চতুরের শেষ দিকে সাউথ আফ্রিকা হাউজের ঠিক সামনে টেমপোরারি তার টাঙ্গানো হয়েছে। দড়ি দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে পুরো এরিয়া। পেছনের সারিতে বসে পড়ল মাইকেলরা। প্লাস্টিকের শপিং ব্যাগ থেকে হাতে আঁকা ব্যানার বের করল তারা। মেলে ধরতেই দেখা গেল লেখা আছে, “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হল বর্ণবাদ।”
মায়ের কাছ থেকে সরে গিয়ে ইসাবেলা এমন ভাব করতে চাইল যেন কেউ কাউকে চেনে না। “এত মানুষ তাঁকে দেখছে। এটা নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই উনার, তাই না?” ভাই’কে ফিসফিস করে বলতেই হেসে ফেলল মাইকেল।
“বহুদিনের চেষ্টায় আসলে এমন হয়ে গেছেন।”
মোটের উপর এই বৈচিত্র্যময় সমাবেশের অংশ হতে পেরে মজাই পেল ইসাবেলা। এর আগে বহুবার এ ধরনের মানুষগুলোর দিকে বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়েছিল অ্যামব্যাসির উঁচু জানালা দিয়ে আর আজ দেখছে পুরোপুরি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। মজা দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা চারজন ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ কৌতুক শোনার মতো করে হেসে ফেলল এক বক্তার মুখে প্রিটোরিয়ার মতই লন্ডনও পুলিশ স্টেট আর খারাপ হবার কথা শুনে। নিজের সাপোর্ট প্রকাশের জন্য খুব সুন্দর করে হাসি দিয়ে বক্তার দিকে কিস্ ছুঁড়ে দিল ইসাবেলা।
প্লাটফর্মের উপর থেকে বক্তারা তুলোধুনো করে ছাড়ল ট্রাফিক আর বেগুনি বাসগুলোকে। এর সবকিছুই আগেও শুনেছে ইসাবেলা। তবে দিনের সবচেয়ে হাস্যকর অবস্থার উদ্রেক হল যখন মাথার উপর ঘুরতে থাকা একটা কবুতর পায়খানা করে দিল এক বক্তার চকচকে টাকের উপর। চিৎকার করে উঠল বেলা : “ফ্যাসিস্ট পাখি, বর্ণবাদী প্রিটোরিয়া শাসকের প্রতিনিধি!”
মিটিঙের শেষে ভোট হলো যে জন ভরসটার আর তার অবৈধ শাসন তন্ত্র নিপাত যাক, ক্ষমতা দিয়ে দেয়া হোক ডেমোক্র্যাটিক পিপলস গভর্নমেন্ট অব সাউথ আফ্রিকার হাতে। সকলেই একবাক্যে মেনে নিল এ ঘোষণা। ফুটবল ম্যাচ দেখে ফেরা ভিড়ের চেয়েও শান্তভাবে সাঙ্গ হলো মিটিং।
“চলো একটা পাবে যাই।” বলে উঠল মাইকেল। “ফ্যাসিস্ট সরকারের কথা শুনতে শুনতে তেষ্টা পেয়ে গেছে।
“স্ট্যান্ডে বেশ ভাল একটা পাব আছে।” পথ বাৎলে দিল নেলসন।
“চলো তবে।” উৎসাহ দিল মাইকেল।
জিনজার বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে ইসাবেলা জানাল, “এভাবে আসলে আগের মতই সময় নস্ট হবে শুধু। দুইশ মানুষ বাতাস গরম করে তুললেই কিছু আর বদলে যাবে না।”
“এতটা নিশ্চিত হয়ো না।” হাত দিয়ে ঠোঁটের উপর লেগে থাকা ফেনা মুছে ফেলল মাইকেল। “হয়ত এটা বাঁধের দেয়ালের গায়ে একটুখানি আঁচড়-শীঘ্রিই হয়ে যাবে দফায় দফায় ঢেউ আর তারপরেই ভয়ংকর সামুদ্রিক গর্জন।”
