“দ্বিতীয় বিষয় হল, তোমাদেরকে যে স্কেচ ম্যাপ দেখিয়েছি তা সত্যের চেয়ে কল্পনা বেশি। এর উপর ভরসা করো না। তৃতীয় ব্যাপার হলো, ফিরে আসার সময় কেউ সৈকতে থেকে যেও না। চিকাম্বা হলিডে কাটাবার জায়গা না। খাবার আর আবাসস্থল সবই জঘন্য।” বাঙ্ক থেকে নিজের রাইফেল তুলে নিল শন’ “তো আমার বাছারা, চলো দেখি ব্যাটারা কী করছে।”
নিভিয়ে দেয়া হয়েছে ল্যান্সারের সব বাতি। রাডার আর আর ডেপথ সাউন্ডারের উপর ভর করে এগিয়ে চলেছে তীরের দিকে। ইঞ্চিন বন্ধ থাকায় ভরসা কেবল ক্যাপ্টেনের দক্ষতা। সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সামুদ্রিক শৈল শ্রেণির উপর আছড়ে পড়া সফেন তরঙ্গপুঞ্জ দেখতে পেল শন। তীরের উপরেও কোন আলো দেখা গেল না। ঘুমিয়ে আছে যেন পুরো ঘাঁটি। আকাশে নিশ্চিদ্র মেঘের আস্তরণ থাকাতে নেই কোনো তারা কিংবা চাঁদের আলো।
রাডার হুড থেকে সিধে হয়ে বসল ভ্যান ডার বার্গ, “এক মাইল দূর” আস্তে করে ঘোষণা করল ক্যাপ্টেন। “পানির গভীরতা ছয় ফ্যাদম আর বালুচর আছে।”
গাছের গুঁড়ির মতো ভাসছে ল্যান্সার। “থ্যাংকস ভ্যান” জানাল শন্। “তোমার জন্য চমৎকার কোনো একটা উপহার নিয়ে আসব।” হালকা পায়ে কম্প্যানিয়নওয়ে ধরে মেইন ডে’কে নেমে এলো শন।
নিজ নিজ কালো রাবারের ল্যান্ডিং বোট নিয়ে স্টার্নের কাছে অপেক্ষা করছে প্রতিটা দল। বাতাসে মাদকের গন্ধ পাওয়াতে ভ্রু কুঁচকে ফেলল শন্। সে পছন্দ না করলেও এটা স্কাউটদের ট্রাডিশনে পরিণত হয়েছে। হামলা করার আগে “বুম” করা চাই।
“সার্জেন্ট-মেজর, স্মোকিং লাইট আউট হয়ে গেছে” শনের কথা শুনে স্কাউটেরা যার যার ক্যানাবিস সিগারেট ডে’কের উপর পিষে নিভিয়ে ফেলল। শন বুঝতে পারে যে ধূমপানের মাধ্যমে ভয় কাটিয়ে উঠে বেপরোয়া সাহসী হয়ে উঠে তার ছেলেরা; কিন্তু সে নিজে কখনো এর চর্চা করেনি। বরঞ্চ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে এ ভয়; রক্তে মিশে গিয়ে মাথার মাঝে সবর্দা তাড়না জাগায়। মরণের মুখে ঝাঁপ দিয়ে পড়ার আগেই যেন নিজেকে বড় বেশি জীবিত বলে মনে হয়। তাই এই নিখাদ ভয়ের শিখাকে আড়াল করার কোনো চেষ্টাই করে না।
মসৃণভাবে পানির মাঝে নেমে গেল একের পর এক রাবারের বোট। সাথে ইকুপমেন্ট আর স্কাউটেরা। টয়েটো আউটবোর্ড চালু করে অন্ধকারে কলকল করতে লাগল নাবিকেরা। বাতাসহীন নিঃশব্দ রাতেও এ শব্দ শ’খানেক গজের বেশি পৌঁছাবে না।
লম্বা কালো একটা সাপের মতো এগিয়ে চলল বোটের সারি নিজের শ্রেষ্ঠ তিন সঙ্গীকে নিয়ে সবার আগে আছে শন। স্টানের উপর ঢাকনিঅলা একটা পেন লাইট জ্বালিয়ে রেখেছে যেন প্রতিটি রাবার বোট আলো দেখে পিছু নিতে পারে।
