এক আমেরিকান আর রামোন মাচাদো হচ্ছে টিকে যাওয়া দুই প্রতিযোগী। গত তেইশ রাউন্ড ধরে দু’জনে সমান সংখ্যক গুলি ছুঁড়েছে। তাই বিজয়ী নির্বাচনের জন্য স্প্যানিশ বিচারক আদেশ দিয়েছেন এখন থেকে জোড়া পাখি মারতে হবে।
আমেরিকানটি ফুল-টাইম প্রফেশন্যাল। স্পেন, পর্তুগাল, মেক্সিকো, দক্ষিণ আমেরিকা আর গত বছর পর্যন্ত মোনাকো সহ ভ্রমণ করত এ ছেলে। কিন্তু ছোট্ট দেশটাতে এই খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে যখন গুরুতর আহত একটা কবুতর স্টেডিয়াম পার হয়ে রাজপ্রাসাদের দেয়ালে গিয়ে বাড়ি খেয়ে অবশেষে আছড়ে পড়েছে রাজকুমারী গ্রেস’র চায়ের টেবিলে। লেসের টেবিল ক্লথ আর লেডিসদের টি গাউনে ছিটিয়ে পড়েছে রক্ত। ক্ষুদ্র রাজ্যের পুরো অধের্ক জুড়ে শোনা গেছে চিৎকার। আর তারপর থেকেই মোনাকোতে জীবন্ত কবুতর খেলা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।
আমেরিকানটার বয়স ইসাবেলারই মত। এখনো পঁচিশও হয়নি। কিন্তু এরই মাঝে বছরের কোটি ডলার আয়ের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। গুলি ছুড়ছে “সাইড বাই সাইড” বারো গজ দিয়ে; যেটি প্রায় শতবর্ষ আগে তৈরি করে গেছেন কিংবদন্তী অস্ত্রনির্মাতা জেমস মার্টিন, তবে আধুনিক আমলের লম্বা কার্টিজ আর ধোঁয়াবিহীন পাউডার ব্যবহার করার মতো সংশোধন আনা হয়েছে এর নকশায়।
নিজের শ্যুটিঙের জায়গায় দাঁড়িয়ে গেল তরুণ আমেরিকান। বন্দুকের হ্যাঁমার টেনে, ডান হাতের তালুতে হাতল ধরে জোড়া মাজল তাক করল যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে থেকে ত্রিশ গজ সামনে অর্ধ বৃত্তাকারে ঝোলানো পাঁচটা ঝুঁড়ির ঠিক মাঝখানে।
প্রতিটি ঝুড়িতে আছে একটা করে কবুতর। বেশির ভাগ বড় শহরের মাঝে ঝাঁক বেঁধে বাস করে এ জাতীয় বন্য পাখির দল।
পাখিদের মজুদ নিশ্চিত করার জন্য শু্যটিং ক্লাব ফিডিং শেড তৈরি করেছে। ট্রে অলা কাঠামোতে প্রতিদিন রাখা হয় গমের গুঁড়ো। রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে ফিডিং বার্ড এলেই আটকে দেয়া হয় ফাঁদের দরজা। প্রায়ই দেখা যায় যে কিলিং গ্রাউন্ড থেকে বেঁচে যাওয়া কবুতরগুলো উড়ে আবার ফিরে আসে এই ফিডিং শেডে। আগেও বহুবার মারা গেছে অসংখ্য পাখি। এই ছোট্ট প্রাণীগুলোও তাই বের করে ফেলেছে কিভাবে এড়িয়ে যেতে হয় গুলি, সেই কৌশল। এর উপর আবার পাখিগুলোকে যারা কুঁড়িতে রাখার দায়িত্ব পায়, তারা জানে কিভাবে পাখনা কিংবা লেজ থেকে একটা কি দুটো পালক খুলে নিলেই এলোমেলোভাবে অনিশ্চিৎ দিকে উড়ে যাবে প্রাণীগুলো।
