যাই হোক এ সমস্ত কিছুই রামোনের সাথে দেখা হবার আগের ঘটনা। স্পেন থেকে ফেরার পর একবারও নিজের শিক্ষকের সাথে দেখাও করেনি কিংবা বই খুলে দেখারও সময় পায়নি।
এখন বরঞ্চ রামোনের কাছে শিখছে জুড়ো আর আত্মরক্ষার রহস্য। মাঝে মাঝে আবার হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়ায় গ্যালারি আর মিউজিয়ামে। আর সবকিছুই শেষ হয় কেনসিংটনে রামোনের ফ্ল্যাটের বিছানাতে গিয়ে। ভেবেও দেখে না ব্যাংকে সময় না দিয়ে ওর সাথে কিভাবে এত সময় কাটায় ছেলেটা। রামোনের সান্নিধ্য পেয়েই সে ধন্য, কৃতজ্ঞ।
উপরন্তু ব্যাংকের রহস্যময় কোনো এক প্রয়োজনে রামোন আটদিনের জন্য লন্ডন ছেড়ে যাবার পর কেমন নির্জীব আর মনমরা হয়ে গেল বেলা। প্রতীক্ষার বিরহে আকুল হয়ে সকালে ঘুম থেকে উঠার পর বমি করা শুরু করে দিল।
ফ্ল্যাটের সবকিছু গুছিয়ে রাখা। ফুল সাজানো আর চমৎকার সব রান্না নিয়ে ব্যস্ত রইল সারাক্ষণ।
অবহেলা করতে লাগল অ্যামবাসির দায়িত। অফিসিয়াল নিমন্ত্রণ বাতিল করে শেফ আর স্টাফদেরকে নিজেদের মতো করে কাজ করার উপর ছেড়ে দিল। উদ্বিগ্ন হয়ে শাসা একদিন মেয়েকে বললেন, “তুমি তো ঘরেই থাকো না
বেলা। একটা জিনিসের জন্যও তোমার উপর ভরসা করতে পারি না। এর উপর আবার ন্যানি জানাল, গত সপ্তাহে নাকি মাত্র দুদিন নিজের বিছানায় ঘুমিয়েছ।”
“ন্যানি তো গল্প বানাতে ওস্তাদ।”
“কী হয়েছে ইয়াং লেডি?”
“আমার বয়স একুশেরও বেশি ডালিং পাপা, আর তোমার সাথে তো আমার অ্যাগ্রিমেন্ট হয়েছে যে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু বলতে বাধ্য নই।”
“তোমার সাথে এও অ্যাগ্রিমেন্ট হয়েছে যে মাঝে মাঝেই আমার রিসেপশনে নিজের চেহারা দেখাবে।”
“চিয়ার আপ, পাপা।” বাবাকে কিস্ করে ঘুস দিতে চাইল মেয়েটা। “কয়েক মাসের মধ্যেই তো আমরা কেপ টাউনে ফিরে যাচ্ছি। তখন আমাকে নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।”
সে সন্ধ্যাতেই রামোনের কাছে বেলা জানতে চাইল দক্ষিণ আফ্রিকার জনপ্রিয় লেখক অ্যালান প্যাটনের লন্ডন আগমন উপলক্ষে স্ট্রাফালগার স্কোয়ারে অ্যামব্যাসিতে শাসার দেয়া ককটেইল পার্টিতে আসবে কিনা সে।
পুরো এক মিনিট ধরে সাবধানে চিন্তা করার পর মাথা নাড়ল রামোন। “তোমার বাবার সাথে দেখা করার জন্য সঠিক সময় এখনো আসেনি।”
“কেন না ডার্লিং?” মুহূর্তখানেক আগেও ব্যাপারটা ওর কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; কিন্তু এবারে প্রত্যাখ্যাত হয়ে খানিকটা নাখোশ হল বেলা।
“অনেক কারণ আছে।” মাঝে মাঝে এত অদ্ভুত আচরণ করে ছেলেটা। বুঝতে পারল কোনো লাভ নেই। অসম্ভব সুদর্শন ওই চেহারার নিচেই আছে। ইস্পাতের মতো কঠিন এক বর্ম।
“আর এতে করেই বেড়ে গেছে ওর আকর্ষণ।” আপন মনেই হাসল বেলা। আর কারো সাথেই রামোনকে শেয়ার করতে চায় না। পরস্পরে মগ্ন এই জুটির অন্য কাউকে তাই প্রয়োজন নেই।
