মা-র এই ভিন্ন দুনিয়াতে খাপ খাওয়াতে না পারার আরেকটা কারণ হলো বেনজামিন গামা। এই স্ক্যান্ডালের মাধ্যমে কোর্টনি পরিবারকে তারা এতটাই কলঙ্কিত করেছে যে নানা ওর নাম উচ্চারণও ওয়েল্টেভ্রেদেনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
শুধু মাইকেল-ই এ বিষয়ে কথা বলে বেলা’র সাথে বেলা’কে এও জানিয়েছে যে মোজেস গামা গ্রেফতার হবার পরেও তারা’র বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করা হয়নি আর কোন প্রমাণও পাওয়া যায়নি যে তারা কোনো অপরাধের সাথে যুক্ত ছিল।
“কিন্তু পরিবারের সুনাম বাঁচাতে বাবা কি কিছু করেননি?”
“তুমি নিজেই তাকে জিজ্ঞেস করো।” একবার বেলা চেষ্টাও করেছিল; কিন্তু ওই একবারই তার সাথে গোমড়া মুখে শীতল আচরণ করেছেন শাসা। ইসাবেলা’ও বেঁচে গেছে। কেননা সত্যি কথা বলতে মায়ের অপরাধের মাত্রা সম্পর্কে জানতে ওর’ও ইচ্ছে ছিল না। বুকের গভীরে ভাবতেও ভয় লাগত যে মা এমন এক কুখ্যাত “গাই ফকস” দলের সদস্য যারা কিনা মোজেস গামা’কে দিয়ে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে সাউথ আফ্রিকান পার্লামেন্ট ভবন আর যদি এ পরিকল্পনা সফল হত তাহলে মারা যেত ওর নানা, তারা’র নিজের বাবা। তাই মাকে বিশ্বাসঘাতক ধরে নেয়াটাই শ্রেয়। আর স্কুল এ ব্যাভিচার দক্ষিণ আফ্রিকার আইনে জঘন্য অপরাধ হওয়ায় বেলা অবাক হয়ে ভাবল যে সে এখানে কী করছে।
হঠাৎ করেই তারা’র মুখে ভেসে উঠল হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্যের ঝলক। খুশিতে নেচে উঠল চোখ মুখ।
“বেন!” চিৎকার করে উঠল ছেলেকে দেখে। “দেখ, আমাদেরকে দেখতে কে এসেছে। তোমার ভাই-বোন। বেশ মজা না?”
নিজের চেয়ারেই ঘুরে বসল ইসাবেলা। পেছনে, হোটেল লাউঞ্জের দরজাতে দাঁড়িয়ে আছে ওর সৎ ভাই। গত এক বছরে বেশ বড় হয়ে গেছে। কিশোর থেকে পুরুষালী ভাব এসেছে চেহারাতে।
“হ্যালো বেনজামিন।” কণ্ঠে উৎসাহ নিয়ে ডেকে উঠল বেলা। কিন্তু মুখে হাসি সত্ত্বেও বেনে’র মাঝে কঠোর ভাবটা চোখ এড়াল না।
মা-হলেও একটুও বাড়িয়ে বলেননি তারা। বেনজামিন আসলেই বেশ সুন্দর হয়েছে দেখতে। আফ্রিকান উজ্জ্বতার সাথে মিশে গেছে মায়ের রূপ। তামাটে গায়ের রঙে ঘন কোকড়াচুল।
“হ্যালো ইসাবেলা।” মুগ্ধ হয়ে আফ্রিকার সন্তানের কণ্ঠে লন্ডনের টান শুনল বেলা। তবে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করল না। প্রথমবার সাক্ষাতের সময় থেকেই আপনাতেই গড়ে উঠেছে এ নিয়ম। দুজনেই হাত মিলিয়ে পিছিয়ে গেল। আর কি বলা যায় ভাবার আগেই মাইকেলের দিকে ফিরল বেনজামিন।
এবারে ঝকঝকে দাঁত আর ভালো চোখ জোড়াসহ সবখানে ছড়িয়ে পড়ল একরাশ হাসি।
“মিকি!” দ্রুত দুই কদম এগিয়ে এসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরল দুই ভাইয়েরই মতন।
