“সেটাই ভালো।” বোনের হাতে চাপ দিল মাইকেল। “তাহলে চলো দু’জনে মিলে তারা’র সাথে দেখা করে আসি। উনি তোমাকে অসম্ভব ভালবাসেন ইসাবেলা, মিস করেন। তাই তুমি তাকে অবহেলা করলে মনে কষ্ট পান।”
“ওহ, মিকি তুমি তো মহা শয়তান। আমাকে ফাঁদে ফেলছ।” সেকেন্ডের মতো ভেবে নিয়ে বেলা জানাল, “কিন্তু আমার এই অবস্থায়?”
তারা তোমার মা। তোমাকে অসম্ভব রকম ভালোও বাসেন। তাই তার চেয়ে উদার আর কেউ হতে পারে না। তুমি আঘাত পাবে এরকম কিছুই যে করবে না, তা তুমিও জানো।”
“তোমাকে খুশি করার জন্য; শুধু তোমার জন্যই যাব, মিকি।”
তাই পরের শনিবারে সকাল বেলা ব্রম্পটন রাস্তাতে দুই ভাই-বোনকে দেখা গেল লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটছে। বেলা’র সাথে তাল মেলানোর জন্য মাইলকে বেশ কষ্টই করতে হল।
“তুমি কি পরের অলিম্পিকের জন্য ট্রেনিং নিচ্ছ নাকি?” হাসি মাখা মুখে বোনের দিকে তাকাল মাইকেল।
“তুমি দেখছি ইদানীং বেশি বেশি সিগারেট খাচ্ছো?” ভাইকে মৃদু ভর্ৎসনা করল বেলা।
“আমার এই একমাত্র দোষ।”
তারা কোর্টনি কিংবা বর্তমানে নিজেকে তারা গামা নামে পরিচয় দেয়া ভদ্রমহিলা ক্রমওয়েল রোডে আবাসিক হোটেল পরিচালনা করেন। ক্লায়েন্টদের বেশির ভাগই হচ্ছে বিশেষ করে আফ্রিকা, ভারত আর ক্যারিবীয় থেকে আসা প্রবাসিগণ।
কাদোগান স্কোয়ার থেকে এই জায়গার দূরত্ব সাকুল্যে বিশ মিনিট। ইসাবেলা অবাক হয়ে ভাবে যে কোন এক সময় এই একই ব্যক্তি সামলেছেন ওয়েল্টেভ্রেদেনের সেই ফরাসি দুর্গ। মায়ের স্মৃতি বলতে মনে পড়ে ফুল লেংথ বল গাউন আর শুভ্র গলা-কানে হানি’র কোর্টনি খনি থেকে আসা হলুদ হীরে পরিহিত মা নেমে আসছেন মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে। ইসাবেলা কখনোই বুঝতে পারেনি যে সেই রাজকীয় দেহাবয়েবের মাঝে লুকিয়ে ছিল এতটা অতৃপ্তি আর বেদনা।
তারা’র মাথা ভর্তি ঝলমলে সেই চুলগুলোর জায়গা নিয়েছে সস্তা রঙ করা আদা আর ধূসরের আভা। জন্মসূত্রে যা ইসাবেলা পেয়েছে সেই কমনীয় দেহত্বক অনাদর অবহেলায় বয়সের ছাপে জড়িয়ে আছে। নাকে, গালে ব্ল্যাকহেডস, মুখের তুলনায় বড় ফল দাঁতের ভারে নষ্ট হয়েছে ঠোঁটের সৌন্দর্য।
কোলনের গন্ধ ছড়িয়ে হোটেলের সদর দরজার সিঁড়ি বেয়ে হন্তদন্ত হয়ে নেমে এলেন তারা। আগ্রহ নিয়ে জড়িয়ে ধরলেন মেয়েকে। খানিকটা অপরাধবোধ নিয়ে বেলা নিজেও আলিঙ্গন করল মা’কে।
“দেখি তো আমার ডার্লিং মেয়েটাকে।” দু’হাতের মাঝে ইসাবেলাকে ধরে তাকাতেই সাথে সাথে চোখ চলে গেল নিচের দিকে। “তুমি তো আরো সুন্দর হয়ে গেছ বেলা; অবশ্য কারণটাও বোঝা যাচ্ছে। খুশি আর আনন্দ ভরা ছোট্ট একটা পুটুলি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছ তাহলে, তাইনা।”
খানিকটা বিরক্তি মেশানো হাসি হাসলেও কথা বাড়াল না বেলা।