শ্যুটার “পুল” বলার সাথে সাথে এক থেকে পাঁচ সেকেন্ডের মাঝে খুলে যায় কুঁড়ি। আর এই পাঁচ সেকেন্ড, দুরু দুরু বুকে ঘামতে থাকা, হাজার হাজার ডলারের টেনশন করা কারো জন্য ঠিক যেন অনন্তকালেরই সমান।
ঝুড়িগুলোর দূরত্ব ত্রিশ গজ আর ১২ গজ শটগানের রেঞ্জ সাধারণত চল্লিশ গজ ধরা হয়। আর ঘুরে আসার সার্কেলটাকে রাখা হয়েছে খুঁড়ির লাইনের দশ গজ পিছনে।
এটা মাত্র আট ইঞ্চি উঁচু একটা কাঠের দেয়াল। সাদা রং নির্দেশ করছে কিলিং গ্রাউন্ডের সীমানা। জিতলে হলে পাখির মরা দেহ কিংবা খণ্ডিত দেহের সবচেয়ে বড়অংশ কাঠের দেয়ালের ভেতর পড়তে হবে। তাই সীমানা পার হবার আগেই ছাড়া পাবার দশ গজের ভেতর পাখিটাকে মেরে ফেলতে হবে।
সামনে পয়তাল্লিশ ডিগ্রি অর্ধবৃত্তাকারে দুলছে ঝুঁড়িগুলো। জানার কোনো উপায় নেই যে “পুল” বলার সাথে সাথে কোন ঝুঁড়িটা খুলে যাবে কিংবা পাখিটা কোন দিকে উড়ে যাবে। ডানে-বামে; দূরে যেদিকে ইচ্ছে যেতে পারে আর সবচেয়ে বাজে হলো কখনো কখনো সোজা শু্যটার এর দিকেই উড়ে আসে।
দ্রুত আর শব্দ করে উড়ে বেড়ানো কবুতরের ক্ষেত্রে এখন আবার নিয়ম করা হলো একসাথে দুটো করে পাখি ছাড়া হবে।
খানিকটা হামাগুড়ির ভঙ্গিতে নিজের জায়গা আঁকড়ে ধরল আমেরিকান ছেলেটা। বক্সারদের মতো করে বাম পাটা খানিক এগিয়ে রয়েছে। হালকাভাবে রামোনের হাতে চাপ দিল ইসাবেলা। দু’জনে বসে আছে প্রতিযোগী আর ক্লাব অফিসারদের জন্য সংরক্ষিত। সামনের দিকে নিচের সারির চামড়ায় সোজা চেয়ারে।
“পুল!” আমেরিকানটা চিৎকার করে উঠতেই মনে হল ওর টেক্সান গলার স্বর এমনভাবে নীরবতা ভেঙে ফেলেছে যেন কামারের নেহাই এর উপর হাতুড়ির বাড়ি পড়েছে।
“যাতে না লাগে!” ফিসফিস করে উঠল ইসাবেলা। “ফ্রিজ মিস্ হোক গুলি!”
প্রথম দুই সেকেন্ডে কিছুই ঘটল না। এরপরই শব্দ করে খুলে গেল দুটো ঝুডির ঢাকনা। আমেরিকানটা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে খানিকটা বামে আর পুরোপুরি ডানে’র দুই আর পাঁচ নম্বর ঝুড়ি। ঝুড়ির তলা’র আটকে থাকা বাতাসে আঘাত পেয়ে আস্তে আস্তে উড়ে গেল পাখিগুলো।
দুই নম্বর পাখিটা নিচু দিয়ে দ্রুত উড়ে গেল। খুব বেশি কষ্ট ছাড়াই কাঁধে শটগান তুলে গুলি ছুড়ল আমেরিকান ছেলেটা। ঝুড়ি থেকে বের হয়ে পাঁচ গজ যেতে না যেতেই ভবলীলা সাঙ্গ হল পাখিটার।
দ্বিতীয়টির দিকে নজর দিল ছেলেটা। বার্নিশ করা তামার মতো চকচকে শরীর নিয়ে ডানদিকে উড়তে থাকা পাখিটা গুলির শব্দে অনিশ্চিত ভঙ্গিতে ঘুরছে। ফলে নিশানা ঠিক করতে পারল না ছেলেটা। হার্ট, আর ব্রেইন ফুটো না করে পাখিটার ডান পাখা ভেঙে দিল গুলি। বাতাসে পালক ছড়িয়ে টলমল করে নামতে লাগল আহত পাখি।
