নিচু সাদা কাঠের দেয়ালের মাত্র ফুটখানেক ভেতরে আছড়ে পড়ল। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল দর্শকেরা। এরপরই অবিশ্বাস্যভাবে একটা পাখা বিহীন পাখিটা উন্মাদের মতো নাড়তে লাগল বাকি পাখনা। উত্তেজনায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে এক সাথে দাঁড়িয়ে গেল সব দর্শক। অন্যদিকে একেবারে মাঝখানে কাঁধে শটগান নিয়ে বরফের মতো জমে গেল আমেরিকান ছেলেটা। মাত্র দুই কার্টিজ দেয়া হয়েছে ওকে। তাই তৃতীয় কার্টিজ লোড় করে পাখিটাকে মেরে ফেললে তৎক্ষণাৎ তাকে বাতিল ঘোষণা করে কেড়ে নেয়া হবে পুরস্কারের অর্থ।
ব্যারিকেডের কাছে গিয়ে দুর্বলভাবে লাফ দিল কবুতরটা। উপর থেকে ইঞ্চি খানেকের জন্য বুক বেঁচে গেল কাঠের দেয়ালে বাড়ি খাবার হাত থেকে। আর তারপরই পড়ে গেল। সাদা রঙের উপর উজ্জ্বল লাল রঙের ছিটে লাগল।
দর্শকদের অর্ধেক চিৎকার করে উঠল, “মরে গেছে!” অন্যদিকে আমেরিকান ছেলেটা’র বিরুদ্ধ সমর্থকেরা চিৎকার করে উঠল, “চলে যারে পাখি, যা!”
নিজের সর্বশক্তি এক করে আরো একবার লাফ দিল কবুতরটা। এবারে উপরে পৌঁছে অনিশ্চিতভাবে আগু-পিছ টলতে রইল আহত প্রাণীটা।
অন্যদের সাথে ইসাবেলা নিজেও বন্য উন্মাদে চিৎকার করছে, “লাফ দে।” অনুনয়ের সুরে বলে উঠল, “নাহ্-ওহ, মরিস না রে সোনা! উড়ে যা, প্লিজ।”
হঠাৎ করেই ঝাঁকি দিয়ে উঠে শক্ত হয়ে গেল পাখিটার দেহ। ঘাড় পেছনের দিকে বেঁকে পড়ে গেল দেয়াল থেকে, সবুজ লনের উপর পড়ে রইল নিথর হয়ে।
“থ্যাঙ্ক ইউ!” হাপ ছেড়ে নিজের আসনে এসে বসল ইসাবেলা।
সামনের দিকে পড়ে যাওয়ায় সার্কেলের বাইরে মারা গেছে কবুতরটা। মাথার উপরে থাকা লাউড স্পিকার গম গম করে শুনিয়ে দিল ফলাফল। স্প্যানিশ ভাষায় হলেও গত দুই দিনে তা ভালোভাবেই শিখে গেছে ইসাবেলা।
“ওয়ান কি। ওয়ান মিস্।”
“আমি আসলে এত কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।” নাটকীয় ভঙ্গিতে পেট চেপে ধরতেই শীতল সবুজ চোখ জোড়া তুলে ওর দিকে তাকিয়ে হাসল রামোন।
“নিজের দিকে তাকাও। একেবারে একটা বরফের মত। তুমি কি কোনো কিছুই অনুভব করো না?”
“তোমার বিছানার বাইরে কিছুই না আসলে।” বিড় বিড় করে জানাতেই লাউড স্পিকারে শোনা গেল, “নেক্সট গান আপ নাম্বার ওয়ান হান্ড্রেড অ্যান্ড টেন!”
