“না” ভাঙ্গা গলায় জানালেন শাসা। “না” বঁড়শিটা নিয়ে ডেকের উপর ফেলে দিলেন; মন খারাপ করে তাকিয়ে রইল ডে’কের নাবিক। এতক্ষণ ধরে মাছটার জন্য প্রায় শাসা’র মতই পরিশ্রম করেছে সকলে।
কিন্তু এতে কিছু যায় আসে না। পরে সবাইকে বুঝিয়ে বলবেন যে স্বাধীন একটা মাছের গায়ে লাঠির বঁড়শি ফেলা ঠিক না। যে মুহূর্তে মারলিন হুকটাকে ছুঁড়ে ফেলেছে সে মুহূতেই লড়াইয়ে জিতেও গেছে। এখন এটাকে মেরে ফেললে সেটা খেলুড়ে সুলভ হবে না।
দেহের ওজন আর ধরে রাখতে পারছে না তার পা। হাঁটু ভেঙে বসে পড়ালেন শাসা। স্টার্নের কাছেই ভেসে রইল মারলিন। একটু কাত হয়ে মারলিনের কুচকুচে কালো পিঠের পাখনাটা স্পর্শ করলেন শাসা। প্রান্তগুলো প্রায় তরবারির মতই ধারালো।
“ওয়েল ডান ফিশ” ফিসফিস করে উঠলেন শাসা। নিজের স্বেদবিন্দুর লবণ আর জলে ভরে উঠল চোখ। “ফাইট একটা দেখিয়েছে বটে।”
এমনভাবে মারলিনের পিঠে হাত বোলালেন যেন কোনো সুন্দরী রমণী শাসার স্পর্শে যেন প্রাণ ফিরে পেল মারলিন। লেজটা আরো দ্রুত নাড়তে শুরু করল। নিঃশ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে সরে পড়ল।
প্রায় আধা মাইল পর্যন্ত মারলিনকে অনুসরণ করল লে বনহুর। রেইলের কিনারে হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন শাসা আর এলসা। তাকিয়ে দেখলেন আস্তে আস্তে শক্তি ফিরে এসেছে বিশাল মারলিনের দেহে।
নিজের মহিমা দেখিয়ে পানির গভীরে চলে গেল মারলিন। বহু নিচে নিয়ে গেল অন্ধকার একটা ছায়া। চলে গেছে মারলিন।
দীর্ঘ পথটুকু পাড়ি দিয়ে আবারো বন্দরে ফিরে এলো লে বনহুর। পুরো পথটুকু জুড়েই কাছাকাছি বসে রইলেন শাসা আর এলসা। মন ভরে উপভোগ করলেন দ্বীপের সৌন্দর্য আর মাঝে মাঝে এক কী দু’বার একে অন্যের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসলেন যেন দু’জনেই পড়তে পেরেছেন দু’জনের হৃদয়ের কথা।
ব্ল্যাক রিভার হারবারে লে বনহুর ফিরে আসতে আসতে ড’কে চলে এলো অন্য নৌকাগুলো। ক্লাবহাউজের সামনে টাঙ্গিয়ে রাখা হয়েছে। দুটো মৃত মার্লিনের দেহ। তবে কোনটাই শাসা’র হৃত মাছের অর্ধেকও নয়। চারপাশে জটলা করছে মানুষ। বঁড়শি নিয়ে পোজ দিচ্ছেন সফল অ্যাংলার। বোর্ডে লেখা হয়েছে তাঁদের নাম আর মার্লিনের ওজন। পোর্ট লুইসের ইন্ডিয়ান ফটোগ্রাফার ট্রাইপডের উপর উপুড় হয়ে তুলছে বিজয়ীদের ছবি।
“কখনো চাওনি যে তোমার মাছটাও এখানে ঝোলানো থাকুক?” জানতে চাইলেন এলসা।
“জীবিত থাকলেই তো মারলিনকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর দেখায়।” বিড়বিড় করে উঠলেন মাসা। “আর মারা গেলেই কুৎসিত হয়ে যায়।” মাথা নেড়ে জানালেন, “আমার মার্লিন এর চেয়ে বেশি কিছুরই যোগ্য।”
