আর তারপর হঠাৎ বিস্ময়ে ফিরে পেল চেতনা : আমি প্রেমে পড়ে গেছি। পুরোপুরি জেগে উঠতেই বাঁধ ভাঙ্গা আনন্দে মনে হলো পাগল হয়ে যাবে।
তাড়াতাড়ি উঠে বসতেই পায়ের কাছে পড়ে গেল চাদর। “রামোন” মাথার পাশের বালিশের উপর চোখ চলে যেতেই শিহরিত হয়ে উঠল শরীর। সাদা চাদরের উপর কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়ে আছে গাঢ় রঙা চুল। হাত বাড়াতেই বুঝতে পারল ঠাণ্ডা হয়ে আছে বিছানার প্রান্ত। বহু আগেই উঠে গেছে ছেলেটা। আনন্দটুকু উবে গিয়ে হতাশায় ছেয়ে গেল মন।
“রামোন” বিছানা থেকে নেমে নিরাভরণ দেহেই বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল বেলা। খালি বাথরুমের দরজাটা কিঞ্চিৎ খোলা। আরো একবার উধাও হয়ে গেল ছেলেটা। মেঝের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হতাশা নিয়ে চারপাশে তাকাল মেয়েটা।
এরপরই চোখ পড়ল বেডসাইড টেবিলে। পারিবারিক পদবী খোদাই করা দামি ক্রীম রঙা কাগজের পাতা পড়ে আছে। মিনি কুপারের চাবি আর বেলা’র আংটি দিয়ে চাপা দেয়া হয়েছে কাগজটা। আগ্রহ নিয়ে ছোঁ মেরে কাগজটা তুলল হাতে। কোনো সম্বোধন ছাড়াই লেখা আছে,
অসাধারণ এক নারী হওয়া সত্ত্বেও ঘুমন্ত অবস্থায় তোমাকে দেখায় শিশুর মত, সুন্দর সুবোধ একটা শিশু। তাই তোমাকে জাগালাম না। ছেড়ে যেতেও মন চায়নি, কিন্তু যেতে হবে।
সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতে যদি আমার সাথে মালাগা যেতে পারো, তাহলে আগামীকাল সকাল নয়টায় এখানে চলে এসো। পাসপোর্ট নিয়ে এসো, কিন্তু পায়জামা না হলেও চলবে।
রামোন আবারো মন ভরে উঠল চাপা আনন্দে। আরেকবার পড়ে দেখল, লেখাটা। মসৃণ আর মার্বেলের মতো ঠাণ্ডা কাগজটা ছুঁয়ে আঙ্গুলের ডগাও যেন উত্তেজিত হয়ে পড়ল। স্বপ্নাতুর চোখে ভেসে উঠল গত রাতের প্রতিচ্ছবি।
রামোনের সাথে শারীরিক মিলনের পর মনে হচ্ছে ওর শরীরের সাথে পুরো চেতনাও গ্রাস করে নিয়েছে ছেলেটা।
স্বর্গীয় কোনো স্পৃহাতে একে অন্যের মাঝে বিলীন হয়ে গেছে দু’জনে। এক হয়ে উঠেছে দেহ আর মন।
গত রাতে বহুবার মনে হয়েছে এই বুঝি চূড়ায় পৌঁছে গেছে দু’জনে। কিন্তু না, তারপরেই আবিষ্কার করেছে তখনো সামনে থাকা বৃহৎ পর্বতের পাদদেশেই কেবল ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারপর আরেকটা, আরো একটা। প্রতিটাই আগেরটার চেয়ে আরো আরো উঁচু আর বিশাল। এর যেন কোনো শেষ নেই। অবশেষে গভীর ঘুমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ায় যেন সমাপ্ত হয়েছে সবকিছু। আর পুনরুষ্ণানের পর জেগে উঠেছে নব আনন্দ আর অস্তিত্ব নিয়ে।
“আমি প্রেমে পড়ে গেছি।” প্রায় প্রার্থনার মতো করে বিড়বিড় করে উঠল বেলা। চোখ নামিয়ে তাকাল নিজ শরীরের দিকে। সবিস্ময়ে ভাবল কেমন করে পলকা দেহ ভরে আছে এতটা আনন্দ আর অনুভূতিতে।
