এক হাঁটু গেড়ে উঠে দাঁড়াল পোর্কি। কিউবান সেন্ট্রি সমান্তরালে আসতেই ডাবল সার্জিকাল রাবারের দড়ি লাগানো গুলতি ছিটকে উঠল। একটুও শব্দ না করে সাদা বালির উপর ঢলে পড়ল সেন্ট্রি। “গো!” নরম স্বরে আদেশ দিল শ আর তার কান্টার মেশিন নিয়ে ছুটে গেল দ্বিতীয় স্কাউট। টুংটাং গানের মতো শব্দ করে কেটে গেল কাটা তারের বেড়া! খোলা মুখ দিয়ে দৌড় দিল শন্।
পেছনে আসা প্রতিজন স্কাউটের কাঁধে চাপড় মেরে যার যার টার্গেট দেখিয়ে দিল সকলকে। দু’জন গেল মেইন গেইটের সেন্ট্রিদের খবর নিতে। দু’জন গেল কমুনিকেশন সেন্টার বন্ধ করতে; বাকিদের কাজ হলো কম্পাউন্ডের পেছন দিকের ব্যারাক আর গ্যারিসন গার্ডদের মুন্ডপাত করা।
প্রথমবারের সমস্ত কিছু যদি ঠিকঠাক থাকে তাহলে রেডিও রুমের ডানদিকে প্রথম ঘরটাতেই বেলা’র রুম। দ্বিতীয়টাতে কিউবান নার্স আদ্রার সাথে থাকে নিকি। শ’নের ধারণা অনুযায়ী নার্সটা হলো আসল শয়তান। তাই প্রথম সুযোগেই ওর গলা কাটতে চায় শন।
কুঁড়ে ঘরের সারির দিকে দৌড় দিল শন। কিন্তু পৌঁছাবার আগেই কমুনিকেশনস রুমে চিৎকার শুরু করল এক নারী কণ্ঠ। হিস্টিরিয়া রোগীর মতো চিৎকার করছে কেউ; শুনে মনে হলো সহ্য করতে পারবে না। শন্। সাথে সাথে অটোমেটিক ফায়ারের শব্দে চাপা পড়ে গেল চিৎকার।
হেয়ার উই গো! শুরু হল জীবন মরণ বাজি রাখার যুদ্ধ। রাতের আকাশ চিরে দিল আগ্নেয়াস্ত্রের শিখা।
***
ইসাবেলার ঘুম হলো চমৎকার। কিন্তু মাঝরাতের খানিক আগে বজ্রপাত আর মাথার উপরে জেট ইঞ্জিনের আওয়াজে ভেঙে গেল ঘুম। মশারি থেকে বের হয়ে দুদ্দাড় করে ছুটে এলো বাইরে।
দক্ষিণ দিক থেকে বইছে শক্তিশালী ঝড়ো হাওয়া। বাতাস আর মেঘের মাঝে হারিয়ে গেল জেট ইঞ্জিনের শব্দ। বেলা’র কাছে মনে হলো আকাশে একটা নয় বরঞ্চ তার চেয়েও বেশি এয়ারক্রাফট উড়ে বেড়াচ্ছে। আশা করল। অন্তত একটাতে থাকবে বাবা আর গ্যারি।
“তোমরা কী সিগন্যাল পেয়েছ?” নিকষ কালো আকাশের দিকে মুখ তুলে সবিস্ময়ে ভাবলো বেলা; “আমার কথা শুনতে পাচ্ছ ড্যাডি? জানো আমি এখানে?”