চারপাশের সবার মনে বিশ্বাস জন্মানোর মাইকেলের এই গুণকে ঈর্ষা করে ইসাবেলা। ইসাবেলার সাথে খানিকটা দূরত্ব রেখে চললেও মাইকেলের সাথে কতটা সহজ এই বেনজামিন! একটু পরে দেখা গেল তারা, বেন আর মিকি মিলে বেশ খোশ গল্পে মেতে গেছে। নিজেকে কেমন অচ্ছুত লাগল বেলার।
যাক, খানিক পরেই লাউঞ্জ পার হয়ে তারা’র কাছে এসে জানাল কুষাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান এক ছাত্র। ঘড়ির দিকে তাকাল তারা।
“ওহ্ ঈশ্বর, আমাকে মনে করিয়ে দেবার জন্য ধন্যবাদ নেলসন। আমরা এতই গল্পে মজে গেছি যে সময় খেয়াল করিনি।” লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল তারা। “চলুন সবাই! ট্রাফালগার স্কোয়ারে যেতে হলে এখনি বের হতে হবে।”
লাউঞ্জের সবার মাঝে চঞ্চলতা দেখা যেতেই মাইকেলের দিকে তাকাল বেলা।
“এসবের মানে কী মিকি? মনে হচ্ছে তুমিও জানো সবকিছু।”
“ট্রাফালগার স্কোয়ারে র্যালি আছে।”
“ওহ গড না! সেসব বর্ণবাদ বিরোধী জাম্বুরী নয় নিশ্চয়ই। আমাকে বলল নি কেন?”
“তাহলে তুমি সটকে পড়ার বাহানা পেয়ে যেতে।” বোনের দিকে তাকিয়ে হাসল মাইকেল। “চলো, তুমিও চলো।”
“না, থ্যাঙ্কস্। বাবা অ্যামব্যাসিতে আসার পর থেকে গত তিন বছর ধরে এ ঝামেলাই সহ্য করছি। তুমিই বা কেন যাচ্ছ অযথা এই হ্যাপা’র মাঝে?”
“বেলা, মাই সুইটি, এটাই আমার কাজ। তোমার কথা মতো এই হ্যাপা নিয়ে লেখার জন্যই আমি লন্ডনে এসেছি। এখন চলল আমাদের সাথে।”
“কেন?”
“খানিকটা চেঞ্জের জন্য বেড়ার ওপাশ থেকে দেখলে দুনিয়াকে হয়ত ভালই লাগবে-তাছাড়া আমিও আছি। একসাথে বেশ ভাল সময় কাটবে।” অনিশ্চিতভাবে হাত নাড়ল বেলা। বিষয়টা বাদে মাইকেলের সঙ্গ আসলেই পছন্দ করে। এছাড়া রামোন না থাকাতেও একা হয়ে পড়েছে।
“যাব যদি বাসের উপরে চড়ে বেড়ানো যায় তাহলে। টিউবে না।”
নেলসন লিটালুঙ্গি, সেই কৃষাঙ্গ ছাত্রসহ জনা বিশেকের দল গেল লর্ড থেকে। লাল বাসের উপর তলায় বেলার জন্য একটা সিট খুঁজে নিয়ে গাদাগাদি করে বসল তিনজন। সামনের বেঞ্চে তারা আর বেন। কিন্তু মাথা ঘুরিয়ে সারাক্ষণ একসাথে হাসি তামাশা করল সকলে মিলে। ইসাবেলার নিজেরও একেবারে খারাপ লাগল না। সবকিছুর মধ্যমণি মাইকেল। নেলসন আর সে মিলে গানও গাইতে লাগল। দুজনের কণ্ঠই বেশ মধুর। দিস ইজ মাই আইল্যান্ড ইন দ্য সান-গানের সাথে গলা মেলানো বাকিরা। হ্যাঁরী বেলাফন্টে’কে নকল করতে পারে নেলসন। দেখতেও অনেকটা তার মত। প্রথম থেকেই জমে গেছে মাইকেল আর তার জুটি।
ন্যাশনাল গ্যালারীর সামনে বাস থেকে নামতেই দেখা লম্বা থামের নিচে খোলা চত্বরে এরই মাঝে জমায়েত হয়ে গেছে সকলে। নেলসন আর হোরাশিওকে নিয়ে কী একটা ঠাট্টা করল মাইকেল। হাসতে হাসতে চতুরের দিকে পা বাড়ালো পুরো দল। পায়ের কাছ থেকে পাখা ঝাপটে মেঝের মতো করে উড়ে গেল কবুতরগুলো।
