। জানে বেবি’র জন্য ক্যাফেইন মোটেও ভাল না; কিন্তু এ সকালবেলায় না হলে আর চলছে না।
কফি’তে প্রথম চুমুক দিতেই সিগারেটের গন্ধ পেয়ে তাড়াতাড়ি চোখ তুলে তাকাল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মাইকেল।