“ওহ্ পাগল হলে নাকি মিকি।” একবাক্যে ভাবনাটা খারিজ করে দিল ইসাবেলা। “সাউথ আফ্রিকা এতটাই ধনী আর শক্তিশালী। এছাড়া আমেরিকা আর ব্রিটেনও অনেক বিনিয়োগ করেছে সে দেশে তাই তারা নিশ্চয়ই আমাদের জন্মগত অধিকারকে একদল মার্কসিস্টের হাতে ছেড়ে দেবে না।” গত তিন বছরে অ্যামব্যাসাডর বাবার মুখে শোনা কথাগুলোই হুবহু বলে দিল বেলা। মা সৎভাই–নেলসন কিংবা লড় কিচেনার হোটেলের আরো বিশজন আবাসিকের সাথে কাটানো সান্নিধ্য ও তার যুক্তিকে একটুও টলাতে পারে নি। কাদোগান স্কোয়ারে ফিরে তাই মাইকেলকে বলে দিল নিজের অপছন্দের কথা।
“ওরা বড্ড বেশি রাগী ছিল, মিকি।”
“এটা সম্পূর্ণ নতুন একটা পরিস্থিতি বেলা। যদি সারভাইভ করতে হয় এর সাথে মীমাংসা করতেই হবে।”
“এমন তো না যে ওদের সাথে খারাপ আচরণ করা হচ্ছে। ওয়েল্টেভ্রেদেনে ন্যানি, ক্লোনকি, গ্যামিয়েট আর অন্যদের কথাই ধরো না। আমি বলতে চাইছি যে অন্য বহু শ্বেতাঙ্গের চেয়েও ওরা অনেক ভাল আছে।”
“আমি তোমার কথা বুঝতে পেরেছি, বেলা। সঠিক আর ভুল ভেবে ভেবে তুমি পাগল হয়ে যাবে; কিন্তু শেষতক একটাই কথা তাদের অনেকেই অনেক ভালো আর সুন্দর। তাহলে কোন অধিকার বলে আমরা তাদেরকে জন্মভূমির সব কিছু সহভাগীতা করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারি?”
“থিরি অনুযায়ী ঠিকই আছে। কিন্তু আজ সন্ধ্যায় তো ওরা সশস্ত্র যুদ্ধের কথাই বলছিল। তার মানে নারী আর “শিশুদেরকে টুকরো টুকরো করে ফেলা। রক্ত আর মৃত্যু মিকি। ঠিক আইরিশদের মত। তাই না?”
“জানি না বেলা। মাঝে মাঝে মনে হয়না! হত্যা, জ্বালিয়ে দেয়া উচিত নয়। কিন্তু আবার একেক সময় মনে হয়-কেন না? শত শত বছর ধরে নিজেকে আর তার জন্মগত অধিকারকে রক্ষার জন্য মানুষই খুন করে আসছে মানুষকে। দক্ষিণ আফ্রিকায় সশস্ত্র বিপ্লবের কথা শুনে আমাদের বাবা বক্তৃতা দেয়, চিৎকার করে, কিন্তু একই মানুষটাই ১৯৪০ সালে হারিকেনে চড়ে ইথিও পিয়া, ইটালী আর জার্মানীর উপর গুলি ছুঁড়েছেন নিজের স্বাধীনতার আশায়। নানা, আইনের ধ্বজাধারী হয়েও মুক্ত বাজারের রক্ষক হিসেবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর আর রক্তাক্ত ঘটনা, হিরোশিমা নাগাসাকির উপর বোমা বর্ষণের ঘটনায় খুশি খুশি মাথা নেড়ে বলেন, “ভাল হয়েছে, তাহলে আমাদের কিংবা আমাদের পরিবারের তুলনায় তারা, বেনজামিন আর নেলসন কতটাই বা রক্ত পিপাসী? কে ঠিক আর কে ভুল, বেলা?”
“তুমি আমার মাথা ধরিয়ে দিয়েছে।” উঠে দাঁড়াল বেলা। “আমি শুতে যাচ্ছি।”
***
সকাল ছয়টায় ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। ওপাশে রামোনের গলা শুনতেই। বেলা’র উপর থেকে বিষণ্ণতার চাদর সরে গেল।
