নিজের ঘরে ফিরে আসতে আসতে শুনল গুরুগম্ভীর মেঘের ঢাক; রাতের আকাশ চিরে দিল বিদ্যুৎতের চমক। মুখ তুলে তাকাতেই কপালের ঠিক মাঝখানে পড়ল উষ্ণ বৃষ্টির ফোঁটা।
***
একেবারে নিশ্চুপ হয়ে আছে লিয়ারের ককপিট। চল্লিশ হাজার ফুট উপরে আকাশে ভেসে আছে বিশাল এয়ারক্রাফট।
“শত্রু উপকূল সামনেই!” নরম স্বরে ঘোষণা করলেন শাসা, শুনে হেসে ফেলল গ্যারি।
‘কাম অন, বাবা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুভিগুলোতে মানুষ এসব সংলাপ বলে।”
মেঘের দেশের বহু উপরে চাঁদের আলোয় ভাসছে লিয়ার। নিচের মেঘের স্তূপ ঠিক আল্পসের তুষারের মতই অদ্ভুত সাদা দেখাচ্ছে।
“কঙ্গো নদীমুখ থেকে একশ নটিক্যাল মাইল দূর।” স্যাটেলাইট ন্যাভ সিস্টেমের পর্দায় নিজেদের পজিশন চেক করলেন শাসা, “আমরা ঠিক ল্যান্সারের মাথার উপরে আছি।”
“ওদের একটা কল দিয়ে দেখো, তাহলে।”
গ্যারি’র কথা শুনে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ঠিক করলেন শাসা। “হ্যালো ডোনাল্ড ডার্ক। ম্যাজিক ড্রাগন বলছি, শুনতে পাচ্ছো?”
“হ্যালো, ড্রাগন। ডাক বলছি। জবরদস্ত শুনছি। বলে যাও।”
উত্তরটা এত দ্রুত এলো যে বড় ছেলের কণ্ঠস্বর শুনে হাসলেন শাসা।
“শন বোধহয় বোতামের উপর বুড়ো আঙুল দিয়েই বসেছিল” বিড়বিড় করতে করতে মাইক্রোফোনের কী-তে চাপ দিলেন শাসা, “স্ট্যান্ড বাই ডাক, আমরা ডিজনীল্যান্ড যাচ্ছি।”
“হ্যাভ আ নাইস ট্রিপ। ডাক বসেই আছে।”
কো-পাইলটের আসনে বসে প্যাসেঞ্জার কেবিনের দিকে ঘুরে গেলেন শাসা। ইকুপমেন্টের উপর ঝুঁকে বসে আছে কোর্টনি কমুনিকেশনের দুই টেকনিশিয়ান। দশ দিন ধরে সমস্ত স্পেশাল ইলেকট্রনিকস ইনস্টল করেছে এই দুজন। তারপর লিয়ারের কেবিনে স্ট্যাম্প আর ভ্রু দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে। ডিসপ্লে প্যানেলের সবুজ আলো পড়াতে একেক জনের চেহারা দেখাচ্ছে ডাইনীর মতো আর বিশাল হেডফোন লাগানোতে মাথা দুটোও হয়ে গেছে বিকট।
ইন্টারকমের সুইচ টিপলেন শাসা, “হাউ ইউ ডুয়িং লেন?”
