চেহারার দিকে না তাকিয়েই খারিজ করে দিল আরেকটা নাচের প্রস্তাব। ঢকঢক করে গলায় ঢালল শ্যাম্পেন। উফ! কী বাজে।
“একটা বাজার পর আর এক মিনিটও অপেক্ষা করব না।” নিজেকে শোনাল বেলা। আর এটাই শেষ কথা।”
আর তারপরেই বেড়ে গেল হার্টবিট। গানের শব্দ মনে হল কানে মধু বর্ষণ করছে। বিরক্তিকর ভিড় আর হট্টগোল সব ভুলে গেল। মন খারাপ ভাব কেটে গিয়ে বন্য এক উত্তেজনায় চাঙ্গা হয়ে উঠল।
ওই, সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সে। এতটা লম্বা যে আশে পাশের সবার চেয়ে অন্তত আধা মাথা উঁচু। কপালের উপর প্রশ্ন চিহ্নের মতো পড়ে আছে একটা চুল। অভিব্যক্তিতে স্থির, অচঞ্চল সুদূরের অবয়ব।
ইচ্ছে হল চিৎকার করে বলে উঠে, “রামোন, আমি এখানে।” কিন্তু না নিজেকে থামাল। গ্লাস রেখে দিল একপাশে। গড়িয়ে যেতেই ঈষদুষ্ণ শ্যাম্পেন পড়ল নিচের সিঁড়িতে বসে থাকা মেয়েটার খোলা পিঠে। ইসাবেলা এমনকি মেয়েটার অভিযোগও শুনতে পেল না। হালকাভাবে উঠে দাঁড়াতেই রামোনের সবুজ দৃষ্টি এসে খুঁজে নিল ওকে।
চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে নাচতে থাকা অন্যদের মাথার উপর দিয়ে পরস্পরের দিকে তাকাল দু’জনে। মনে হল যেন কেউ কোথাও নেই। কেউই হাসল না। ইসাবেলার কাছে মনে হলো এই সেই পবিত্ৰক্ষণ। ও এলো; আর অদ্ভুত কোন উপায়ে ইসাবেলা টের পেল কী হতে যাচ্ছে। নিশ্চিত যে এই মুহূর্ত থেকে বদলে গেল তার জীবন। কিছুই আর আগের মতো রইবে না।
সিঁড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জড়াজড়ি করে বসে থাকা কারো উপর ধাক্কা না খেয়েই নেমে আসতে লাগল বেলা। মনে হলো যেন ওরাই তাকে পথ করে দিল আর পা দুটোও খুঁজে নিল নিজেদের গন্তব্য।
রামোনকেই দেখছে শুধু। এগিয়ে এলো না। এত ভিড়ের মাঝে একেবারে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভঙ্গি দেখে মনে পড়ে গেল বিশাল শিকারি আফ্রিকান বিড়ালপুলোর কথা। ছেলেটার কাছে এগিয়ে যেতে যেতে বুকের মাঝে ছলাৎ করে উঠল ভয় মেশানো উত্তেজনা।
একে অন্যের সামনে দাঁড়িয়েও কেউই কথা বলল না। মুহূর্তখানেক পরে রোদে পোড়া শূন্য বাহু তুলে ধরতেই বুকের কাছে টেনে নিল রামোন। হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরল বেলা। একসাথে নাচল দুজনে আর প্রতিটা পদক্ষেপে ঠিক যেন ওর শরীর থেকে বিদ্যুতের ঢেউ এসে আঘাত করতে লাগল বেলাকে।
চারপাশে ভিড়ে অতিরিক্ত গানের শব্দের মাঝেও নিজেদের রচিত সুরে মগ্ন হয়ে নেচে চলল রামোন আর ইসাবেলা। প্রচণ্ড শারীরিক আকর্ষণে যেন বেলাকে কোন বাদ্যযন্ত্রের মতই বাজিয়ে চলেছে ছেলেটা।
