“আচ্ছা বলতো তো” এক চোখ ভর্তি আকুতি নিয়ে এলসা’র দিকে তাকালেন শাসা,
“এসবের কোনো দরকার আছে?”
“কারণ তুমি যে একটা পাগল। আর পুরুষদেরকে কিছু কাজ করতেই হয়।” ভোয়ালে দিয়ে শাসা’র মুখে ঘাম মুছে কি করলেন এলসা; বোঝাই যাচ্ছে শাসা’কে নিয়ে কতটা গর্বিত বোধ করছেন।
তৃতীয় ঘণ্টার মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে দ্বিতীয়বার সুযোগ পেলেন শাসা। কেমন যেন অসাড় হয়ে হালকা হয়ে গেল পা; টের পেলেন না কোমরের ব্যথা। ফুটবোর্ডের উপর যেন দৃঢ়ভাবে গেঁথে গেল পা।
“তো ঠিক আছে”, মোলায়েম স্বরে বলে উঠলেন শাসা, “এবারে তোমার পালা শেষ। এখন আমার টান এসেছে।” বুঝতে পারলেন দুর্বল হয়ে পড়েছে মার্লিন।
চাঙ্গা হয়ে উঠলেন শাসা, “তো বাছা, এখন তো তুমিও ব্যথা পাচ্ছো তাই না?” লাইন টেনে টেনে রীলের গায়ে পেঁচাতে গিয়ে বানিয়ে ফেললেন চারটা কয়েল। জানেন এবার আর ছুটবে না লাইন। অবশেষে মারলিনকে বাগে পেয়েছেন।
চতুর্থ ঘণ্টা শেষে একেবারেই কাবু হয়ে গেল মারলিন। শুধু তিনশ ফুট গভীর চক্কর কেটে চলল বেচারা। কাঁধের কাছে প্রায় চার ফুট চওড়া মাছটার ওজন হবে এক টনের চার ভাগের তিন ভাগ। আধা অন্ধকারে ওপালের মতো জ্বলছে চোখ। দেহ ছড়াচ্ছে লাইলাক আর নীল রঙা শিখা।
ফাইটিং চেয়ারে কুঁজো হয়ে বসে আছেন শাসা কোর্টনি। পা ভাঁজ করে আবার মেলে ধরতেই নিজেকে মনে হলো আথ্রাইটিসের রোগী। প্রতিটি নড়াচড়ার সাথে টের পাচ্ছেন ব্যথা।
মাছ আর মানুষ মিলে ভয়ংকর এক লড়াই করেছে শেষাংশে পৌঁছে। খুব দ্রুত দু’বার লাইন গুটিয়ে নিলেন শাসা। মাছটার প্রতিটা চক্করের সাথে একটু একটু করে লাইন টেনে আনলেও ব্যথা আর ঘামে সিক্ত হয়ে গেছে শরীর। তবুও টের পাচ্ছেন যে শেষ হয়ে আসছে এই প্রতীক্ষা। বুকের মাঝে লাফাচ্ছে হৃদপিণ্ড; মেরুদণ্ডে যেন আগুন জ্বলছে। ভেতরে মনে হচ্ছে কোন একটা বিস্ফোরণ ঘটে যাবে; তারপরেও সর্বশেষ শক্তি দিয়ে মারলিনকে দিলেন টান।
“প্লিজ” ফিসফিস করে উঠলেন শাসা।
“তুমি আমাদের দুজনকেই মেরে ফেলছ। এবার ক্ষান্ত দাও, প্লিজ।”
আবারো লাইন ধরে টানলেন শাসা; এবারে রণ ভঙ্গ দিল মারলিন। ধীরে ধীরে উঠে এলো ভারী মাছ। স্টার্নের এত কাছে দিয়ে মারলিনের মাথা দেখে শাসা’র মনে হলো ইচ্ছে হলেই বিশাল চোখ দুটোকে ছুঁয়ে দেখা যায়।
আকাশের দিকে নাক উঁচিয়ে মারলিন মাথাটাকে এমনভাবে ঝাঁকুনি দিল যে মনে হলো পানি থেকে উঠে এসে কান ঝাড়ছে একটা স্প্যানিয়েল কুকুর।