চোখ তুলে তাকাল হেড ইঞ্জিনিয়ার, “কোনো বাড়ার পিছু নেয়নি। কিংবা টাগের্ট থেকেও সিগন্যাল পাচ্ছি না। কেবল নর্মাল রেডিও ট্রাফিক
“ক্যারি অন।” আবারো সামনের দিকে তাকলেন শাসা! জানেন চিন্তার কিছু নেই। লিয়ারের পেটে থাকা অ্যান্টিনা কোনো শত্রু রাডারের দেখা পেলে তাদেরকে আগেই সাবধান করে দেবে। স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষতা থাকাতে লেনকে নির্বাচন করা হয়েছে। কিউবান রেডিও ট্রাফিকও সাথে সাথে মনিটর করতে পারবে।
“ওকে, গ্যারি, ছেলের হাত স্পর্শ করলেন শাসা। “কঙ্গো নদীমুখের উপরে চলে এসেছি। তোমার নতুন হোডিং হচ্ছে ১৭৫।”
সম্মত হয়ে উপকূল রেখা বরাবর প্লেন ভাসিয়ে দিল গ্যারি।
লিয়ারের নিচের মেঝের স্তূপে হঠাৎ করেই দেখা দিল গভীর একটা গর্ত। মাথার ঠিক উপরে থাকা চাঁদ দুদিন পরেই পূর্ণ হয়ে যাবে। চল্লিশ ফুট নিচে চাঁদের আলোতে চকচক করছে প্লাটিনামের মতো স্বচ্ছ পানি। দেখা যাচ্ছে আফ্রিকান উপকূলের গাঢ় অবয়ব।
“চার মিনিটের মাঝে আমব্রিজ নদী মুখে পৌঁছে যাবো।” সতর্ক করলেন
“টার্গেট সিগন্যালের জন্য আমরা সার্চ শুরু করেছি” হেডফোনে কনফার্ম করল লেন।
“ওভারহেড আমব্রিজ” ঘোষণা করলেন শাসা।
“কোনো সিগনাল নেই।”
“কান্টাকানহা নদীমুখ ছয় মিনিট দূর।” আবারো জানালেন শাসা।
কিন্তু সামনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন শাসা। তাদের নাক বরাবর সোজা মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে কালো মেঘের বিশাল এক পর্বত। উচ্চতায় না হলেও ষাট থেকে সত্তুর হাজার ফুট।
“এই চার্লিকে দেখে কী মনে হচ্ছে?” গ্যারি’র কাছে জানতে চাইলেন শাসা। মাথা নেড়ে ওয়েদার রাডার সেটে চোখ নামাল গ্যারি। ভয়ংকর এক টকটকে লাল ককন্টের ন্যায় স্ক্রিন জুড়ে দেখা যাচ্ছে ট্রপিক্যাল থান্ডারস্টর্ম।
“এখনো ছিয়ানব্বই মাইল দূর হলেও ব্যাটা সত্যিকারের বদশাম। ঠিক আমাদের টার্গেট রিভার মাউথ চিকাঘার উপর গিয়ে বসে আছে।”
“যদি তাই হয় তাহলে তো বেলার ট্রান্সপন্ডারের সিগন্যাল ধুয়ে মুছে ফেলবে।” চিন্তায় পড়ে গেলেন শাসা।
“এটার মধ্য দিয়ে তো যাওয়ার কোনো উপায়ই দেখছি না।” ঘোৎ ঘোৎ করে উঠল গ্যারি।
“কাটাকানহার উপরে চলে এসেছিলেন কিছু পেলে?”
“নেগেটিভ মিঃ কোর্টনি।” আর তার পরই পাল্টে গেল লেনের গলা, “হোল্ড অন! ওহ শিট! কেউ একজন পেছনে রাডার জুড়ে দিয়েছে।”
“গ্যারি” ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন শাসা, “ওরা আমাদেরকে পেয়ে গেছে।”
“ইন্টারন্যাশনাল ফ্রিকোরেন্সির সুইচ অন্ করে শোন” জানাল গ্যারি।
বরফের মতো জমে গেল সকলে যার যার আসনে বসে। হঠাৎ করেই ক্যারিয়ার ব্যান্ড হিস হিস করে উঠতেই শোনা গেল, “আনআইডেন্টিফায়েড এয়ারক্রাফট। লুয়ান্ডা কন্ট্রোল। তোমরা সংরক্ষিত আকাশসীমায় ঢুকে পড়েছ। এখনি নিজের পরিচয় জানাও। আবারো বলছি, এটা সংরক্ষিত আকাশ সীমা অঞ্চল।”
“লুয়ান্ডা কন্ট্রোল, এটি ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ফ্লাইট বিএ ০৫১। আমাদের ইঞ্জিনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। পজিশনের জন্য রিকোয়েস্ট করছি।” লুয়ান্ডার সাথে আলোচনা শুরু করলেন শাসা। এতে যতটুকু সময় পাওয়া যায়। ততটুকুই লাভ। প্রতিটি সেকেন্ড এখন গুরুতুপূর্ণ। লুয়ান্ডাতে নামার জন্য ক্লিয়ার্যান্স চাওয়ার পাশাপাশি এমন একটা ভাব করলেন যেন তাদের কথার বিন্দু বিসর্গও বুঝতে পারছেন না।
