তিন ভাইয়ের প্রত্যেকেই চেহারা, ব্যক্তিত্ব আর চারিত্রিক দিক থেকে এতটাই ভিন্ন যে বিশেষভাবে কাউকে পছন্দ করা অসম্ভব।
অ্যাডভেঞ্চার স্বভাবের বড় জন শন তার দেখা সবচেয়ে সুপুরুষ। এখন অবশ্য রামোন সে জায়গা নিয়েছে। সৈন্য আর শিকারী শন্ এরই মাঝে রোডেশিয়া’তে বীরত্ব দেখাবার জন্য সিলভার ক্রস’ও পেয়েছে। তাই সন্ত্রাসীদের পেছনে দৌড়ানো ছাড়া তার আরেকটা কাজ হল জাম্বেজি উপত্যকায় কোর্টনি এন্টারপ্রাইজের হয়ে শিকারের আয়োজন করা।
মায়োপিয়া আর অ্যাজমা রোগে ভুগতে থাকা দ্বিতীয় ভাই গ্যারিক নিজের শারীরিক অক্ষমতাকে পূরণ করেছে চরিত্রের মাঝে কোর্টনি’দের দৃঢ় প্রত্যয় আর অদম্য উৎসাহ ধারণ করার মাধ্যমে। ছোটবেলায় “বেচারা গ্যারি” উপাধি পাওয়া ছেলেটাই” কসরৎ করে গড়ে তুলেছে পুরুষালী গড়ন; হয়ে উঠেছে গলফ প্লেয়ার, রাইফেল আর শট গানে সিদ্ধহস্ত বন্দুকবাজ।
এর পাশাপাশি কোর্টনি এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান আর চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার হয়ে বাবা’র স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। এখনো বয়স ত্রিশও হয়নি, এরই মাঝে মাল্টি বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি চালানো পরিশ্রমী গ্যারি কখনোই বেলা’র জন্মদিন ভুলে যায় না। বোনের যে কোনো আবদার মেটাবার জন্য কখনো পিছপা’ও হয় না; হোক না সেটা যতটা তুচ্ছ কিংবা মূল্যবান। বড়-সড় আদুরে স্বভাবের ভাইটাকে “টেডি বিয়ার” ডাকে বেলা।
এরপর হচ্ছে নম্র-ভদ্র, ভাবুক। সহানুভূতিশীল, কবিমনা আর পারিবারিক শান্তি রক্ষাকারী মাইকেল, যে কিনা কোর্টনি হওয়া সত্ত্বেও, বাবা আর অন্য দুই ভাইয়ের উদাহরণ কিংবা উৎসাহে আমল না দিয়ে সারা জীবনে কখনো একটাও পাখি কিংবা জীব হত্যা করেনি। এর বদলে প্রকাশ করেছে তিনটা বই। একটা কবিতা আর অন্যাটা দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাস আর রাজনীতি নিয়ে লেখা। শেষের দু’টো তত দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যবসায়ী সমাজ নিষিদ্ধ করেছে সে দেশে। এছাড়াও অত্যন্ত বিখ্যাত সাংবাদিক মাইকেল গোল্ডেন সিটি মেইল নামক ইংরেজি পত্রিকার ডেপুটি এডিটর। যারা শক্ত কণ্ঠে লিখে চলেছে, জন ভরসটার আর তার বর্ণবাদী নীতির বিপক্ষে। অবশ্য পত্রিকাটার আশি শতাংশ শেয়ার কোর্টনি এন্টারপ্রাইজের। নতুবা এত কম বয়সে এতটা দায়িত্বশীল পদ পাওয়া সম্ভব হত না।
ইসাবেলার শৈশবে মাইকেলই ছিল তার রক্ষক আর উপদেষ্টা। নানা’র পরে সেই-ই হচ্ছে মেয়েটার প্রিয় গল্পকথক। নিজের জীবনে অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে মাইকেলকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করে বেলা।
