ষাঁড়ের সাথে লড়াইয়ে বল্লমধারী অশ্বারোহী যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে স্যালুট জানানোর জন্য তারা প্রবেশের সাথে সাথেই বেজে উঠল বাজনা। আর দাঁতে দাঁত ঠেকে গেল ইসাবেলা’র। পেট ফেটে পায়ের সাথে নাড়িভুড়ি বেঁধে যাওয়ার পরিণতির ভয়ংকর সব ঘোড়াদের কথা শুনেছে মেয়েটা। ওর ভয় কাটাতে তুলা। ক্যানভাস আর চামড়ার মোটা দেহবর্ম দেখাল রামোন, যাতে রক্ষা পাবে অবলা জীবগুলো। সবশেষে দেখা গেল একটাও ঘোড়া একটুও ব্যথা পায়নি।
ঘোড়ার জিনের উপর বসে ষাঁড়ের পিঠে স্টিলের গুঁতো দিল বল্লমধারী যোদ্ধা। ফিনকি দিয়ে ছুটল রক্ত।
ভয়ংকর এক মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন ইসাবেলা ঠক ঠক করে কাঁপতে শুরু করল। রামোন বিড়বিড় করে জানাল : একেবারে সত্যিকারের রক্ত। এখানে যা দেখছ তার সবই সত্যি। জীবনেরই মতো সত্যি। এটাই জীবন, ডালিং জীবনের সমস্ত নিষ্ঠুরতা, সৌন্দর্য আর আবেগ এখানে পাবে।”
বুঝতে পেরে অবশেষে শান্ত হয়ে ঘটনার প্রবাহমানতায় নিজেকে সঁপে দিল বেলা।
নিজের ব্যান্ডেরিলাস তুলে নিল এল কোরডোবসস। রঙিন কাগজের ফিতে লাগানো লম্বা অস্ত্রটাকে মাথার উপর উঁচু করে সূর্যের আলোয় পোজ দিল লোকটা। এরপর ষাঁড়কে ডাকল। জম্ভটা কাছে আসতেই হালকা নাচের ছন্দে দৌড়ে গেল। একসাথে হতেই দমবন্ধ করে বসে রইল ইসাবেলা। কিন্তু ব্যান্ডে রিলাম মাটিতে গেঁথে ঘুরতে ঘুরতে দূরে চলে গেল মাস্টার। মাথা নামিয়ে রশিতে পুঁতো দিতে চাইল ষাঁড়টা।
ঢোলের আওয়াজে বোঝা গেল সর্বশেষ অঙ্ক, সত্যের ঘন্টার, সময় হয়ে গেছে। স্টেডিয়াম জুড়ে তৈরি হল নতুন এক পরিবেশ। ষাঁড় আর এলকোরডোবস নেচে একে অন্যকে সাথে নিয়ে মৃত্যু নৃত্যে মেতে উঠল। একে অন্যকে এত কাছ থেকে পাস করে যাচ্ছে যে প্রাণীটার কাঁধের রক্তের ছিটে এসে পড়ল ম্যাটাডোরের উরুতে।
অবশেষে প্রেসিডেন্ট বক্সের নিচে দাঁড়িয়ে কালো সিল্ক লাগানো নিজের মনতেরা টুপি খুলে বঁড়টাকে উৎসর্গ করার অনুমতি চাইল। ইসাবেলার আনন্দ বাঁধ ভেঙে গেল যখন লোকটা তার আসনের নিচে এসে ষড়টাকে উৎসর্গ করতে চাইল ওর সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে। মনতেরা ইসাবেলার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে ষড়টার কাছে ফিরে গেল লোকটা।
রিং-এর একেবারে মাঝখানে সর্বশেষ পাস্ খেলল এল কোরডোবস। একটার চেয়ে অন্যটা হল আরো বেশি দর্শনীয়। প্রতিবার সমস্বরে চিৎকার করে উঠল বিমুগ্ধ দর্শক। অবশেষে একেবারে ইসাবেলার সিটের নিচে এসে উদ্যত হল ষাঁড়টাকে মেরে ফেলার জন্য। লম্বা রূপার তরবারি বের করতেই ইসাবেলার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রামোন জানাল, “দেখো! সবচেয়ে। কঠিন কাজ, রেসিবিয়েন্দা। সর্বশক্তি দিয়ে ছুটে যেতে চাইল ষড়টা। দৌড়ানোর পরিবর্তে চারকোণা করে দাঁড়িয়ে শিং এর গিয়ে পড়ল এল কোরডোবস। ছিঁড়ে গেল হৃদপিণ্ডের সবচেয়ে বড় ধমনী, ঝরনার মতো করে ছুটে এলো তাজা রক্ত।
