“এই বাচ্চাটাই আসলে আমাকে এত সেন্টিমেন্টাল করে তুলেছে!” পেটে হাত দিয়ে চাইল কারো অস্তিত্ব টের পাবার। পরিবর্তে সোজা। সমান মধ্যদেশে হাত দিয়ে ভাবল, “ঈশ্বর, যদি সবকিছুই মিথ্যে আশংকা হয়!”
মন খারাপ ভাব আরো বেড়ে যেতেই মিনি’র বদ্ধ প্রকোস্টে হাতড়ে বের করে আনল ক্লিনেক্সর প্যাকেট।
যাই হোক ফ্ল্যাটের সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই খুলে গেল দরজা। রামোন এসে হাত ধরতেই শুকিয়ে গেল সব কান্না।
***
অত্যন্ত রুচিশীল আর সুসজ্জিত কাডোগান স্কোয়ারের পারিবারিক ফ্ল্যাটের প্রথম দুই ফ্লোর ভিকটোরিয়ান আমলের লাল ইট দিয়ে তৈরি।
শুধুমাত্র ঠিকানা হিসেবে ঐ বাড়িকে ব্যবহার করা ইসাবেলা শুক্রবারে এসে চিঠি-পত্র নিয়ে যায় আর নিচের ভাড়ার ঘরে বসে ফুলটাইম হাউজকীপারের সাথে চা খেয়ে যায়। ওয়েল্টেজ্ৰেদেন আর অন্যান্য জায়গা থেকে আসা লং ডিসটেন্স ফোনগুলো ভালোভাবেই সামাল দেয় বেলার এই সুহৃদ হাউজকীপার।
রামোনের ছোট্ট ফ্ল্যাটটাকেই সত্যিকারের ঘর বানিয়েছে ইসাবেলা। এখানকার ওয়াডড্রোবে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় কাডোগান স্ট্রিটের বাড়িসহ দু’জায়গায়তেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে পোশাক। বিছানার এক কোণাতে ছোট্ট করে বানিয়েছে তার স্টাডি।
বিবাহিত দম্পত্তিদের মতো রুটিন মেনে চলে রামোন আর ইসাবেলা। গাইনোকোলজিস্ট জগিং করতে বারণ করায় জিমে কিংবা রাইডিং করে। এরপর রামোন ব্যাংকে যাবার পর লাঞ্চ পর্যন্ত মন দিয়ে থিসিসের কাজ করে বেলা। অ্যালকোহল ছেড়ে দিয়ে বাচ্চার সুস্থতার দিকে নজর দেয়ায় জাস্টিন ডি ব্ল্যাঙ্ক কিংবা হ্যাঁরোড’য়ে গিয়ে বসে দুজনে।
“আমি ব্যাঙের মতো ফুলে যেতে চাই না।”
“আমার কাছে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত রমণীই হচ্ছ তুমি, আর গর্ভবতী হওয়াতে তো যৌবন পূর্ণতা পেয়েছে।”
বেলা’র বিশাল উদরে হাত দিয়ে স্পর্শ করল রামোন।
লাঞ্চের পরে টিউটরের সাথে দেখা করে কিংবা ব্রিটিশ মিউজিয়ামের রিডিং রুমে বসে বাকি বিকেলটা কাটিয়ে দেয় বেলা। এরপর মিনিতে চেপে বাসায় ফিরে যায় রামোনের ডিনার রেডি করার জন্য। ভাগ্য ভালো ডিপ্লোম্যাটিক প্লেট নাম্বার এখনো ব্যবহার করতে পারে বেলা; বাবা’ই সব ঠিকঠাক করে গেছে। তাই ট্রাফিক সত্ত্বেও সময় মতো পৌঁছে যায় ফ্ল্যাটে।
পারতপক্ষে এখন আর রাতের বেলা কোথাও বের হয় না। মাঝে মাঝে শুধু থিয়েটার কিংবা গিয়ে বসে হ্যারিয়েট আর তার লেটেস্ট বয়ফ্রেন্ডের সাথে।
আস্তে আস্তে স্ফীত হতে লাগল সমান মধ্যদেশ। সিল্কের ড্রেসিং গাউনের সামনের অংশ খুলে গর্বিতভাবে দেখাল রামোন’কে। উচ্ছল আনন্দে বলে উঠল, “দেখো”।
“হ্যাঁ, ছেলে না হয়ে যায় না।” সায় দিল রামোন।
“তুমি কিভাবে জানো?”