“আর তুমিও।” পথ দেখিয়ে শাসা’কে ক্লাব হাউজের বারে নিয়ে গেলেন এলসা। বুড়োদের মতো খানিক শক্ত হয়ে হাঁটলেও কেমন একটা অদ্ভুত গর্ব অনুভব করছেন শাসা।
গ্রিন, আইল্যান্ড রাম আর লাইমের অর্ডার দিলেন এলসা। “এবারে নিশ্চয় বাড়ি ফিরে যাবার শক্তি পাবে, তাইনা?” ভালোবেসে ভর্ৎসনা করে উঠলেন পিগটেলি।
বাড়ি মানে মেইসন ডেস্ আলিজেস ট্রেডইউন্ডস্ হাউজ। প্রায় শত বছর আগে নির্মাণ করে গেছে এক ফরাসী ব্যারন। শাসা’র আর্কিটেক্টের দল এটির পুনর্সংস্কার করলেও প্রাচীন আবহ পুরোপুরি বজায় রেখেছে।
বিশ একর বিস্তৃত বাগানের মাঝে চকচকে ওয়েডিং কেকের মতো লাগে পুরো দালান। ব্যারনের ট্রপিক্যাল গাছ সগ্রহের আগ্রহকে টিকিয়ে রেখেছেন শাসা। এসব গাছের মাঝে শাসা’র অন্যতম গর্ব হল রয়্যাল ভিক্টোরিয়া ওয়াটার লিলিস। ফিশ পন্ডে ভাসমান ওয়াটার লিলি’র পাতাগুলোর চার ফুট চওড়া আর কিনারের কাছটা বাঁকানো। ফুল’তো ঠিক যেন একটা মানুষের মাথা। এত বড় সাইজ।
ব্ল্যাক রিভার হারবার থেকে মাত্র বিশ মিনিট ড্রাইভ করলেই মেইসনে পৌঁছে যাওয়া যায়। গাছের চাঁদোয়ার নিচ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে ফিরতে গিয়ে শাসা বলে উঠলেন, “ওয়েল, বাকি দলটাও মনে হচ্ছে নিরাপদে পৌঁছে গেছে।”
হাউজের মেইন পোর্টালের সামনের ড্রাইভওয়েতে দেখা গেল ডজন খানেক পার্ক করা গাড়ি। এলসা’র পার্সোনাল জে’টে করে জুরিখ থেকে এসেছেন দুইজন ইঞ্জিনিয়ার। পিগটেলি কেমিক্যালস এর টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হিসেবে সিনডেক্স-২৫ এর প্ল্যান্টের নকশা’ও উনারাই করবেন। জার্মান ডিরেক্টর ওয়ার্নার স্টলজ’র সাথে ইউরোপে দেখা করেছেন শাসা।
এই সম্মেলনে যোগ দিতে জোহানেসবার্গ থেকে উড়ে এসেছেন ক্যাপরিক কেমিক্যালস’র টেকনিক্যাল ডিরেকটর আর ইঞ্জিনিয়ারদের দল। এর মালিক কোর্টনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল হোল্ডিংস।
ট্রান্সভ্যালের জার্মিস্টন শহরের কাছেই রয়েছে এ কোম্পানির প্রধান প্ল্যান্ট। বর্তমান প্ল্যান্টের অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি অংশ তৈরি করা হয় উচ্চ পর্যায়ের বিষাক্ত কীটনাশক। কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে বড় করার মতো যথেষ্ট জায়গা খালি পড়ে থাকায় লোকচক্ষুর অন্তরালে স্থাপন করা হবে সিনডেক্স প্ল্যান্ট।
পিগটেলি আর ক্যাপরিকর্নের প্রতিনিধিরা এই নতুন প্ল্যান্টের ব্লু-প্রিন্ট আর প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে আলোচনা করতেই এখানে জড়ো হয়েছেন। তাই সঙ্গত কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকাতে মিটিংটা করা হচ্ছে না; কিংবা এলসাও এও চেয়েছেন যেন তার কোনো স্টাফ প্ল্যান্টে নাই যাক; যাতে করে পিগটেলিকে কোনো ভাবেই দোষারোপ করা না যায়।
