খানিকক্ষণ বেলা’কে মন ভরে কাদার সুযোগ দিয়ে টেলিফোন তুললেন সেনটেইন।” আমি ডাক্তার মন্তারস’কে ফোন দিচ্ছি। এসে বেলা’কে ওষুধ খাইয়ে শান্ত করবেন।”
তড়িৎ বেগে দাদীর দিকে তাকাল বেলা, “না, নানা, আমার কিছুই দরকার নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমাকে শুধু এক মিনিট দাও।”
ক্রেডলে ফোন রেখে দিলেন সেনটেইন। চামড়ার গদি আটা সোফাতে বোন’কে ধরে বসিয়ে দিল গ্যারি; নিজেও ওর পাশে বসে পড়ল। অন্য পাশে এসে বসলেন শাসা। দু’পাশ থেকে দুজন মিলে বেলাকে ধরে রাখলেন।
“অল রাইট” অবশেষে বলে উঠলেন সেনটেইন “যথেষ্ট হয়েছে। তুমিও পরে কাদার বহু সময় পাবে; এখন কাজের কথায় আসা যাক।”
সোজা হয়ে বসল বেলা; বুক পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন শাসা।
“বলো যে কিভাবে এসব ঘটেছে” আদেশ দিলেন সেনটেইন।
বড় করে একটা শ্বাস নিল বেলা, “ড্যাডি আর আমি লন্ডনে থাকাকালীন হাইড পার্কের কনসান্টে রামোনের সাথে পরিচয় হয়েছিল।” ফিসফিস করে জানাল বেলা। ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে এলো। প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে একটানা কথা বলে জানাল কেন সে আর রামোন বিয়ে করেনি আর কিভাবেই বা স্পেনে নিকি’র জন্ম হলো। “আমি ওকে এখানে ওয়েল্টেভ্রেদেনে ফিরিয়ে আনতে গিয়েছিলাম। প্ল্যান ছিল রামোন মুক্তি পাবার সাথে সাথে আমরা বিয়ে করব।”
এরপর একের পর এক বলে গেল রামোন আর নিকি’র অপহরণের কাহিনী, শিশু অবস্থায় নিকি’র উপর অত্যাচার আর তারপর থেকে দুঃস্বপ্নের মতো পার করা প্রতিটি দিনের কথা।
“এই রহস্যময় লোকগুলো তোমার কাছ থেকে কী চায়? রামোন আর নিকির নিরাপত্তার জন্য তোমাকে কোনো মূল্য দিতে হচ্ছে? নিকি’কে দেখতে পাবার সুযোগের পরিবর্তে তুমি তাদেরকে কী দিচ্ছ?” তীক্ষ্ণ স্বরে জানতে চাইলেন শাসা।
কাঠের মেঝেতে নিজের হাতের বেতের লাঠি ঠুকলেন সেনটেইন, “এ মুহূর্তে এসব তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়; এগুলো নিয়ে আমরা পরে ভাবব।”
“না” মাথা নাড়ল বেলা, “উত্তর দিতে আমার কোনো সমস্যা নেই। ওরা আমার কাছ থেকে কিছুই চায় না। আমার ধারণা উনারা রামোনকে দিয়ে জোর করে কিছু করিয়ে নিচ্ছে। তার পরিবর্তে আমার আর নিকোলাসের সাথে দেখা করতে দিচ্ছে।”
“তুমি মিথ্যে বলছ বেলা” কর্কশ হয়ে উঠল শাসার গলা।” রামোন মাচাদো তোমাকে ব্যবহার করছে। তুমি বাধ্য হচ্ছ তার আর তার প্রভুদের ফরমায়েশ পূর্ণ করতে।”
“না” এক অর্থে খুশিই হলো বেলা যে বাবা ওর মিথ্যে এত সহজে টের পেয়ে গেছে। “রামোনও আমার মতই অসহায়। আমাদেরকে ভয় দেখিয়ে ব্লাকমেইল করা
