“সকাল একটা বাজে।” হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করলেন শাসা। কিন্তু তাকে থামিয়ে দিল ইসাবেলা।
“এত তাড়াতাড়ি বিছানায় যাবার কী দরকার?” বাবার হাতে চাপ দিল বেলা। “চল তোমার জন্য সিগার নিয়ে আসি। সারা সন্ধ্যাতে তোমার সাথে একটুও কথা বলতে পারি নি।”
রুমের একপাশে রাখা চামড়ায় মোড়া আর্মচেয়ারে আরাম করে বসলেন শাসা। স্পষ্ট আনন্দ নিয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের দিকে। ঠিক যেন তার আস্তাবল থেকে আসা টগবগে কোনো বাচ্চা ঘোড়া কিংবা আর্ট কালেকশনে থাকা রতুগুলোর একটা। অবশেষে সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে তার এই মেয়ে হলো কোর্টনিদের মাঝে সবচেয়ে সুন্দরী।
তরুণ বয়সে তার মা’ও ছিলেন একই রকম সুন্দরী। বহু বছর হয়ে যাওয়ায় শাসা’র স্মৃতিতে তেমন উজ্জ্বল না থাকলেও ওয়েল্টেভ্রেডেনের ড্রইং রুমে পোর্ট্রেট করা আছে বেলা’র দাদীমা’র ছবির কালো চোখ জোড়া দিয়েও ঠিকরে বের হচ্ছে তার চারিত্রিক মাধুর্যতা।
বাবা’র ডেস্ক থেকে স্বর্ণের কাটার বের করে সিগারের মাথা কেটে শাসা কে তৈরি করে দিল বেলা। মেয়ের দিকে তাকিয়ে অ্যামব্যাসডর নিশ্চিত হলেন যে, যৌবনের তারুণ্যে দাদীমা’র রূপকেও হার বানিয়ে দিয়েছে ইসাবেলা।
“আজ সকালে প্রোফেসর সিমন্স আমার থিসিসের লেটেস্ট অংশটা পড়েছেন।”
“তার মানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদধূলি দিয়ে এখনো তুমি তাদেরকে ধন্য করো।” আগুনের নরম আলোতে মেয়ের খালি কাঁধের দিকে তাকালেন শাসা। মায়ের আইভরি রঙা দেহতুক পেয়েছে মেয়েটা।
“ওনার ধারণা ভালই হয়েছে।” খোঁচাটুকু এড়িয়ে গেল বেলা।
“তুমি আমাকে যে প্রথম একশ পৃষ্ঠা পড়তে দিয়েছিলে, যদি সেরকমই হয় তাহলে প্রফেসরের ধারণাই সঠিক।”
“উনি চান আমি যেন এখানে থেকেই বাকিটুকু শেস করি।” বাবা’র দিকে না তাকিয়েই বলে উঠল বেলা। বুকের মাঝে কেমন যেন করে উঠল শাসা কোর্টনির।
“একা একা লন্ডনে?” তাড়াতাড়ি জানতে চাইলেন।
“একা একা? পাঁচশ বন্ধু, কোর্টনি এন্টারপ্রাইজের কর্মচারীরা, আমার মা…!” বাবার কাছে ব্যান্ডি বেলুন এনে জুড়ে দিল বেলা, ‘অদ্ভুত এই শহরে একেবারে একা থাকব না, পাপা।”
কগন্যাবো চুমুক দিতে দিতে মরিয়া হয়ে কোনো কারণ খুঁজতে লাগলেন যাতে করে সাথে যেতে বাধ্য হবে বেলা।
“কোথায় থাকবে?” জানতে চাইলেন শাসা।
“পারলেন না বাবা, হেরে গেল।” পিতার মুখের উপর হেসে হাত থেকে সিগার নিয়ে নিল বেলা। লাল রাঙানো ঠোঁটে এক গাল ধোয়া বানিয়ে ছুঁড়ে মারল বাবার মুখের উপর। “সাদোগান স্কোয়ারে প্রায় মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটা পারিবারিক ফ্লাট খালি পড়ে আছে।”
সবচেয়ে অমোঘ অস্ত্রটা হানার জন্য প্রস্তুত হলো বেলা। “পাপা, তুমিই তো চাইতে যেন আমি ডক্টরেটটা শেষ করি। এখনো মানা করবে না, তাই না?”