যাঁড়ের লড়াই দেখে হোটেলে ফেরার পথে কেউই কোন কথা বলল না। রহস্যময় এক বোধে আপ্লুত হয়ে আছে দু’জনে। রক্ত আর পুরো ব্যাপারটার ট্র্যাজিক সৌন্দর্য এক ধরনের আত্মিক বেদনার সৃষ্টি করেছে যা কেবলই মুক্ত হবার পথ খুঁজছে। ইসাবেলা বুঝতে পারল তার চেয়েও বেশি অস্থির হয়ে পড়েছে রামোন।
জোড়া দরজা আর রট আয়রনের ব্যালকনি লাগানো তাদের বেডরুম মুখ করে আছে পুরাতন মুরিশ রাজপ্রাসাদের দিকে। মেঝের একেবারে মাঝখানে ও’কে দাঁড় করাল রামোন। মাথার উপরে কর্কশ শব্দে ঘুরছে প্রাচীন আমলের ফ্যানের ব্লেড। বেলা’র পোশাক খুলে নিল রামোন। মনে হচ্ছে যেন সে নিজেও করিড়া প্রথা পালন করছে। হাঁটু গেড়ে বেলা’র কোমর জড়িয়ে ধরে মুখ ডুবিয়ে দিল পেটের নিচে। বেলা এতটা কোমলভাবে ওর মাথায় হাত রাখল যেন এই স্বর্গীয় ভালোবাসার যোগ্য নয় সে, নশ্বর মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় এ বিশাল মহিমা বহন করা।
ছোট্ট শিশুর মতই কোলে তুলে ইসাবেলাকে বিছানায় নিয়ে গেল রামোন। মনে হচ্ছে যেন এর আগে কিছুই হয়নি অথবা অতল গহীনে লুকিয়ে রাখা শরীর আর আত্মার সেই গোপনীয়তায় প্রবেশ করেছে রামোন যার অস্তিত্ব বেলা নিজেও জানত না।
ছেলেটার বাহুতে এলেই স্থান-কাল-পাত্র বিস্মৃত হয়ে যায় বেলা। যেন ধূমকেতুর ন্যায় উঠে যায় ঊর্ধ্বাকাশে স্বর্গের দিকে। সবুজ চোখ জোড়া দেখে বুঝতে পেয়ে দেহের ন্যায় রামোনের আত্মাও বিলীন হয়ে গেছে ওর মাঝে। যখন মনে হয় যে আর পারবে না, তখনই টের পায় আগ্নেয়গিরির লাভার মতো উষ্ণ তরল এসে ভরে যাচ্ছে শরীর।
দিনের শেষ আলো মরে যেতেই রুমের মাঝে দেখা গেল ছায়ার নৃত্য। নিঃশেষিত হয়ে কথা বলা কিংবা নড়া-চড়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে বেলা; একটুকানি কাদার শক্তি আছে কেবল। অবশেষে নিদ্রা এসে সাঙ্গ করে দিল তাও।
***
২. মেয়েটার পৃথিবী উজ্জ্বল আর আনন্দময়
রামোন’কে পেয়ে আরো উজ্জ্বল আর আনন্দময় হয়ে উঠেছে মেয়েটার পৃথিবী।
দুনিয়ার বুকে স্বর্গ হয়ে উঠেছে প্রাণশক্তিতে ভরপুর শহর লন্ডন। সোনালি কুয়াশা মাখা উত্তেজনা ছেয়ে আছে চারপাশ। সোনার উপর বসানো মূল্যবান পাথরের মতই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রামোনের সাথে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত।
তিন বছর আগে লন্ডনে এসে পড়াশোনা শুরু করার পর ব্যাচেলার ডিগ্রি লাভ করেছে ইসাবেলা। এরপর বাবার উৎসাহে ডক্টরেট করার জন্য ভর্তি হয়েছে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টাল আর আফ্রিকান স্টাডিজ স্কুলে। থিসিসের বিষয় হিসেবে পছন্দ করেছে “আ ডিসপেনশেসন ফার পোস্ট কালোনিয়াল আফ্রিকা।” ভালই এগোচ্ছে থিসিস; আশা করছে কেপ টাউনে ফেরার আগেই শেষ করতে পারবে।