এবারে তাই ভাইয়ের হাতের লেখা দেখে আনন্দের সাথে সাথে অনুতপ্ত বোধও এলো মনে। রামোনের সাথে দেখা হবার পর থেকে ছয় মাস ধরে কোনো চিঠি লেখেনি ভাইকে।
প্রথম পাতার দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে চোখ যেতেই সাথে সাথে চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করে দিল বেলা…।
বাবা বলেছে তুমি নাকি কাদোগান স্কোয়ারের ফ্ল্যাটে বেশ মনোযোগ দিয়েই থিসিসের কাজ করছ। গুড ফর ইউ, বেলা। যাই হোক, তুমি নিশ্চয় পাঁচটা বেডরুমের সবক’টি কাজে লাগাচ্ছে না। তাই আশা করি আমার জন্য কোথাও না কোথাও একটু জায়গা হয়ে যাবে। এ মাসের পনের তারিখ থেকে তিন সপ্তাহের জন্য লন্ডনে থাকতে হবে আমাকে। প্রতিদিন সারাক্ষণই বাইরে থাকব। প্রচুর ইন্টারভিউ আর মিটিং আছে। তাই প্রমিজ করছি তোমার পড়া শোনায় বিরক্ত করব না…।
তাই বাধ্য হয়ে এ সময়টা কাদোগান স্কোয়ারেই কাটাতে হবে। একদিকে খুশিই হল বেলা, কেননা এ সময় রামোনের’ও বিদেশে ট্রিপ পড়েছে। তাই অন্তত মাইকেলের সঙ্গ পাওয়া যাবে।
জোহানেসবার্গে মেইলের’ অফিসে চিঠির উত্তর পাঠিয়ে কাদোগান স্কোয়ারকে সাজাতে বসল বেলা। এখনো এক সপ্তাহ সময় আছে হাতে। সবকিছু এমনভাবে ঠিকঠাক করতে হবে যেন সত্যিই সে এখানে থাকে।
“ওকে অনেক কিছু নিয়েই কৈফিয়ত দিতে হবে।” ঈষৎ ফোলা পেটের উপর হাত রেখে রামোনকে বলল বেলা।” তাও ভালো যে মাইকেল বেশ সমঝদার। আমি নিশ্চিত তোমাদের দু’জনের ভালই মিলবে। শুধু যদি দেখা
“তোমার ভাই থাকতে থাকতে কাজ সেরে লন্ডনে চলে আসতে চেষ্টা করব।”
“ওহ, রামোন ডার্লিং, খুব মজা হবে তাহলে প্লিজ চেষ্টা করো।”
হিথ্রো এয়ারপোর্টের আন্তজার্তিক ব্যারিয়ার দিয়ে লাগেজ ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে বের হয়ে এলো মাইকেল। হাস্যমুখে দাঁড়িয়ে থাকা বোনকে দেখেই কোলে নেয়ার মতো ভঙ্গি করে উপরে তুলে ফেলল। কিন্তু বেলা’র পেট নিজের শরীরে লাগতেই তাড়াতাড়ি অতি সাবধানে নামিয়ে দিল মেঝেতে।
মিনিতে করে শহরে নিয়ে আসার সময় মাঝে মাঝেই ভাইয়ের দিকে তাকাল বেলা। রোদে পোড়া দেহত্বক সত্ত্বেও চুলগুলি বেশ লম্বা হয়ে গেছে। যাই হোক হাসিটা এখনো বেশ অকপট আর নীল কোর্টনি চোখ জোড়াতে অন্যদের মতো শব্দ চাহনি নয় বরঞ্চ বেশ চিন্তাশীলতার ছাপ।
ভাইয়ের কাছ থেকে বাসার টুকটাক খবর নিতে নিতে কায়দা করে নিজের বিষয় এড়িয়ে যেতে চাইল বেলা। মাইকেলের কাছ থেকে জানা গেল বাবা নাকি আমর্সকারের চেয়ারম্যান হিসেবে নতুন পদে রীতিমতো জাকিয়ে বসেছেন। আর ওয়েস্ট্রেভেদেনের উপর নানা’র শাসন দিনে দিনে আরো বেশি কঠোর হয়ে উঠছে। শন্ এখনো গেরিলাদের প্ল্যাটুনের পাশাপাশি সঁড়ের দলকেও খতম করে চলেছে। অন্যদিকে শেয়ার হোল্ডারদেরকে রেকর্ড পরিমাণ লাভের ভাগ দিয়েছে গ্যারি। তার স্ত্রী হোলি অন্তসত্ত্বা হওয়ায় এবারে সবাই কন্যা শিশুর জন্যই দিন গুনছে।