“এখানে।” বেলার হাত ধরে নির্দিষ্ট একটা জায়গায় বসিয়ে দিয়ে রামোন বলল, “বুঝতে পারছ না?”
“আহ, একেবারে বাপের মতই হয়েছে নিশ্চয়। ঘুম পেয়ে গেছে আমার।”
মেয়েকে হ্যারোজস এর চার্জ কার্ড দিয়ে গেছেন শাসা। সেখান থেকেই কিনেছে বেলা। যদিও তরুণী হবু মায়েদের জন্য পোশাক বানাতে বিশেষ নিত্য নতুন বুটিক খুঁজে বের করে হ্যারিয়েট।
প্রতি মাসে অন্তত একবার সপ্তাহখানেক বা তার চেয়েও বেশি সময়ের জন্য ব্যাংকের কাজে শহরের বাইরে যায় রামোন। যাই হোক, সুযোগ পেলেই ফোন দেয় বেলাকে। তাই ছেলেটা ফিরে আসার পর পর আনন্দ বেড়ে যায় শতগুণ।
এরকম এক ট্রিপের পর হিথ্রো থেকে রামোনকে সরাসরি ফ্ল্যাটে নিয়ে এলো বেলা। হলে ট্রাভেল ব্যাগ ফেলে টেয়ারের উপর জ্যাকেটটাকে ছুঁড়ে রেখে বাথরুমে চলে গেল রামোন।
হঠাৎ করেই জ্যাকেটের ভেতরের পকেট থেকে পাসপোর্টটা স্লিপ করে পড়ে গেল কার্পেটের উপর। উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে রামোনের ছবি দেখতে পেল বেলা। একই সাথে জন্ম তারিখও পেয়ে গেল। মনে পড়ে গেল আর মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই রামোনের জন্মদিন। ভাবতে লাগল কিভাবে এবার স্মরণীয় করে রাখা যায় দিনটাকে। প্ল্যান করে ফেলল মে-ফেয়ার বুটিক শপে দেখা কাঁচের নগ্ন মূর্তি কিনে গিফট করবে ছেলেটাকে। রেনে লালিক’র তৈরি মূর্তিগুলো ঠিক যেন তার দেহ সৌষ্ঠরের মতো করেই বানানো হয়েছে।
পাসপোর্টের আরো কয়েকটা পাতা ওল্টাতেই ভিসা দেখে চোখ আটকে গেল। বিস্মিত হয়ে দেখল আজ সকালেই মস্কোর স্ট্যাম্প লাগানো হয়েছে।
“ডার্লিং” বাথরুমের দরজার এপাশ থেকে জানতে চাইল বেলা, আমি তো ভেবেছিলাম তুমি রোমে গেছ। মস্কো’র সিল কেন তাহলে?” সারা জীবনের শিক্ষা থেকে জানে রাশিয়া হলো সবচেয়ে বড় খ্রিস্ট-বিদ্বেষী দেশ। তাই পাসপোর্টে মিলটা দেখেই কপালের চুলগুলো দাঁড়িয়ে গেছে।
বন্ধ দরজার ওপাশে মিনিট খানেকের জন্য নেমে এলো নীরবতা। এরপর হঠাৎ করেই বের হয়ে বেলা’র হাত থেকে পাসপোর্ট কেড়ে নিল রামোন। শীতল অভিব্যক্তি আর চোখ দুখানা দেখে ভয় পেয়ে গেল বেলা।
“আর কখনো আমার কোনো বিষয়ে নাক লাগবে না।” নরম স্বরে ঘোষণা করল রামোন।
পরে আর কখনোই এ বিষয়ে কিছু না বললেও প্রায় সপ্তাহখানেক পর বেলা’র মনে হল যে তাকে মাফ করে দিয়েছে রামোন। এতটা খারাপ লাগল যে বেলা নিজেও চেষ্টা করল পুরো ব্যারটাকে ভুলে যেতে।
নভেম্বরের শুরুতে, কাদোগান স্কোয়ারে রুটিন ভিজিটের সময় হাউজকীপার হাতে তুলে দিল এক গাদা চিঠি। সবসময়ের মতই বাবার চিঠি এসেছে। কিন্তু এবারে তার সাথে ভাই মাইকেলের হাতের লেখা খামের উপর দেখে খুশি হয়ে উঠল বেলা।
