কিংবদন্তীতুল্য অন্যান্য পুরুষ প্রেমিকদের মতো রামোন নিজেও স্বাদ পেয়েছে অসংযত যৌন-কামনার। শব্দটা এসেছে রোমান পৌরাণিক কাহিনীর সেসব অর্ধ-পুরুষ আর অর্ধ-পশু দেবতাদের কাছ থেকে যাদের যৌনাকাঙ্ক্ষা কখনো তৃপ্ত হত না। যে কোনো নারীর প্রতি আকর্ষণ বোধ করা রামোন মাচাঁদের অবস্থাও ঠিক তাই। পাটনারকে নিঃশেষ করে দিতে পারে যতক্ষণ পর্যন্ত না সঙ্গিনী নিজেই চিৎকার করে দয়াভিক্ষা চায়। কিন্তু অর্গাজম প্রাপ্তি বেশির ভাগ সময়েই দুরূহ হয়ে পড়ে।
যাই হোক, পাশের ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা এই নারী সেসব দুর্লভ প্রাণীদের একজন যারা তাকে এক্ষেত্রে হারিয়ে দিয়েছে। মেয়েটার সাথে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবারই সত্যিকারের রাগমোচনের স্বাদ নেয়া রামোন জানে ভবিষ্যতে আরও পাবে। তবে এটাও তার পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
গ্রীষ্মের গুমোট আবহাওয়াতেও উপকূল থেকে গাড়ি চালিয়ে এসে যারপরনাই খুশি আর উত্তেজিত ইসাবেলা অনুভব করল যে সে প্রেমে পড়েছে। মনে সন্দেহের লেশ মাত্র নেই যে আগে আর কখনো এমনভাবে কাউকে চায়নি। পাশে বসে থাকা ছেলেটা আর তার সবুজ দৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে সূর্যের তেজ হয়ে উঠেছে উজ্জ্বল, সিয়েরার উষ্ণ বাতাস মনে হচ্ছে অত্যন্ত কোমল।
চারপাশের সমতল ভূমি আর পর্বতগুলো মনে হচ্ছে কতদিনের চেনা। মনে পড়ে গেল বিশাল কারু’র খোলা দিগন্তের কথা। সেখানকার জমিনও একই রকম সিংহ রঙা আর পাথরগুলো গাঢ় বাদামি। উচ্ছল আনন্দে ভেসে যেতে যেতে মন চাইল চিৎকার করে বলে উঠে, “ওহ, রামোন, মাই ডালিং আই লাভ ইউ। আমার দেহ-মন শুধু তোমাকেই ভালবাসে।”
যদিও আপন মনে পণ করে রেখেছে যে রামোন’কেই প্রথম স্বীকার করতে হবে ভালোবাসার কথা। তাহলেই প্রমাণিত হবে তার সত্যিকার ভালোবাসার নিশ্চয়তা।
রামোন এ পার্বত্য অঞ্চল ভালোভাবেই চেনে। তাই গড়পরতা ট্যুারিস্ট রুটে না গিয়ে বিশালতা আর আপন সৌন্দর্য নিয়ে লুকিয়ে থাকা পেছনের রাস্তা দিয়ে নিয়ে এসেছে বেলা’কে। ছোট্ট গ্রামগুলোর একটায় থেমে নিয়ে এসেছে গোলাপি সেরানো হ্যাম কার্ডের টুকরা, চাষীদের বানানো শক্ত রুটি আর ছাগলের চামড়ায় করে মিষ্টি গাঢ় রঙের মালাগা ওয়াইন।
গ্রামের বাইরে প্রাচীন এক পাথরের সেতুর পাশে মার্সিডিজ পার্ক করে মিয়েরা নেভাডা’র পাদদেশ থেকে নদীটাকে অনুসরণ করে জলপাই বনের ভেতর দিয়ে পথ চলল দু’জনে। নদীর গোপন একটা অংশে এসে উলঙ্গ দেহে স্নান করার সময় উপরের চূড়া থেকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল দাঁড়িঅলা পাহাড়ি ছাগল। একই অবস্থায় পিকনিক লাঞ্চ খেয়ে নিল মসৃণ কালো পাথরের উপর বসে।
