“ওহু, না, না; আমি অযথা তোমাদেরকে বিরক্ত করতে চাই না।”
“প্লিজ।” অনুনয় করছে বেলা। তোমার ভালই লাগবে। ওরা বেশ মজার।” জিনের উপর বসে হালকাভাবে মাথা নাড়ল রামোন।
“এত সুন্দর একটা মেয়ের কাছ থেকে পাওয়া নিমন্ত্রণ কিভাবে প্রত্যাখ্যান করি?” রামোন জানাতেই ধুপধুপ করে উঠল ইসাবেলার হৃদয়। স্বর্গদূতের মতো চেহারায় ওই সবুজ চোখ জোড়ার দিকে তাকিয়ে মনে হলো রীতিমতো শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যাবে।
বাকি তিনজন এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল। কাছে না এসেও বেলা ঠিকই বুঝতে পারল যে রজার মুখে গোমড়া করে আছে। পুলকিত হয়ে তাই জানাল : রজার, ও হচ্ছে মারকুইস ডি সান্তিয়াগো-ই-মাচাদো। রামোন, ও হচ্ছে রজার কোটস্ গ্রেইনার।”
পরিহাসের দৃষ্টিতে রামোন ওর দিকে তাকাতেই বেলা বুঝতে পারল ভুল করে ফেলেছে। কেননা প্রথমবার সাক্ষাতের সময় নিজের পদবী জানায়নি রামোন।
যাই হোক ক্ষণিকের অস্বস্তি কেটে গেল হারিয়েট কু-চ্যাম্পের সাথে রামোনকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময়। মজা লাগল হ্যারিয়েটের প্রতিক্রিয়া দেখে। লন্ডনে ইসাবেলার সবচেয়ে ভালো বান্ধবী হল এই হ্যারিয়েট। যদিও এর অন্য আরেকটা কারণই প্রধান। লন্ডন সোসাইটি’র ইনার সার্কেলে ইসাবেলাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে লেডি হ্যারিয়েট। হ্যারিয়েটও তাকে পছন্দ করে কেননা বেলা থাকলেই আশে পাশে ছেলেদের ভিড় জমে যাবে। তাই রামোনকে দেখে প্রায় সাথে সাথে ঠোঁট চাটতে থাকা হ্যারিয়েটকে ইসাবেলা নিঃশব্দে সতর্ক করে দিল দু’জনের মাঝখানে নিজের ঘোড় রেখে।
“মারকুইস?” ঘোড়া চালাতে চালাতে বিড়বিড় করে উঠল রামোন। “তুমি তো আমার সম্পর্কে ভালই জানো, কিন্তু তোমার সম্পর্কে আমি তো তেমন কিছু জানি না।”
“ওহ্ কোন পত্রিকার কলামে বোধ হয় তোমার ছবি দেখেছিলাম।” হাওয়া থেকে অযুহাত বানিয়ে ইসাবেলা ভাবতে লাগল : ঈশ্বর, ও যাতে বুঝতে না পারে যে আমি এতটা আগ্রহী।
‘আহ্, নিশ্চয়ই টাটলার…’
মাথা নাড়ল রামোন। কখনো কোথাও ওর ছবি ছাপা হয়নি, শুধু সি আই এ অথবা দুনিয়ার অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থার কাছে থাকলে থাকতেও পারে।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, টাটলারেই।” পালানোর পথ পেয়ে লুফে নিল নামটা বেলা। প্ল্যান কষতে লাগল কিভাবে নিজের আগ্রহ না দেখিয়ে বাগে আনা যায় এই রাজকুমারকে। তবে যতটা কঠিন হবে ভেবেছিল কাজটা, মনে হচ্ছে তা না। রামোন নিজেও খোলামেলাভাবে মিশে গেছে ওদের দলে। একটু পরেই সকলে বেশ মিশে গেল, একসাথে হাসছে। গল্প করছে, শুধু রজার বাদে। ওর গোসা মুখ এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই সবাই ফিরে চলল আস্তাবলের দিকে। হ্যারিয়েটের কাছাকাছি এসে হিসহিস করে ইসাবেলা বলে উঠল, “ওকে আজ রাতের পার্টিতে দাওয়াত করো।”
“কে?” যেন আকাশ থেকে পড়ল এমনভাবে তাকালো হ্যারিয়েট। “টং করবে না দস্যি মেয়ে। গত এক ঘণ্টা ধরে চোখ গোল গোল করে কাকে দেখছ আমি জানি না বুঝি?”