কিন্তু কিছুই দেখা যাচ্ছে না; ছোট্ট একটা তারাও না। আস্তে আস্তে মিইয়ে গেল মাথার উপরে ইঞ্জিনের আওয়াজ। চারপাশে কেবল শো শো শব্দে বইছে ঝড়ো বাতাস।
আবারো শুরু হল বৃষ্টি। দৌড়ে নিজের ঘরে চলে এলো বেলা। মাথা আর পা মুছে জানালাতে গিয়ে তাকিয়ে রইল সৈকতের দিকে।
“প্লিজ গড। ওদেরকে জানিয়ে দাও যে আমরা এখানে। শকে সাহায্য করো যেন আমাদেরকে খুঁজে পায়।” সকালবেলা নাশতার সময় নিকোলাস জানাল : “আমি তো আমার নতুন সকার বলটা খেলার সুযোগই পেলাম না।”
“কিন্তু আমরা তো প্রতিদিনই এটা দিয়ে খেলছি নিকি।”
“হ্যাঁ, কিন্তু…মানে ভালো খেলেয়ারদের সাথে।” আর তারপরই বুঝতে পার কী বলে ফেলেছে, “তুমিও ভাল খেলো-মেয়ে হিসেবে। আমার মনে হয় আরেকটু প্র্যাকটিস করলেই তুমি ভালো গোলকীপার হতে পারবে। কিন্তু মাম্মা, আমি আমার স্কুলের ফ্রেন্ডদের সাথে খেলতে চাই।”
“আমি তো জানি না।” আদ্রার দিকে তাকাল বেলা। “তোমার বন্ধুরা এখানে আসে?” আদ্রা উড-স্টোভ থেকে তাকালো না পর্যন্ত। শুধু জানাল, “জোসে’কে জিজ্ঞেস করুন। হয়ত অনুমতি মিলবে।”
সেদিন বিকেলেই জিপ ভর্তি কৃষাঙ্গ বাচ্চা ছেলেদের নিয়ে কম্পাউন্ডে চলে এলো জোসে আর নিকি। তুমুল প্রতিযোগিতাপূর্ণ একটা ম্যাচ হলো সৈকতে।
জোসে আর ইসাবেলা এসে তিনবার ছেলেদের যুদ্ধ থামাল। কিন্তু প্রতিবার আবার এমনভাবে খেলা শুরু হল যেন একটু আগে হাতাহাতি কিংবা মারামারির কোনো ঘটনাই ঘটে নি।
বিপ্লবের পুত্রদের গোলকীপার হলো ইসাবেলা। কিন্তু পাঁচ গোল খাওয়ার পর ক্যাপ্টেন নিকোলাস এসে কৌশলে জানালো, “মাম্মা তুমি বোধহয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছ, একটু রেস্ট নাও।” ফলে সাইড লাইনে চলে আসল বেলা।
অতঃপর ফলাফল হত ২৬ : ৫ অর্থাৎ ছাব্বিশ গোলে জিতে গেল বিপ্লবের পুত্র’রা। ওই পাঁচটা গোল খাওয়াতে মনে মনে অপরাধ বোধ ভোগল বেলা। ফাইনাল হুইসেল বাজার পর নিজের গিফট বক্স খুলে দুই কিলো টফি আর চকোলেট বিলিয়ে দিল দোষ ঢাকার জন্য। দুই দলই অবশ্য সাথে সাথে তাকে মাফ করে দিল।
ডিনারের সময়েও সহজভাবেই গল্প করল নিকি। বেলা নিজেও স্বাভাবিক থাকতে চাইল; কিন্তু চোখ বারবার চলে যাচ্ছে জানালার দিকে। মন পড়ে আছে সৈকতে; শন্ যদি আসে, তো আজ রাতেই আসবে। এদিকে বেলা বুঝতে পারল যে আদ্রাও তাকে খেয়াল করছে।
তাই নিকির কথায় মনোযোগ দিতে গিয়ে ভাবতে লাগল আদ্রা’র কথা।
মহিলাকে কি সাথে করে নিয়ে যাবে? আদ্রা যদি না আসতে চায়? সবসময় এত গোমড়া হয়ে থাকে যে ওর মনের কথা বেলা কখনোই আঁচ করতে পারেনি। তবে নিকি’কে জান প্রাণ দিয়ে ভালবাসে এতে কোন সন্দেহ নেই।
আচ্ছা আদ্রা’কে কি রেসকিউ অপারেশনের কথা বলবে নাকি? আপন মনেই ভাবল বেলা। একবার জিজ্ঞেস করবে নাকি? হয়ত যেতে চাইবে। এত বছর দেখ ভাল করার পরে এখন ওর কাছে থেকে নিকি’কে এভাবে নিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? কিন্তু কেবল নিকি কিংবা বেলা’র ভয় নয় তাহলে ওর ভাই আর সেসব সাহসী সৈন্যগুলোকেও যদি কোনো চড়া মূল্য দিতে হয়?
এভাবে খেতে খেতে বহুবার আদ্রার সাথে কথা বলতে চাইল বেলা; কিন্তু প্রতিবারই সরে গেল আদ্রা।