মাঝে মধ্যে হ্যারিয়েট কিংবা অন্য কোনো পরিচিতের সাথে লেস এ অথবা হোয়াইট এলিফ্যান্ট এ খেতে যাওয়া; এক আধবার অ্যানাবেল’ এর পার্টিতে নাচতে যাওয়া ছাড়া পারতপক্ষে কারো মাথে মেশে না বেলা আর রামোন। ছেলেটার নিজের কোনো বন্ধু নেই কিংবা থাকলেও বেলার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। যদিও এসব নিয়ে মোটোওভাবে না বেলা।
যেসব উইকেন্ডে আ্যামবাসির কাজ থেকে কৌশলে পালাতে পারে, সেসব দিনে মিনি কুপারের পেছনে ওভার নাইট ব্যাগ আর টেনিস র্যা গ্রামের দিকে চলে যায় বেলা আর রামোন। রবিবারে শহরে ফিরতে ফিরতে হয়ে যায় গভীর রাত।
আগস্টের শুরুতে, নির্জনে বাসের অভ্যাস ছেড়ে দু’জনে অতিথি হিসেবে গেল হ্যারিয়েট কু-চ্যাম্পের পারিবারিক এস্টেটে।
রামোনের হয়ে বন্দুক লোড় করে দিল ইসাবেলা। বারোটা গুলিতে বারোটা পাখি মারল ও শ্যেনচক্ষু দিয়ে দেখে মাথা নেড়ে বলে উঠল, “তেত্রিশটা সিজনে আমি এমনটা আর কেউ দেখিনি।” ইংরেজ ইতিহাসের দক্ষ বন্দুকবাজদের কথা স্মরণ করিয়ে দিল হ্যারিয়েটের আর্ল বাবাকে।
দেখা গেল সন্ধ্যায় লম্বা ডিনার টেবিলে বসে বিশপ আর ব্যারোনেটদেরকে ছাপিয়ে, রামোনের সাথেই কথা বলছেন ভদ্রলোক। মনে হচ্ছে ভালোই কাটবে উইকেন্ড। বিশাল দুর্গের মতো পুরাতন কাউন্ট্রি হাউজের একেবারে কোণার দিকের লাগোয়া রুম দিয়েছে হ্যারিয়েট দু’জনকে। ব্যাখ্যা হিসেবে বলল, “পাপা’র ইনসমনিয়া আছে। আর তুমি আর রামোন তো যা শব্দ করো!”
“তুমি এত পচা কথা বলো না। প্রতিবাদ করে উঠল ইসাবেলা।
“আমার কথা ছাড়ো। রামোন’কে বলেছ তোমার সাইপ্রাইজের কথা?” মিষ্টি স্বরে জানতে চাইল হ্যারিয়েট।
“নাহ্, সঠিক মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করছি।” আত্মরক্ষায় তাড়াতাড়ি বলে উঠল বেলা। “অভিজ্ঞতা থেকে জানি এ ধরনের সংবাদের জন্য সঠিক মুহূর্ত বলে কিছু নেই।”
অন্তত একবারের জন্য হলেও ঠিক কথাটাই বলেছে মেয়েটা। উইকেন্ড কেটে গেল। কোন সুযোগ পাওয়া গেল না। লন্ডনের কাছাকাছি পৌঁছে তাই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সব ঝেড়ে ফেলে দিল বেলা, ভাগ্য ভালো ফাস্ট-ক্লাস কম্পার্টমেন্টে কেবল তারাই আছে।
“ডার্লিং, গত বুধবারে আমি ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম অ্যামব্যাসি ডাক্তার নয়, হ্যারিয়েটের পরিচিত একজন। টেস্টের রেজাল্ট পেয়েছি। শুক্রবারে।” একটু থেমে রামোনের অভিব্যক্তি দেখল। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। একই রকম সুদূরের সবুজ দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে বেলার দিকে। জানে একে অপরের প্রতি তাদের ভালোবাসায় কেউ চিড় ধরাতে পারবে না। তারপরেও কেমন একটা দূরত্ব থেকেই যায়। তাড়াতাড়ি তাই শেষ করার জন্য বলল,
