এতক্ষণ উত্তেজনা আর টেনশনে দর্শকেরাও কাহিল হয়ে পড়েছিল। রামোন আর ইসাবেলা এবারে স্টেডিয়ামের মাঝখানে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরতে দেখে সবাই হাততালি দিল হাসতে হাসতে। সুদর্শন এই জুটির দু’জনেই অত্যন্ত লম্বা, অ্যাথলেটিক, স্বাস্থ্য আর তারুণ্যে ভরপুর। অন্যদিকে ভালোবাসার এই স্বচ্ছন্দ্য বহিঃপ্রকাশ ছুঁয়ে গেল দর্শকদের হৃদয়।
***
এয়ারপোর্টে ইসাবেলার ভাড়া করা মার্সিডিজে চড়ে শহরে এলো দু’জনে। মেইন স্কোয়ারের বাঙ্কো ডি এসপানাতে একটা একাউন্ট ওপেন করে বিজয়ীর চেক জমা দিল রামোন।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো অর্থের ব্যাপারে দুজনেরই মনোভাব এক। কোনো কিছুর দাম নিয়ে কখনোই মাথা ঘামায় না ইসাবেলা। রামোন খেয়াল করে দেখেছে, কোনো পোশাক কিংবা গয়না পছন্দ হলে দাম জিঙ্গেস না করেই নিজের ব্যাড় খুলে প্ল্যাস্টিক ক্রেডিট কার্ডের বিশাল কালেকশন থেকে একটা তুলে রেখে দেয় কাউন্টারে। স্লিপে সাইন করে একইভাবে না দেখেই কপি রেখে দেয় ব্যাগের ভেতর। হোটেল রুমে ব্যাগ উপুড় করে সব স্লিপ দিয়ে বল বানিয়ে অতঃপর ছুঁড়ে ফেলে দেয় ট্র্যাশবিনে।
এছাড়াও মেয়েটার সাথে থাকে এক তোড়া ব্যাংক নোট। যদিও স্টালিং আর স্প্যানিশ পেসেতাসের বিনিময় মূল্য নিয়ে ভাবিত নয় ইসাবেলা। প্রায়ই দেখা যায় এক কাপ কফি কিংবা এক গ্লাস ওয়াইনের বিল মেটাতে গিয়ে সাইজ আর রং দেখে যে কোনো একটা ব্যাংক নোট সিলেক্ট করে রেখে দেয় টেবিলে আর পেছনে নির্বাক বিস্ময় নিয়ে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ওয়েটার।
একই কথা খাটে রামোনের বেলাতেও। প্রথমতো পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ার ভিত্তি আর নিদর্শন হিসেবে একে অবজ্ঞা করে ছেলেটা। অন্যদিকে দায়িত্ব পালন করার জন্য ক্যাশ চাইতে গিয়ে মস্কোর সাথে যে পরিমাণ দেনদরবার করতে হয় তাতেও অরুচি ধরে গেছে। ক্যারিয়ারের শুরুতেই বুঝে গেছে উপর অলারা তাকে কতটা অর্থ অনুমোদন দেবে, তাই অনেক অপারেশনের খরচ সে নিজেই বহন করে।
মেক্সিকোতে এভাবেই জীবন্ত কবুতর গুলি করে মারত। ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন দক্ষিণ আমেরিকা থেকে মাদক এনে ক্যাম্পাসে বিক্রি করত। ফ্রান্সে থাকার সময় আলজেরীয়দের হয়ে অস্ত্র চালাত। ইটালীতে চোরাকারবারী ছাড়াও যুক্ত ছিল চারটা অপহরণ কার্য পরিচালনার সাথে।
আর এসব অপারেশনের অর্থই পৌঁছে গেছে হাভানা আর মস্কোতে। এর ফলেই দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে এ বয়সেই নির্বাচিত হয়েছে জেনারেল সিসেরোর স্থলাভিষিক্ত হবার জন্য।
এবারেও প্রথম থেকেই লাল গোলাপের মতো অভিযানে সিসেরো যতটা অর্থ বরাদ্দ করেছেন তা অপর্যাপ্ত মনে হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে যতটা সম্ভব পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা ছাড়াও অপারেশনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করার জন্য স্পেনকে বেছে নিতে হয়েছে।
রোমোনের বিজয়কে উদযাপনের জন্য ছোট্ট একটা সী-ফুড রেস্টোরেন্টে এসে বসল দুজনে, ডিনার গেস্টদের মাঝে ইসাবেলাই একমাত্র বিদেশি।
ক্ল্যাসিক্যাল ট্রাডিশন অনুযায়ী তৈরি অসম্ভব সুস্বাদু খাবারের সাথে পরিবেশন করা হলো কোনো এক সময় রামোন’দের পরিবারিক সম্পত্তি ছিল এমন এক এস্টেট থেকে আসা ওয়াইন; স্পেনের বাইরের আর কোথাও বিক্রি হয় না এ উপাধেয় পানীয়।
ওয়াইনের স্বাদ নিয়ে মুগ্ধ ইসাবেলা জানতে চাইল, “তোমাদের পারিবারিক এস্টেটগুলো কী হয়েছে?”