“তোমাকেও ভাল দেখাচ্ছে মাম্মি-মানে তারা।”
“কত মাস কেটে গেছে; অভিযোগ করলেন তারা, “প্রায় বছরই বলা যায়। তুমি তো ঐ রাস্তার শেষ মাথাতেই থাকো। অথচ বুড়ী মাকে দেখতেও আসো না।”
এবারে যোগ দিল মাইকেল। সত্যিকারের উষ্ণ মমতা নিয়ে জড়িয়ে ধরল জননী’কে।
“মিকি, আমার ছেলে-মেয়েদের মাঝে তুমিই সবসময় ছিলে সবচেয়ে মিষ্টি আর আদুরে।”
অন্যদিকে মুখে হাসি ধরে রাখলেও ইসাবেলা’র মাথায় ঘুরছে কতক্ষণে এখান থেকে পালাতে পারবে। মনে হচ্ছে না সহজ হবে ব্যাপারটা। দুদিকে দুজনের হাত ধরলেন তারা। দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ঢুকলেন হোটেলের ভেতরে।
“তোমাদের জন্য চা-বিস্কুট রেডি করে রেখেছি। যখন থেকে মাইকেল বলেছে যে তোমরা আসছ, আমার আর তর সইছিল না।
শনিবারের এই সকালবেলায় তারা’র অতিথি’তে ভরে আছে লর্ড কিচেনার হোটেলের পাবলিক লাউঞ্জ। সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে বাতাস। সবার সাথে সন্তানদেরকে পরিচয় করিয়ে দিলেন তারা। যদিও আগেও এদের অনেককেই দেখছে বেলা।
“দক্ষিণ-আফ্রিকার কেপ টাউন থেকে আমার ছেলে আর মেয়ে এসেছে।” আর দেশের নাম শুনতেই কয়েক জনের চোখ পিট পিট করে জ্বলে উঠল। দেশে থাকলে নিজেকে লিবারেল হিসেবেই মনে করে বেলা কিন্তু বিদেশে এলে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখলে কেমন যেন দেশপ্রেমিকের ভাব আসে মনে।
অবশেষে লাউঞ্জের এক কোণাতে তাদের নিয়ে বসাল তারা। কাপে চা ঢালতে ঢালতে এমন চনমনে স্বরে কথা বলতে লাগল যে এত বড় রুমের সকলেই শুনতে পেল : “তো বেলা, এখন তোমার বেবি’র সম্পর্কে বলো। ডেলিভারী ডেট কবে আর বাবা’ই বা কে?”
“এই জায়গাটা কিংবা সময় কথা বলার মতো নয়, তারা।” বিবর্ণ মুখে জানাল বেলা; কিন্তু হেসে ফেলল তারা।
“ওহ্, এখানে সবাই আমরা একটা বড় সড় পরিবারেরই মতন। তুমি নিশ্চিন্তে কথা বলতে পারো।”
এবারে মাইকেল খুব দ্রভাবে বলে উঠল : নিজের ব্যক্তিগত বিষয় দুনিয়াকে জানাতে চায় না বেলা। আমরা এ বিষয়ে পরে কথা বলব তারা।”
“ধ্যাৎ তোমাদের যত সেকেলে চিন্তা।” টেবিলের ওপাশ থেকে বেলাকে ধরতে চাইল- তারা; কিন্তু চা ছলকে পোশাকে পড়াতে ক্ষান্ত দিল চেষ্টা।
“যথেষ্ট হয়েছে তারা। তারপর তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ বদলাবার জন্য বলে উঠল, “বেনজামিন কোথায়? কী করছে এখন?”
‘ওহ্ বেনই হচ্ছে আমার আনন্দ আর গর্ব।” বিষয়টা যেন লুফে নিল তারা। এই তো কয়েক মিনিটের জন্য বাইরে গেছে। ও অসম্ভব বুদ্ধিমান হয়েছে। এ বছরই এ লেভেল করছে। হেডমাস্টার তো বলেন যে রায়হাম গ্রামারে এত দক্ষ ছেলে গত দশ বছরেও আর দেখেননি। আর মেয়েরা তো, ওর মহা ভক্ত’ও এতটাই সুদর্শন হয়েছে।” তারা’র গল্প শুনে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল বেলা। যাক কথা বলতে হচ্ছে না।