শাসাও খেলতে চাইলেন; উত্তরে মেয়েকে বলে উঠলেন, “তুমি এত সাবধানে সব কিছু ভেবে রেখেছ; তাহলে এরই মাঝে দাদীমা’কেও নিশ্চয় জানিয়েছ?”
চুপ করে আমচেয়ারে বসে থাকা বাবার কোলের উপর বসে পড়ে কপালে কি করে বেলা বলে উঠল, “ডার্লিং ড্যাডি আমি তো আরো ভাবলাম যে আমার হয়ে তুমিই নানা’কে সব খুলে বলবে।
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন মিঃ অ্যামবাসাডর।
যাক, নিশ্চিন্ত হলো বেলা। নানা’কে বাবাই সামলাবে। কিন্তু ন্যানিও তো আছে। যাই হোক আগে ভাগেই ওর সতের জন নাতী-নাতনীর নাম মুখস্থ করে বেলা জানাল, “ভেবে দেখো ন্যানি তুমি তিন বছর ধরে বাড়ি যাওনি। কেপে নৌকা থামার সাথে সাথে জোহানসকে দেখবে দাঁড়িয়ে আছে ঘাটে।” সবচেয়ে প্রিয় পুত্রের কথা শুনে চক্ করে উঠল ন্যানির চোখ। তাই দু’দিন জোরাজুরির পর বেলা’র কাছেই হেরে গেল বুড়ী।
সাউদাম্পটনে সবাইকে বিদায় জানাতে এসেছে বেলা। জিরাফের গলার মতো লম্বা ক্রেন দিয়ে ইউনিয়ন ক্যাসেল লাইনারে ভোলা হচ্ছে শাসা’র নতুন অ্যাশটন মার্টিন। সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল পরিচারকদের দল। শফার ক্লোনকি থেকে শুরু করে মালয় শেষ পর্যন্ত সবাইকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানাল বেলা। ইসাবেলা কিস্ করতেই কান্নায় ভেঙে পড়ল ন্যানি।
“তুমি হয়ত এই বুড়ীর চেহারা আর দেখতে পাবে না। চলে গেলে মনে করো আমার কথা স্মরণ করো ছোটবেলায় তোমাকে কিভাবে পেলেছি…।”
“যাও তো ন্যানি। তুমি না থাকলে আমার বাচ্চাদের কে দেখবে?”
“তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে এসো সোনা। বুড়ী ন্যানি তাহলে তোমাকে চোখে চোখে রাখতে পারবে। তোমাকে সুন্দর একটা দক্ষিণ আফ্রিকান ছেলে খুঁজে দেব।”
শাসা’কে গুডবাই বলতে এসে হঠাৎ করে কাঁদতে শুরু করে দিল বেলা। ভাবল-ব্রেস্টেড ব্লেজারের পকেট থেকে কড়কড়া সাদা রুমাল মেয়ের দিকে বাড়িয়ে দিলেন শাসা। বেলা কাজ সেরে বাবাকে দিতেই তিনি নিজেও শব্দ করে নাক মুছলেন।
“এত বাতাস না এখানে?” ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “হাঁচি শুরু হয়ে যাচ্ছে।”
জেটি ছেড়ে আস্তে আস্তে নদীর দিকে চলে গেল লাইনার। অন্যান্য প্যাসেঞ্জারদের থেকে আলাদা হয়ে জাহাজের রেইল ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন লম্বা, ঋজুদেহী শাসা। ডির্ভোসের পর আর কখনো বিয়ে করেননি। বেলা জানে ডজন ডজন মেধাবী-সুন্দরী’র দেখা পেলেও একাই পথ চলেছে বাবা।
“কখনো তাঁর একা লাগত না?” জাহাজের ডেক্ অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে নাড়তে ভাবল বিস্মিত বেলা। “ গাড়ি চালিয়ে লন্ডনে ফেরার সময় কান্নার জলে ঝাপসা হয়ে গেল সামনের রাস্তা।