“ফ্রাঙ্কো ক্ষমতায় আসার পর সব হারিয়ে ফেলেছে বাবা।” গলার স্বর যথাসম্ভব নিচু রেখে রামোন জানাল, “প্রথম থেকেই তিনি অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ছিলেন।”
বুঝতে পেরে সম্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়ল ইসাবেলা। তার বাবাও আজীবন ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে লড়ে এসেছেন।
“তোমার বাবা আর পরিবার নিয়ে আমাকে কিছু জানাবে না?” রামোনকে নিমন্ত্রণ করল বেলা। উপলব্ধি করল প্রায় সপ্তাহখানেক একসাথে থাকলেও ডিনার টেবিলে স্প্যানিশ চার্জের দেয়া তথ্য ছাড়া ছেলেটা সম্পর্কে আর কিছুই জানে না সে।
হা হয়ে তাই শুনল রামোনের স্মৃতিচারণ। ১৪৯২ সালে কলম্বাসের সাথে আমেরিকা আর ক্যারিবীয়তে আসার পর পদবী লাভ করেছিল ওর পূর্বপুরুষ। এহেন পূর্ব ইতিহাস জানতে পেরে মুগ্ধ হয়ে গেল ইসাবেলা।
নিজের কথা জানাতে গিয়ে বলল, “প্রপিতামহ শন কোর্টনির বংশধর আমরা। উনিশ শতকের কোন এক সময় তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আর এসময় খেয়াল হল, যদি রামোন সন্তানের জনক হয় তাহলে কোন একদিন তার নিজের ছেলেও গর্ব ভরে উচ্চারণ করবে এই ইতিহাস। এর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত শুধু রামোনের সাথে থাকতে পারাটাই আনন্দের ছিল; কিন্তু এখন মোমবাতির আলোয় সবুজ চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে দিগন্তে ডানা মেলল স্বপ্নেরা।
“আর এতসব সত্ত্বেও, বেলা, বুঝতেই পারছ আমার কোনো টাকা-পয়সা নেই।”
“হ্যাঁ, সেটাই। আজ বিকেলেই তো দেখলাম ব্যাংকে দুই কোটি ডলার জমা দিয়েছ।” হালকাভাবে বলে উঠল, “অন্তত আরেক বোতল ওয়াইন তো কিনে দিতে পারবে।”
“যদি তোমাকে কাল সকালেই লন্ডন ফিরতে না হত, তাহলে এই অর্থের কিছুটা খরচ করে তোমাকে গ্রানাডা নিয়ে যেতাম। ষাড়ের লড়াইয়ে সঙ্গ দেয়াসহ দেখাতাম সিয়েরা নেভাডাতে আমাদের পারিবারিক
“কিন্তু তোমাকেও তো লন্ডন ফিরতে হবে, তাই না?”
“হুম কয়েকটা দিন ম্যানেজ করে নিতে পারব।”