***
হ্যারিয়েটের দেয়া অন্যান্য স্মরণীয় পার্টিগুলোর চেয়ে ভালোই হলো আজকের আয়োজন। এতটাই ভিড় হলো যে মাথায় জরুরি কাজের তাড়া থাকা জুড়িগুলোর’ও বিশ মিনিট লেগে গেল বল রুম থেকে সিঁড়ি বেয়ে বেডরুমে যেতে। সেখানে আবার অপেক্ষা করতে হল তাদের পালা আসার জন্য।
হ্যারিয়েটের পাপার জন্য করুণাই হলো ইসাবেলা’র। দশম আর্ল যদি জানাতেন যে তার বিছানার উপর দিয়ে কত ঝড় বয়ে গেছে।
চারপাশের উদ্দাম হই-হল্লার মাঝেও একটাই চিন্তা ঘুরছে ওর মাথায়। মার্বেলের সিঁড়ির মাঝামাঝি একটুখানি জায়গা পাওয়া গেছে যেখানে দাঁড়িয়ে নজর রাখা যাবে সদর দরজা দিয়ে আগত প্রত্যেকের উপর। একই সাথে দেখা যাবে বল রুম আর নাচিয়েদের ভিড়ে ভারাক্রান্ত ড্রয়িং রুম।
একসাথে নাচার সব নিমন্ত্রণ প্রত্যাখান করে যাচ্ছে বেলা। অপেক্ষা করছে কাঙ্ক্ষিত জনের জন্য। আর রডার কোটস্ গ্রেইনজারের সাথে এতটাই ঠাণ্ডা আচরণ করেছে যে বেচারা ছাদের শ্যাম্পেন বারে চলে গেছে মন খারাপ করে। যাই হোক, ভালই হয়েছে।
টলতে টলতে, চিৎকার করতে করতে ভেতরে এলো আরো এক দল। তাদের মাঝে ঢেউ খেলানো কালো চুল দেখে ধড়াস ধড়াস করতে লাগল বেলা’র হৃদপিণ্ড। কিন্তু না, লোকটা বেশ খাটো। এদিকে ঘুরতেই চেহারা দেখে তো রীতিমতো রাগ হতে লাগল।
এক ধরনের বিকৃত যৌনানন্দের মর্মপীড়ায় আপ্লুত হয়ে পুরো সন্ধ্যায় মাত্র এক গ্লাস শ্যাম্পেন শেষ করল বেলা। এখন তো ওয়াইনও সাদা-মাটা আর গরম লাগছে। চারপাশে তাকিয়ে রজারকে খুঁজল, ভাবল আরেক গ্লাস আনিয়ে নেবে। দেখতে পেল, আলগা পাপড়ি লাগানো লম্বা আর কৃশকায় এক মেয়ের সাথে নাচে মত্ত সে।
ঈশ্বর, মেয়েটা কী ভয়ংকর ভাবতে ভাবতে তাকাল ড্রইং রুমের দরজার উপরে রাখা পোর্সেলিনের ফ্রেঞ্চ ঘড়ির দিকে। একটা বাজতে বিশ মিনিট বাকি। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে মনে করল বাবার কথা।
আজ দুপুর বেলায় পার্লামেন্টের প্রভাবশালী কনজারভেৰ্টিড মেম্বার আর তাদের স্ত্রীদের সাথে নিয়ে লাঞ্চ করবে ড্যাডি। বরাবরের মতো বেলাকেই সব ঠিকঠাক করতে হবে। তাই একটু ঘুমিয়ে নেয়া খুবই দরকার। তারপরেও ও এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কোথায় গেল ছেলেটা? তখনতো বলেছিল আসবে। “আসলে ও বলেছিল আসতে চেষ্টা করবো। কিন্তু সব কিছু এত হাসি-খুশি ছিল যে সেটাকে প্রমিজ হিসেবেই ধরে নেয়া যায়।
