“মনে হচ্ছে আমরা কেবল এই তিনটা জিনিসই করব।”-গ্লাসের সোনালি ওয়াইনের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ বেলা বলে উঠল-”খাওয়া অথবা পান করা অথবা…ওয়াইনে চুমুক দিয়ে অসমাপ্ত রেখে দিল বাক্য।
“তোমার ভাল লাগছে না?” জানতে চাইল রামোন।
“অসম্ভব।” ক্ষুরধার দৃষ্টি হেনে বলে উঠল বেলা, “কসিদো আর শেরী শেষ করো, সিনর, অনেক শক্তি চাই তোমার।”
খোলা জানালা দিয়ে আসা সূর্যের আলো পড়ে ঘুম ভেঙে গেল বেলার এবং যথারীতি রামোন নেই। কিন্তু না বড় সড় নরম বিছানাটায় পাশেই শুয়ে ঠাণ্ডা এক অভিব্যক্তি নিয়ে ওকে দেখছে ছেলেটা।
“ওহ, গড!” বুঝতে পারল ওকে পেতে অধীর হয়ে আছে রামোন। আনন্দের চোটে ফিসফিস করে বলে উঠল, “অসভ্য কোথাকার।” ওর মতো করে আর কেউ আগে চায়নি ইসাবেলাকে।
দেয়াল ঘেরা আঙ্গিনায় বেগুনি ফি আর গোর্ট চিজ দিয়ে ওদের জন্য নাশতা রেখে গেছে ইন কীপার। নেইল পলিশ লাগানো লম্বা নখ দিয়ে চামড়া খুলে অত্যন্ত সুস্বাদু ফিগ রামোনের ঠোঁটে গুঁজে দিল ইসাবেলা। এই কাজটা একমাত্র বাবার জন্যই করত এতদিন।
সরাইখানার মালিকের দুই মেয়ের একজন ধোঁয়া উঠা কফি নিয়ে আসতেই এক্সকিউজ মি বলে উঠে বেডরুমে চলে এলো রামোন। বাথরুমের ছোট্ট জানালা দিয়ে নিচের আঙ্গিনায় ইসাবেলা দেখা গেল হাসতে হাসতে নিজের সদ্য শেখা স্প্যানিশ জাহির করছে।
এর আগে ওয়াশবেসিনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকার সময়ে ওকে বার্থ কন্ট্রোল পিল খেতে দেখেছে রামোন। এক ধরনের হাস্যকর আনুষ্ঠানিকতাও করে এর সাথে, পানির গ্লাস নিয়ে টোস্ট করে বলে, “মেনি হ্যাপি রিটার্নস।” যাই হোক আপাতত টয়লেট ব্যাগে পাওয়া গেল না পিলগুলো।
বেডরুমে ফিরে এলো রামোন। মেঝের বেশির ভাগ অংশ জুড়েই বিছানা রাখা।
দরজার পাশের পর্দা ঘেরা কুলুঙ্গির উপর জড়ো করে রাখা হয়েছে ওদের লাগেজ। স্যটকেসের উপর অনাদরে পড়ে আছে ইসাবেলা’র বড় সড় চামড়ার কাঁধের ব্যাগ।
একটু থেমে কান পাততেই ভোলা জানালা দিয়ে আবছাভাবে শোনা গেল মেয়েটার গলা। বিছানার উপর ব্যাগটা ফেলে তাড়াতাড়ি কিন্তু সাবধানে সব বের করে ফেলল। কেনসিংটন ফ্ল্যাটে সিকুইনের হ্যান্ড ব্যাগ খুলে বার্থ কন্ট্রোল পিলের ব্র্যান্ড চেক করে নিয়েছিল রামোন। পরে অ্যামব্যাসি ডাক্তারের সাথে কথা বলে জেনেছে, যদি পিরিয়ডের দশম দিনের পূর্বে কোনো ব্যবস্থা না নেয় তাহলে অভ্যুলেশনের সময় গর্ভধারণের সম্ভাবনা বেড়ে যায় সে নারীর।