এরপরই চোখ পড়ল বেড সাইড টেবিলে গাড়ির চাবির সাথে পড়ে থাকা হাতঘড়ির উপর।
“ওহ ঈশ্বর! সাড়ে দশটা বাজে।” ড্যাডি’র লাঞ্চ! দৌড় দিয়ে বাথরুমে গেল। ওয়াশ-বেসিনের উপর মোড়ক লাগানো নতুন ব্রাশ রেখে গেছে রামোন। দেখে যারপরণাই কৃতজ্ঞ হলো বেলা।
মুখ ভর্তি টুথপেস্টের ফেনা দিয়ে গুণগুণ করে উঠল “ফার অ্যাওয়ে প্লেসেস।”
তাড়াতাড়ি গোসল করে নেবে কিনা ভাবতে ভাবতেই উষ্ণ পানিতে গা ডুবিয়ে মনে করল রামোনের কথা। শূন্যতায় ছেয়ে আছে শরীর, রামোন ছাড়া যা আর কেউ পূরণ করতে পারবে না।
তোয়ালে হাতে নিতেই দেখা গেল এখনো ভেজা। নিশ্চয়ই রামোন স্নান করে গেছে। নাক-মুখের উপর চেপে ধরে ঘ্রাণ নিল উদভ্রান্তের মত। উত্তেজিত হয়ে পড়তেই নিজেকে শুধালো, “থামো এবার!” ধোয়া ঢাকা আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে সাবধান করল। এক ঘণ্টার মধ্যে তোমাকে ট্রাফালগার স্কোয়ারে পৌঁছাতে হবে।”
ফ্ল্যাট থেকে বের হতে যাবে এমন সময় আবারো কী মনে হতেই দৌড়ে গেল বাথরুমে। সিকুইনের হ্যান্ডব্যাগ হাতড়ে বের করে আনল ওভানন পিল।
জিভের উপর ছোট্ট সাদা ক্যাপসুলটা রেখে কল থেকে আধা মগ পানি নিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে স্যালুট করল নিজেকে।
‘জীবন, ভালোবাসা আর স্বাধীনতার জন্য। আর মেনি হ্যাপি রিটার্নস।” গিলে ফেলল ওষুধটা।
***
রক্ত নিয়ে খেলা করতে কখনোই আপত্তি জানায় না ইসাবেলা কোর্টনি। ওর বাবা সবসময় শিকারিই ছিল। উত্তমাশা অন্তরীপের ওয়েল্টেভ্রেদেনে তাদের বাড়ি ভর্তি হয়ে আছে সেসব ট্রফিতে। পারিবারিক সম্পত্তি মাঝে, জাম্বেজি উপত্যকার শিকার অভিযানের আয়োজন করে এমন একটি সাফারী কোম্পানিও আছে। লাইসেন্সধারি শিকারি আর কোর্টনি এন্টারপ্রাইজের নকশাকার বড় ভাই শন কোর্টনির সাথে মাত্র গত বছরেই শান্ত সমাহিত জঙ্গলের মাঝে রাত কাটিয়েছে বেলা। হ্যারিয়েট বু-চ্যাম্পের নিমন্ত্রণে বেশ কয়েকবার হাউন্ড নিয়েও শিকার করেছে। এক্ষেত্রে ইসাবেলার সঙ্গী সতের বছরের জন্মদিনে বাবার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া স্বর্ণের খোদাই করা ছোট্ট সুন্দর হল্যান্ড এন্ড হল্যান্ড ২০ গজ শটগান।
আজ দ্বিতীয় দিন। প্রায় তিনশ প্রতিযোগীর সকলে ঝরে পড়ে এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র দু’জনে। তাই অবস্থা হচ্ছে, “একটা মিস করলেই আউট।” কিংবা “যে জিতবে সে সব পেয়ে যাবে” টাইপ প্রতিযোগিতা। প্রবেশ মূল্য ছিল প্রতিজন এক হাজার ইউ এস ডলার; ফলে প্রায় মিলিয়নের চার ভাগের এক ভাগ অর্থ। চারপাশ টেনশনের উত্তাপে এতটা জমে উঠেছে যে ঠিক যেন আমেরিকানদের প্লেটে বিভিন্ন সবজি আর মাংস দিয়ে তৈরি স্যুপ।
