বারো ফুট বেড়া দিয়ে ঘেরা এলাকার গেইটে ঝুলছে তিন ভাষায় লেখা সতর্ক সংকেত। মেইন গেইটের গার্ডদের সাথে রটওয়েলার জাতের কুকুরও আছে। সকলকেই এমনকি মিনিস্টারকেও যেতে হলো ইলেট্রিক স্ক্যানারের ভেতর দিয়ে।
একগাদা কার্পেট পাতা করিডোরের মাঝে দিয়ে পথ দেখালেন ইস্রায়েলী ডিরেক্টর অবশেষে নতুন সিনডেক্স এক্সটেনশন এলো। পুরো দালানটা এতটাই নতুন যে কাঁচা কংক্রীটের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ছোট্ট এন্ট্রান্স লবিতে এসে সকলেই জড়ো হবার পর স্বাগতম জানালেন ডিরেক্টর।
“দালানের এই অংশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত জোরদার করে তোলা হয়েছে। এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম দেখলেই বুঝতে পারবেন যে, সর্বদা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বাতাসের কোয়ালিটি। দশ সেকেন্ডের মাঝেই বাতাস পাম্প করে ফেলে দিয়ে পরিবর্তন করে দেয়াও সম্ভব এখন।” আরো কয়েক মিনিট ধরে কেবল নিরাপত্তা নিয়েই বক বক করলেন ডিরেকটর। “কিন্তু তারপরেও সুরক্ষার নিশ্চয়তার জন্য মেইন প্ল্যান্টে ঢোকার আগে প্রটেকটিভ স্যুট পরতে হবে।
পৃথক পৃথক চেঞ্জিং রুমে সকলের জন্য রাখা আছে সাদা প্লাস্টিকের ওভারঅল, জুতা গ্লাভস্ আর হেলমেট। স্যুট পরে নিয়ে লবি’তে এসে বাকিদের সাথে যোগ দিল বেলা।
“যদি আমরা সকলেই প্রস্তুত থাকি মাই লেডি অ্যান্ড জেন্টেলমেন” দেয়ালের দিকে দরজা বরাবর হাঁটতে শুরু করলেন ডিরেকটর। অভ্যর্থনা জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে চারজন টেকনিশিয়ান। ইসাবেলা খেয়াল করে দেখল যে টেকনিশিয়ানদের ড্রেসের রঙ হলুদ আর ডিরেকটর পরে আছেন লাল। হলুদ স্যুট পরা একজন টেকনিশিয়ান সকলকে পথ দেখিয়ে আরেকটা চিকন করিডোরে নিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে বেলা’র পাশে চলে এলো সেই তরুণ।
“গুড মর্নিং। ডঃ কোর্টনি” মোলায়েম গলার স্বরটা চিনতে পেরেই লোকটার দিকে তাকাল বিস্মিত বেলা।
“হ্যালো, মিঃ আফ্রিকা” বিড়বিড় করে উঠে জানতে চাইল, “ক্যাপরিকর্নের চাকরি কেমন লাগছে?” লন্ডন থেকে আসার পর এই প্রথম তাকে দেখল বেলা।
“ইন্টারেস্টিং থ্যাঙ্ক ইউ।” টেস্ট রুমে ঢোকার আগে দু’জনের মাঝে কেবল এটুকুই কথা হল। কিন্তু বেলা’কে খেয়াল করছিলেন লোথার। চামড়ার আর্মচেরারে বসার পর বেলার পাশে বসে পড়ে লোথার জানতে চাইলেন” কে এই নিগার?”
“উনার নাম আফ্রিকা। কেমিকেল ইঞ্জিনিয়াভের ডিগ্রি আছে।”
“আপনি কিভাবে চেনেন?”
“আমি সিলেকশন কমিটিতে ছিলাম।”
“সিকিউরিটি ক্লিয়ারান্স আছে নিশ্চয়ই?”