ইসাবেলার নিজেকে মনে হল আঙ্গুর লতা, যে কিনা জড়িয়ে রয়েছে রামোন বৃক্ষের গায়ে অথবা ঢেউ হয়ে আঁছড়ে পড়ছে রামোন পাথরের উপর। মনে হলো রামোন কোনো সুউচ্চ পর্বত শৃঙ্গ আর নরম মেঘ হয়ে তাকে ঢেকে রেখেছে বেলা।
হালকা আর মুক্ত বিহঙ্গের মতো রামোনের বাহুডোরে নাচছে মেয়েটা। সময় আর স্থান-কালও যেন স্থির হয়ে গেছে। এমনকি মাধ্যাকর্ষণ শক্তিও খেই হারিয়ে ফেলেছে। জমিনে যেন পা-ই পড়ছে না আপ্লুত বেলার।
ওকে দরজার দিকে নিয়ে যাচ্ছে রামন। দূর থেকে দেখল রজার কী যেন বলছে। লম্বা মেয়েটা চলে গেছে আর খেপে আগুন হয়ে আছে রজার; কিন্তু জালের মাঝে একসাথে তড়পাতে থাকা মাছেদের মতো মানুষের ভিড়ে ও’কে রেখে রামোনের সাথে চলে এলো বেলা।
সদর দরজায় সিঁড়ি বেয়ে নেমে সিকুইনের কাজ করা ব্যাগ থেকে মিনি কুপারের চাবি বের করে রামোনের হাতে তুলে দিল।
শূন্য রাস্তা দিয়ে সাই সাই করে গাড়ি ছোটাল মোন। যতটা কাছে আসা সম্ভব ততটাই হেলান দিয়ে একমনে কেবল ছেলেটাকেই দেখছে বেলা, খেয়াল নেই তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে রামোন। শুধু ভাবছে তৃষিত শরীরে আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে পারবে।
হঠাৎ করেই থেমে গেল মিনি। লম্বা লম্বা পা ফেলে বেলার পাশে চলে এলো রামোন। বেলা বুঝতে পারল ছেলেটার আকুলতা। রামোনের হাত ধরে মনে হল শূন্যে চেপে রাস্তা ছেড়ে একই রকমের দেখতে লাল-রঙা দালানগুলোর একটার দ্বিতীয় ফ্লোরে উঠে এলো।
দরজা বন্ধ করার সাথে সাথে উভয়ের বাঁধ ভেঙে গেল। সদ্য গজানো দাড়িঅলা হাঙ্গরের মতো শক্ত চামড়ামাখা মুখটা এসে স্বাদ নিল নরম উষ্ণ আর টসটসে মিষ্টি ঠোঁটের।
নিজের ভেতরে বিস্ফোরণের আওয়াজ পেল বেলা। ভেসে গেল সমস্ত বোধ-বুদ্ধি-বিবেক। কানের কাছে গজন করতে লাগল সামুদ্রিক ঝড়ো হাওয়া।
ছোট্ট হলওয়ের পলিশ করা কাঠের মেঝেয় লুটিয়ে পড়ল পোশাক। বেলা’র দেখাদেখি একই রকম এস্ত ভঙ্গিতে নিজের পোশাকও দ্রুত খুলে ফেলল রামোন। ক্ষুধার্তের মতো তাকে দেখছে মেয়েটা।
কোন পুরুষের শরীর যে এতটা সুন্দর হতে পারে জানত না বেলা। মনে হলো অনন্তকাল ধরে কেবল তাকিয়েই থাকতে পারবে যদিও তর সইছে না আর।
মেয়েটাকে দুহাতের মাঝে তুলে নিল ছেলেটা। তারপর নিয়ে গেল ঝড়ের মুখে ভেসে যেতে।
***
জেগে উঠতেই, এক ধরনের ভালো লাগা এসে ছড়িয়ে গেল ইসাবেলা’র পুরো দেহে। মনে হল এই অনির্বচনীয় আনন্দ বুঝি কখনোই কাটবে না। শরীরের প্রতিটি রোমকূপ যেন নব জীবন লাভ করেছে।
বহুক্ষণ ধরে বুঝতেই পারল না যে কী হচ্ছে। তবু মুহূর্তটুকু উপভোগ করতে পড়ে রইল চোখ বন্ধ করে। জানে একসময় নিঃশেষ হয়ে যাবে এই যাদুকরী অনুভূতি, তবু চায় না এটা ফুরিয়ে যাক। এখনো সারা দেহে ছড়িয়ে আছে মানুষটার গন্ধ, স্পর্শ আর সুখকর এক ব্যথার আবেশ।
