হয়ত রামোনের প্রতিশ্রুতি মতো এটাই হলো তার শেষ কাজ। একবার তাদের হাতে সিনডেক্স পৌঁছাতে পারলেই হয়ত চিরতরে মুক্তি পাবে এই মাকড়সার জাল থেকে-সে, রামোন আর নিকোলাস। হয়ত তখন শেষ হবে এই দুঃস্বপ্ন।
***
পরের দিন সকালবেলা মেইসন ডেস্ আলিজেসের ডাইনিং রুমে শুরু হলো কনফারেন্স। লম্বা ওয়ালনাট টেবিলের দু’পাশে বসে থাকা ত্রিশজন মানুষের আলোচনার বিষয় হলো মৃত্যু। এমনভাবে এর মেকানিকস, কেমিকেল স্টাকচার প্যাকেজিং আর কোয়ালিটি কন্ট্রোল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হলো যেন সকলে ব্যস্ত কোনো পটেটো চিপস কিংবা ফেইস ক্রিম নিয়ে।
কোনো কিছুতেই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না স্ট্রিলের মতো শক্ত হয়ে বসে থাকা ইসাবেলা; ভালোভাবেই জানে যে গ্যারির পর্যবেক্ষণ শক্তি কতটা তীক্ষ্ণ। চশমার ওপাশে থাকা চোখ দুটো প্রায় কিছুই মিস করে না। বেলার বিতৃষ্ণা কিংবা ভীতি নিমিষেই টের পেয়ে যাবে গ্যারি। আর তাহলেই শেষ হয়ে যাবে ওর সব প্রচেষ্টা।
ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত প্রত্যেকের সামনে একটি করে চামড়ার ফোল্ডার রাখা হয়েছে; ভেতরে পিগটেলি টেকনিশিয়ানদের তৈরি সংক্ষিপ্ত দলিল। তুলে ধরা হয়েছে নার্ভ গ্যাসের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি সমস্যা।
প্রতিবারে একটি করে প্যারা পড়ছেন ওয়ানার স্টলজ। শুনতে শুনতে নিজের অভিব্যক্তি নিরপেক্ষ রাখার জন্য হিমশিম খাচ্ছে আতঙ্কিত ইসাবেলা।
“নির্দিষ্ট কিছু উপাদানের উপস্থিতি থাকাতে পূর্বের নার্ভ গ্যাসগুলোর তুলনায় সিনডেক্স-২৫ অনেকটাই পৃথক…” বৈশিষ্ট্যগুলোর নাম শুনতে গিয়ে মনে হলো কাক্ষিত শব্দটাই হয়তো বেশি যুক্তিযুক্ত হবে; কিন্তু কিছুই না বলে বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ল বেলা।
“সিনডেক্স-২৫ এর বৈশিষ্ট্যগুলো অত্যন্ত অভিনব ও মৌলিক বিষাক্ততা, দ্রুত কাজ করার ক্ষমতা; মানব শরীরের ফুসফুস আর মিউকাস মেমব্রেন দ্রুত শোষণ করে নেয় এ গ্যাস। এছাড়া ম্যানুফ্যাকচার, স্টোর আর হ্যান্ডেলের জন্য বেশ কার্যকর এই গ্যাস। সিনডেক্স-২৫ এর প্রধান দুটি উপাদান একত্রে মেশানোর পর এই গ্যাসের আয়ু হয়ে পড়ে স্বল্প। তাই কার্যক্ষেত্রে একে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ।”
“এবারে এসব বৈশিষ্ট্য আরো সবিস্তারে আলোচনা করা যাক। যেমন বিষাক্ততা। এই গ্যাস এতটাই ক্ষতিকর যে ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাসলেন ওয়ার্নার-দুই মিনিটে শত্রু পক্ষের ৫০ শতাংশ আর দশ মিনিটে পুরো ১০০ শতাংশ মেরে ফেলতে সক্ষম। সারিনের চেয়েও গ্যাসকে দ্রুত শুষে নেয় দেহতুক, চোখ, নাক, গলা আর পরিপাকতন্ত্র, এক মাইক্রোলিটার পরিমাণ সিনডেক্স গ্যাস নগ্ন দেহত্বকে লাগানো হলে দুই মিনিটে অসাড় হওয়া সত্ত্বেও পনের মিনিটেই মৃত্যুবরণ করবেন আক্রান্ত ব্যক্তি। তাই সারিনের চেয়েও চারগুণ বেশি সম্ভাবনাময়। এবারে আলোচনার বিষয় উৎপাদনের খরচ প্রসঙ্গে। প্লিজ বারো নম্বর পাতা খুলুন সকলে।”
বিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে-মেয়ের মতো বাধ্য ভঙ্গিতে আদেশ পালন করলেন উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তি আর ওয়ার্নরা বলে চলেছেন, “প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে প্ল্যান্টের পেছনে ব্যয় হবে বিশ মিলিয়ন ইউএস ডুলারস আর ম্যানুফ্যাকচার খরচ প্রতি কিলো বিশ ডলার।”
ভাষার ব্যবহার শুনে এই অবস্থাতেইও বেলা’র হাসি পেল; যাই থোক বলে চলেছেন ওয়ার্নার,
“তুলনা করলে দেখা যাবে যে গোটা প্ল্যান্টের খরচ পড়বে ব্রিটিশ অ্যারোস্পেস থেকে একটা সিংগেল হ্যারিয়ার জেট কেনার সমান। আর সিনডেক্সের এক স্টক উৎপাদনের অর্থ দিয়ে বারো মাস যে কোনো দেশের প্রতিরক্ষা ব্যয় মেটানো যাবে; কেনা যাবে পঞ্চাশটা সাইডউন্ডার এয়ার স্টু-এয়ার মিসাইলস…”।
“এ ধরনের প্রস্তাব আসছে অগ্রাহ্য করার কিছু নেই।” মিটমিট করে হেসে উঠল গ্যারি, ভাইয়ের প্রতি মনের মাঝে এতটা ঘৃণার সঞ্চার হলো যে অবাক হয়ে গেল বেলা।
এমন কোনো কিছু নিয়ে কেউ কিভাবে তামাশা করে? চোখ তুলে তাকাবার সাহস করল না বেলা। যদি গ্যারি বুঝে ফেলে! মাথা নেড়ে গ্যারি’র সাথে একমত হলেন ওয়ার্নার।
“সিনডেক্স প্রয়োগ করার জন্য কোনো বিশেষ ভেহিকেলের প্রয়োজন নেই। সাধারণ শস্য ছিটানোর এয়ারক্রাফটসহ আর্টিলারী প্রজেক্টাইলকেও কাজে লাগানো যাবে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আদর্শ হচ্ছে আর্মসকোরের নতুন জি-ফাইভ লংরেঞ্জ ছোট কামান।”
দুপুরবেলা পুলে সাঁতার কাটা আর ছাদে ব্যুফে লাঞ্চের জন্য বিরতি ঘোষণা করা হলো। অবশেষে আবার সবাই ডাইনিং রুমে ফিরে এলো সিনডেক্স-২৫ এর উপসর্গ নিয়ে আলোচনা করার জন্য।
“কখনো হিউম্যান সাবজেক্টের উপর প্রয়োগ করা না হলেও সিনডেক্স অ্যারোসলের উপসর্গগুলো অন্যান্য জি এজেন্টে নার্ভ গ্যাসের চেয়ে তেমন ভিন্ন কিছু নয়।” জানালেন ওয়ার্নার। “এগুলো হলো বুকে ব্যথা হওয়াসহ নাক আর চোখ জ্বালাপোড়া আর দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া।”
শোনার সাথে সাথে ভিজে উঠতে চাইল ইসাবেলা’র চোখ জোড়া; তারপরেও ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইল।
“এই উপসর্গগুলোই ধীরে ধীরে রূপ নেবে মাথা ঘোরানো। ঘেমে যাওয়া, হার্টের ব্যথা, পাকস্থলী খামচেধরাসহ বমি আর ডায়রিয়া’তে সাথে শুরু হবে চোখ, নাক, মুখ আর যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্তপাত। প্যারালাইসিস হয়ে যাওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর কারণ হবে শ্বাসতন্ত্রের অকার্যকারীতা সেন্ট্রাল নাভার্স সিস্টেমের ক্ষতি করবে সিনডেক্স।”