“অবশ্যই। আপনার ডিপার্টমেন্ট-ই তো দিয়েছে।” কাটা কাটা জবাব শুনে ডিরেকটারের দিকে তাকালেন লোথার।
“এগুলো হলো টেস্ট কিউবিকলস” ছোট ছোট চারটা কেবিনেটের সাথে টেলিফোন ব্যুহের চেয়ে টয়লেট কেবিনেটেরই মিল বেশি। ভাবল বেলা।
“কেবিনেটের দেয়ালে লাগানো জানালাতে ডাবল আমারড গ্লাস লাগানো আছে। প্রতিটির উপরে আবার মনিটরও আছে।” ইলেকট্রনিক প্যানেল দেখিয়ে দিলেন ডিরেকটর।
জানালার পেছনে সাদা প্লাস্টিকের চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে চারটা মানবসদৃশ জীব। এক মুহূর্তের জন্য ইসাবেলার’র মনে হলো যে এগুলো হয়ত মানব শিশু।
“টেস্ট সাবজেক্ট হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে বেবুন। লোম হেঁটে এগুলোকে মানুষের কাছাকাছি আদল দেয়া হয়েছে। নাম্বার ওয়ান গায়ে প্রায় কিছুই নেই।”
“নাম্বার টু সাধারণ মিলিটারি ইউনিফর্মের মতো পোশাক পরে আছে।”
“নাম্বার থ্রীর চোখ, নাক আর মুখ ব্যতীত প্রায় পুরো শরীরটাই ঢাকা।”
“আর নাম্বার ফোর ঠিক আপনাদের মতোই প্রটেকটিভ স্যুট পরে আছে।”
ইসাবেলার পেটের মাঝে গুড়গুড় শব্দ শুরু হলো। আর পরিষ্কার বাতাস পাওয়া সত্ত্বেও মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে।
“সিনডেক্স-২৫ এর কোন রঙ কিংবা গন্ধ নেই। কিন্তু নিরাপত্তার কথা ভেবে আমাদের গ্যাসে আমন্ডের গন্ধ মেশানো হয়েছে। মনিটরিং ইকুপমেন্ট ছাড়া কোনো ধরনের কুয়াশা কিংবা কিছুই দেখা যাবে না।” খানিক বিরতি দিলেন ডিরেক্টর। গলা পরিষ্কার করে বলে উঠলেন, “নাউ জেন্টেলমেন অ্যান্ড মাই লেডি, আপনারা তৈরি থাকলে আমরা ডেমনস্ট্রেশন শুরু করছি।”
হেলমেট পরিহিত মাথা নাড়লেন মিনিস্টার। ডেস্কে থাকা মাইক্রোফোনে কী যেন অর্ডার দিলেন ডিরেকটর। পেছন দিককার রুমে কন্ট্রোল নিয়ে কিছু একটা করছে হয়তো বেন কিংবা অন্য টেকনিশিয়ান; ভাবলো বেলা।
কয়েক সেকেন্ড কিছুই ঘটল না। স্বাভাবিকভাবেই নিঃশ্বাস নিচ্ছে বেবুনগুলো। এরপরই বাতাসে সিনডেক্স-২৫ পরিমাপক প্যানেলটা ধপ করে জ্বলে উঠল। জিরো থেকে রেঞ্জ উঠে গেল পাঁচ পর্যন্ত।
পর মুহূর্তেই বদলে গেল দৃশ্য। সারা শরীর আবৃত্ত বেবুনটা ছাড়া বাকীগুলোর হার্টবিট দ্রুত বেড়ে গেল; ডিসপ্লে প্যানেল দেখাচ্ছে সবচেয় ভয়ানক অবস্থায় পড়ল নগ্নদেহ বেবুন।
প্রচণ্ড আতঙ্ক নিয়েও তাকিয়ে রইল বেলা। বেবুনটার চোখের পাতা কেঁপে উঠতেই চোখ দিয়ে দরদর করে পানি ঝড়তে লাগল। মুখের ভেতর দুলছে জিহ্ববা আর বুকের উপর গড়িয়ে পড়ল লালা।
“পনের সেকেন্ড” ডিরেকটরের গলা শোনা গেল, সাবজেক্ট নাম্বার ওয়ান পুরোপুরিভাবে অর্থ হয়ে পড়লেও অক্ষত আছে নাম্বার ফোর। দ্বিতীয় আর। তৃতীয় জনের অবস্থা’ও মিডিয়াম মাত্রার।”
শরীরে এঁটে বসে থাকা স্ট্র্যাপ খোলার জন্য প্রাণপণে লড়ছে নগ্নদেহী বেবুন। হঠাৎ করেই মুখ খুলে তীক্ষ্ণ স্বরে চিৎকার করে উঠল। জোড়া পাল্লা লাগানো জানালা ভেদ করেও পরিষ্কার শোনা গেল সে শব্দ। ইসাবেলা মনে হলো আর সহ্য করতে পারছে না; পেটের মধ্যে কী যেন পাঁক দিয়ে উঠছে। দু’হাত মুঠি করে শক্ত হয়ে বসে রইল। পাশে বসে থাকা লোথারসহ অন্যরাও অস্বস্তিতে পড়েছে। এরা সকলেই সৈন্য আর পুলিশের লোক হলেও এতটা করুণ দৃশ্য সকলকেই নাড়া দিয়েছে।