রামোন দেখিয়ে দিল কেমন করে হাতের উপর রেখে চামড়ার থলে থেকে ওয়াইন খেতে হবে। অথচ চেষ্টা করতে গিয়ে ইসাবেলার গাল আর চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল ফোঁটা ফোঁটা ওয়াইন। ওর আবদার শুনে জিভ দিয়ে চেটে নিল রামোন। আর এতটাই মজা হলো যে লাঞ্চ ভুলে উদ্দাম ভালোবাসায় মগ্ন হয়ে উঠল দু’জনে।
হাঁটু পর্যন্ত পানিতে দাঁড়িয়ে ইসাবেলাকে দেখছে রামোন। এখনো পাথরের উপর পড়ে আছে মেয়েটা। ফিসফিস করে বলে উঠল, “আমার পা দুটো মনে হচ্ছে জেলী অসাড় হয়ে গেছে। গাড়ি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে চলো।”
বিকেলের বেশির ভাগটাই পানির কাছে কেটে গেল।
সূর্য উঠে এলো পাহাড়গুলোর মাথায়। চোখে পড়ল দুর্গ।
ইসাবেলা যতটা ভেবেছিল ততটা বিশাল কিংবা জমকালো নয় দুৰ্গটা। গ্রামের মাথার উপর দাঁড়িয়ে থাকা গাঢ় রঙা সাদামাটা একটা দালান। কাছে যেতেই দেখা গেল সামনের দিকে অযত্ন অবহেলায় জন্মে গেছে ঝোঁপ-ঝাড়। সীমানা প্রাচীনের বেশ কিছু অংশই ভেঙে পড়েছে।
“এখন এ জায়গার মালিক কে?” জানতে চাইল ইসাবেলা?
“রাষ্ট্র।” কাধ বাঁকাল রামোন। কয়েক বছর আগে শোনা গিয়েছিল পর্যটকদের জন্য হোটেল বানানো হবে; কিন্তু আদতে কিছুই হয়নি।”
বৃদ্ধ কেয়ারটেকার মনে করতে পারল রামোনের পরিবারের কথা। গ্রাউন্ড ফ্লোরের রুমগুলোতে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল দু’জনকে। শূন্য রুমগুলোর ঝাড়বাতিতে জমে আছে ফুল আর ধুলা পারিবারিক ঋণ মেটানোর জন্য আসবাবপত্র বহু আগেই বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। ছাদ থেকে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির পানির দাগ লেগে আছে হলের দেয়ালে।
“অযত্ন-অবহেলায় একদা খুব প্রিয় ছিল এমন কিছুর এহেন দুদর্শা দেখাটা খুব কষ্টের।” ফিসফিস করে জানাল ইসাবেলা। “তোমার খারাপ লাগছে না?”
“চলে যেতে চাও?” পাল্টা প্রশ্ন করল রামোন।
“হ্যাঁ, আজকের দিনে মন খারাপ করতে চাই না।”
চুলের কাটার মতো সরু পথ ধরে গ্রামের দিকে যেতে যেতে দেখা গেল পাহাড়ের উপর সূর্য ডোবার অসাধারণ দৃশ্য।
গ্রামের সরাইখানার মালিক চিনতে পারল রামোনের পদবী। সামনের রুমের বিছানার লিনেন চাদর বদলে দিতে বলল দুই মেয়েকে আর স্ত্রীকে রান্না ঘরে পাঠিয়ে দিল আন্দালুসিয়ার বিশেষ খাবার কসিদো মাদ্রিলেনো বানাবার জন্য। নুডলস এর উপর বসানো মসলাদার ছোট্ট চোরিজো সসেজ আর চিকেন স্ট্র দিয়ে তৈরি খাবারটা যুৎসই নাম পেয়েছে।
বেলা’র গ্লাস পূর্ণ করে দিতে দিতে রামোন জানালো, “স্পেনের লোকদের পানীয় হলো শেরী।” পাহাড়ি এলাকায় ঠাণ্ডা এত জেঁকে বসেছে যে পাথরের ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বালাতে হলো। শিখার আভায় ছেলেটাকে মনে হল অসম্ভব রূপবান।