“স্টপ ইট, বেলা” মেয়েকে থামিয়ে দিলেন শাসা, “তুমিই একমাত্র মূল্য চুকাচ্ছো। নিকোলাস হলো ওদের তুরুপের তাস। রামোনই হলো সেই শয়তান যার হাতে আছে আসল নাটাই”
আর্তচিৎকার করে উঠল বেলা : “না! তুমি জানো না! রামোন তো”
“আমি তোমাকে বলছি যে কে এই রামোন ডি সান্তিয়াগো-ই-মাচাদো; তুমিই আমাদেরকে ওর পারিবারিক নাম জানিয়েছ” শাসা ইশারা করতেই জার্নালটাকে আগলে ধরল বেলা। “তুমি তো জানই যে ইস্রায়েলে আমার বন্ধুরা আছেন। এদেরই একজন মোসাদের ডিরেকটর। আমি ফোন করাতে ওদের কম্পিউটারে খুঁজে দেখেছে রামোনের নাম। সি আই’এর সাথে যুক্ত ওদের কম্পিউটার। আমাদের নিজেদের সিকিউরিটি ফোর্সেরও রামোনের উপর ওপেন ফাইল আছে। ন্যানি তোমার জার্নাল নিয়ে আসার তিন দিনের মাঝে তোমার রামোন সম্পর্কে বেশ মজার কিছু তথ্য খুঁজে পেয়েছি; সোফা থেকে লাফ দিয়ে উঠে ডেস্কের কাছে গেলেন শাসা। একটা ড্রয়ার খুলে বের করলেন বেশ মোটাসেটা একটা ফাইল। ঠাস্ করে ছুঁড়ে ফেললেন বেলা’র সামনে রাখা কফি টেবিলের উপর। পুরু ফাইলের কাভার উপচে ছড়িয়ে পড়েছে প্রেস কাটিং ছবি। ডকুমেন্টস আর একতাড়া কম্পিউটার শীট।
“গত রাতে তেল আবিব থেকে ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগে ভরে ইস্রায়েল থেকে এসেছে এটি। নিজে না দেখা পর্যন্ত আমি তোমাকে ডাকিনি। পড়ে অবশ্য ভালই লেগেছে।” স্কুপের মধ্য থেকে একটা ছবি টেনে নিলেন শাসা।” বিজয়ীর বেশে ১৯৫৯ এর জানুয়ারিতে হাভানা’তে ঢুকছেন ফিদেল ক্যাস্ট্রেী। দ্বিতীয় জিপে একসাথে চে গুয়েভারা আর রামোন।” আরেকটা চকচকে সাদা কালো ছবি তুলে নিয়েছেন শাসা।” কঙ্গো ১৯৬৫। প্যাট্রিস লুমাম্বা ব্রিগেড। বাম পাশ থেকে দ্বিতীয় শ্বেতাঙ্গটিই হলো রামোন। সাথে সিম্বা বিদ্রোহীদের মৃতদেহ।” আরেকটা ছবি হাতে নিয়ে জানালেন, বে অব পিগস’র পরে কাজিন ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে রামোনল্যান্ডিং এর বুদ্ধি বের হয়েছে রামোনের মাথা থেকে।” একগাদা ছবির মধ্যে হাতড়াচ্ছেন শাসা; “এই ছবিটা মাত্র কদিন আগে ভোলা। কর্নেল জেনারেল রামোন ডি সান্তিয়াগো-ই-মাচাদো, কেজিবি’র ফোর্থ ডিরেকটরের আফ্রিকান সেকশন হেড, জেনারেল সেক্রেটারি ব্রেজনেভের কাছ থেকে অর্ডার অব লেনিন অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করছে। ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় বেশ সুদর্শনই লাগছে। তাই না বেলা? ওই মেডেলগুলো দেখো”।
এমন ভাবে ছবিটার কাছ থেকে সরে গেল বেলা যেন বাবা কোনো কালো মাম্বা ধরে রেখেছে।
শাসা’র হাত থেকে ছবিটা নিল গ্যারি, “এই লোকটা রামোন?” বোনের মুখের সামনে ছবি ধরে জানতে চাইল গ্যারি। চোখ নামিয়ে নিল বেলা; কিছু বলল না।