স্টার্নের কাছে দাঁড়িয়ে আছে শন্। গলার কাছে ছোট্ট লুমিনাসে কম্পাস ঝুললেও নাইটস্কোপের উপর ভরসা করেই সকলকে তীরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দেখতে অনেকটা প্লাস্টিক কোটেড বাইনোকুলারের মত।
জিইস লেন্সের ভেতরে দিয়ে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মেঘের গাঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাল গাছের সারি। সামনেই নদীর খোলা মুখ। পাশে চলে এলো ইসাউ গনডেন্সর বোট। “এই যে পেয়ে গেছি” খানিকটা ঝুঁকে ম্যাটাবেলে’কে ফিসফিস করে জানাল শন্।
“আমিও দেখতে পাচ্ছি।”
নিজের চোখের নাইটসস্কোপ ঠিক করে নিল গনডেল। “চলো ব্যাটাদের তেল বার করি।” পাশাপাশি চলল তিনটা অ্যাটাক বোট। ল্যান্ডের দিকে এগিয়ে হারিয়ে গেল নদীর মাঝে। মাটির সাথে সমান্তরাল পথে ছুটে চলল।
বোটম্যানের কানে ফিসফিস করতেই আড়াআড়ি সৈকতের দিকে ছুটল শনের বোট। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চারপাশ দেখছে শন। নদীমুখ থেকে আধা মাইল দূরে থাকতেই পাম বিথীর মাঝে কুঁড়ে ঘরের চৌকোণা আউটলাইন চোখে পড়ল। এর পেছনেই আছে দ্বিতীয়টি। “এটা বেলা’র বণনার সাথে মিলে যাচ্ছে।” নিশ্চিত হলো শন্।
সৈকতের দিকে ধেয়ে চলল রাবার বোটের আরোহীরা। কাছাকাছি কুঁড়েঘরের উপর দেখা গেল ধাতব ক্রিস্টমাস ট্রি অ্যানটেনা আর ডিশ। স্যাটেলাইট কমুনিকেশন সেন্টার।
“তার মানে, এটাই। কোন ভুল নেই।”
বালিতে গেঁথে গেল রাবার বোটের মসৃণ তলা। হাঁটু সমান পানিতে নেমে পড়ল শনে’র দলবল। তীরের দিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল শন। সৈকতের বালি এতটাই সাদা যে কাঁকড়াগুলোকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কাভার নিল প্রত্যেকে; তাল গাছের সারির নিচে হাই ওয়াটার রিজের কাছে।
বিয়ারিং চেক করার জন্য কয়েক মিনিট সময় নিল শন। বেলা’র প্রথমবার ভ্রমণের স্মৃতি অনুযায়ী কম্যুনিকেশন সেন্টারেই ওকে সার্চ করেছিল দুই তিনজন নারী অপারেটর। সেন্টারটাও তারাই চালায়। পেছনের ব্যারাকেই থাকে প্রায় বিশ জন প্যারা গার্ডস।
সূর্যাস্তের সাথে সাথেই বন্ধ হয়ে যায় কম্পাউন্ডের দরজা। এব্যাপারে বার বার সাবধান করে দিয়েছে বেলা। একজন সেন্ট্রি থাকে। প্রতি চার ঘণ্টার বদল হয় পাহারাদার।
“ওই যে মহাশয় আসছেন” তারের বেড়ার পেছনে সেন্ট্রির গাঢ় অবয়ব দেখতে পেল শন। নাইটস্কোপ নামিয়ে পাশেই শুয়ে থাকা স্কাউটকে ফিসফিস করে জানাল; “বিশ কদম সামনে পোর্কি, বাম থেকে ডানে যাচ্ছে।”
“বুঝেছি।” পর্তুগিজ রোডেশিয়ান গোর্কি শোভস্ এর বিশেষত্ব হলো সে ছুঁড়ে মারতে ওস্তাদ। পঞ্চাশ মিটার দূর থেকে ঘুঘুর পাখা খসিয়ে দিতে পারে। দশ মিটার দূর থেকে ওর ছোঁড়া স্টিলের বল-বিয়ারিং যে কোনো মানুষের খুলি’র ভেতর ঢুকে যাবে কোনো সমস্যা ছাড়াই।