অবশেষে ব্যাগের তলায় পড়ে থাকা কুমীরের চামড়া দিয়ে তৈরি কালো পাসের ভেতর পাওয়া গেল ওষুধের চিকন প্যাকেট। আরো একবার ঘাড় সোজা করে কান পাতল রামোন। আঙ্গিনা থেকে কোনো শব্দ শুনতে না পেয়ে তাড়াহুড়া করে দৌড়ে এলো জানালার কাছে। দেখা গেল ইন কীপারের কালো বিড়ালটাকে কোলে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখছে বেলা।
আবারো তাই বেডরুমে ফিরে এলো নিজের কাজ শেষ করতে। প্যাকেট থেকে সাতটা ওষুধ মিসিং আছে। নিজের পকেট থেকে ওভাননের মতো হুবহু দেখতে আরেকটা প্যাকেট বের করল রামোন। এটা তাকে দিয়েছে অ্যামব্যাসির ডাক্তার। নিজের প্যাকেট থেকে সাতটা ওষুধ নিয়ে টয়লেট বোলে ফেলে দিয়ে ইসাবেলার পার্সে রেখে দিল বাকি ওষুধসহ প্যাকেটটা। আর অরিজিন্যাল ওষুধের প্যাকেট নিয়ে টয়লেটে ফ্লাশ করে দিল। মেয়েটা জানতেও পারবে না যে বার্থ কন্ট্রোল পিলের পরিবর্তে সাধারণ অ্যাসপিরিন ট্যাবলেট যাচ্ছে পেটে। সবশেষে হাত ধুয়ে সুবোধ বালকের মতো সিঁড়ি বেয়ে আঙ্গিনাতে অপেক্ষারত ইসাবেলার কাছে নেমে এলো রামোন।
***
গ্রানাডাতে ইসাবেলাকে করিডা ডি টোরোসে নিয়ে গেল রামোন আর তাদের ভাগ্য অত্যন্ত সুপ্রসন্ন যে এল কোরডোবেস্ এর কাজও দেখতে পেল।
সামান্য নভিলেরো, থাকা অবস্থাতেও সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এই ম্যাটাডোরের পৃষ্ঠপোষকতা করে গেছেন রামোনের বাবা। তাই তারা পৌঁছবার পরেই সকালবেলা হোটেলে রেখে যাওয়া হয়েছে দুটো টিকেট; নতুবা এতটা শর্ট নোটিশে টিকেট পাবার কথা নয়। রিং সাইডে প্রেসিডেন্টের বক্সের ঠিক ডানদিকে বসতে দেয়া ছাড়াও দর্শকদের সামনেই আমন্ত্রণ করা হয়েছে করিডা’র জন্য এল কোরডোবস এর ড্রেস দেখার জন্য।
হেমিংওয়ের ডেথ ইন দ্য আফটারনুন ইসাবেলাও পড়েছে। তাই সে বুঝতে পারল এহেন নিমন্ত্রণের মাহাত্ম। তারপরেও ম্যানুয়েল বেনিটেজ’র প্রতি রামোনের শ্রদ্ধা অথবা পোশাক পরিধানের এই প্রায়ই উপাসনার রীতির জন্য প্রস্তুত ছিল না মেয়েটা।
এনট্রি প্যারেডের ঢোলের আওয়াজ শুনে শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেছে উত্তেজনার ঢেউ। অত্যন্ত দর্শনীয় হল পুরো ব্যাপারটা : সোনা, রুপা আর মুক্তো দানা বসানো কস্টিউম পরানো ঘোড়াগুলো, অ্যামব্রয়ডারী করা খাটো জ্যাকেট আর স্কিন টাইট ট্রাউজার পরিহিত ম্যাটাডোর।
রিং এর মাঝে বের হয়ে এলো বঁড়। শিংঅলা মাথা উঁচু করতেই রাগে ফুলে উঠল কাঁধের বিশাল কুঁজ। পায়ের খুরের কাছ থেকে উড়তে লাগল সাদা ধুলা। ভিড়ের সাথে দাঁড়িয়ে ইসাবেলা নিজেও চিৎকার শুরু করে দিল।
এল কোরাডোবস এর প্রারম্ভিক আগমনের সাথে সাথে ইসাবেলার হাত ধরে ওর কাছে ঝুঁকে এলো রামোন। বর্ণনা করে বুঝিয়ে বলল বিভিন্ন অংশ। রামোনের চোখ দিয়ে প্রাচীন ঐতিহ্যের নিষ্ঠুরতা আর বিয়োগান্তক গল্পের স্বাদ পেল বেলা।