যুৎসই কোন জবাব দেয়ার ফুরসৎ পেল না ইসাবেলা।
উঠে দাঁড়াল রামোন। একই রকম শীতলভাবে কানের উপর ঠিকঠাক করে বসিয়ে নিল প্রটেক্টর। ইসাবেলা’কে শিখিয়েছে যেন তাকে কখনো সৌভাগ্যের জন্য উইশ না করে। তাই মেয়েটাও কিছু বলল না। গেইটের কাছে লম্বা র্যাকে রাখা একমাত্র অস্ত্রটা নামিয়ে হাতে নিয়ে উজ্জ্বল আইবেরীয় সূর্যালোকে বেরিয়ে এলো রামোন।
মুগ্ধ হয়ে রোমান্টিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইসাবেলা। নিজ জায়গামতো এসে পেরাডিজ ১২ গজ লোড় করে ব্রিচ বন্ধ করে দিল রামোন। আর তারপরই কেবল কাঁধের উপর দিয়ে তাকাল ইসাবেলার দিকে। গত দুদিন ধরেই গুলি ছোঁড়ার সময়ে এ কাজটা করে আসছে। বেলাও জানতো তাই দুই হাত বাড়িয়ে রামোন’কে দেখাল মুষ্টিবদ্ধ হাত।
ঘুরে দাঁড়িয়েই মূর্তির মতো স্থির হয়ে গেল রামোন। আরো একবার আফ্রিকান বিড়ালের কথা মনে পড়ে গেল বেলার। আমেরিকান ছেলেটার মতো হামাগুড়ি নয়, সটান দাঁড়িয়ে থেকে মোলায়েম স্বরে উচ্চারণ করল, “পুল!” মুক্তি পেয়েই বন্যভাবে পাখা ঝাঁপটাতে শুরু করে দিল দুটো পাখি। মনে হল কোনো তাড়াহুড়া নেই এমন অভিজাত ভঙ্গিতে অস্ত্র তুলে নিল রামোন।
মেক্সিকোতে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সাথে থাকাকালীন লিবারেশন আমির ফান্ডের অনেকটুকুই খরচ হত গুয়াভালাজারা’তে শটগান দিয়ে জীবন্ত কবুতর মারা’য় রামোনের প্র্যাকটিসের পেছনে। তাই পেশাদারদের মতো তারও আছে এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় বিস্ময়কর দৃষ্টি শক্তি আর প্রতিক্রিয়া করার ক্ষমতা।
প্রথম পাখিটা দ্রুত উজ্জ্বল সবুজ পাখা ছড়িয়ে উড়ে চলল দেয়ালের দিকে। নিচের ব্যারেল থেকে ছয় নম্বর শটে চমৎকারভাবে গুলি করল পাখিটাকে। ফেটে যাওয়া বালিশের মতো পালক ছড়িয়ে বিস্ফোরিত হল অবোধ প্রাণীটা।
এবারে, নর্তকীর মতো ঘুরতে থাকা দ্বিতীয় পাখির দিকে নজর দিল রামোনএই কবুতরটা বেশ অভিজ্ঞ। এর আগেও কয়েকবার গুলি ছোড়া হয়েছে ওর দিকে। তাই ঝুঁড়ির কাছাকাছিই নিচেই রইল। দেয়ালের দিকে না গিয়ে সোজা নেমে আসতে লাগল রামোনের মাথা লক্ষ্য করে। রেঞ্জ দশ ফুট কমে যাওয়ায় গুলি লাগানো বেশির ভাগ সময়েই কষ্ট হয়ে পড়ে। চোখের সামনে ঝলকানি দেখে সেকেন্ডের শত ভাগের এক ভাগ মাত্র সময় পেল প্রতিক্রিয়া করার। রামোনের মনে হলো একটাই মাত্র গুলি ছোঁড়ার সুযোগে যদি ভুল হয়ে যায়, অথবা অ্যাংগেলে গণ্ডগোল হয় তাহলেই সর্বনাশ ঘটে যাবে।
পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে চৌকোণাভাবে কবুতরটার মাথায় সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করল রামোন। রক্তমাখা পাখা নিয়ে নিথর দেহ ছিটকে পড়ল দূরে। অক্ষত রইল কেবল দুটো পালক। গোত্তা খেয়ে এসে পড়ল রামোনের পায়ের কাছে।
পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে দৌড়ে এলো ইসাবেলা। এক ঝটকা মেরে ভেঙে ফেলল ব্যারিয়ার। দুর্বোধ্য স্প্যানিশে রেঞ্জ মাস্টার কিছু বললেও কে শোনে কার কথা। লম্বা, ডেনিমে মোড়া পা দুটো দৌড়ে এলো রামোনের কাছে।