পানিতে থেকেই তেকোণাকার বিশাল ঠোঁটটা খুলে মাথা নাড়তে লাগল মারলিন; এতটা ভীষণ শক্তির সামনে অসহায় হয়ে পড়লেন শাসা। কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। হাতের মাঝে ঝাঁকি খাচ্ছে রড।
মারলিনের খোলা চোয়ালের ভেতর বেঁকে যাওয়া বঁড়শি দেখে মন খারাপ করে ফেললেন শাসা।
“স্টপ ইট!” মাছটাকে টেনে ধরতে চাইলেন শাসা। কিন্তু বঁড়শিটাকে ধরার আগেই বার বার পিছলে যাচ্ছে। মারলিন হা করতেই কালো ঠোঁটের গায়ে দেখা গেল হালকাভাবে ঝুলছে বঁড়শি। আরেকটাবার মাথা ঝাঁকালেই স্টিলের দড়ি ছুঁড়ে ফেলে দেবে মারলিন।
চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে নিজের অবশিষ্ট শক্তি জড়ো করলেন শাসা। ফেনার মাঝে সমুদ্রে হারিয়ে গেল মারলিন।
“দড়ি” চিৎকার করে ডে’কের কু’কে ডাকলেন শাসা, “দড়ি ধরো” স্টিলের দড়ি ধর সরাসরি টানলে তবেই যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায় মারলিনের শক্তি!
লড়াইয়ের পুরো চার ঘণ্টাতে স্বয়ং জেলে ব্যতীত আর কারো বঁড়শি কিংবা লাইন ধরার অনুমতি নেই। ইন্টারন্যাশনাল গেম ফিশিং অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করেছে এ নীতি।
কিন্তু মারলিন যাতে হাতছাড়া না হয় তাই কু’দেরকে অনুমতি দেয়া হলো ত্রিশ ফুট স্টিলের পঁড়ি ধরার জন্য।
“দড়ি!” আকুতি জানালেন শাসা। ভারী লেদারের গ্লাভস্ পরে চটপট করে স্টার্নের কাছে চলে গেল নাবিকদের দল।
আবারো উপরে উঠে এলো মারলিন। যেন একটা মরা কাঠ।
“আর একবার উঠে দাঁড়ালেন শাসা। এত হালকাভাবে গেঁথে আছে বঁড়শিটা যে একটু ঝাঁকুনি লাগলেই খুলে গিয়ে মারলিনকে মুক্ত করে দেবে।
ডে’কের উপর এনে রাখা হল স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি বিশাল একটা বঁড়শি। খুলে ফেলা যায় এমন একটা পোলের শেষ মাথায় লাগানো হয়েছে বঁড়শিটা আর একবার মারলিনের কাঁধে বিধিয়ে দিতে পারলেই সব ঝামেলা শেষ।
গ্লাভস্ পরিহিত ক্রু’র হাত মাত্র ছয় ইঞ্চি দূরে থাকতেই শেষবারের মতো লেজের বাড়ি মাল মারলিন; রডের মাথা খানিকটা বেঁকে যেন সম্মতি দিল আর খুলে গেল বঁড়শি-মুক্ত হয়ে গেল মারলিন।
তড়াক করে সোজা হয়ে গেল রঙ আর বঁড়শিটা বাতাসে শিষ কেটে গিয়ে বিধল লে বনহুরের গানওয়েলে। চেয়ারে লাগতেই উলটে পড়ে গেলেন শাসা। মাত্র চল্লিশ ফুট দূরেই সমুদ্রে ভেসে রইল মার্লিন। মুক্তি পাবার পরেও সাঁতার কেটে সরে যাবার শক্তি পাচ্ছে না।
হা হয়ে তাকিয়ে রইল বিস্মিত নাকিবেরা; তবে সবার আগে সম্বিৎ ফিরে পেল স্পিকার মার্টিন। লে বনহুর’কে রিভার্স করে নিয়ে চলল মারলিনের দিকে।
“আমরা এটাকে ধরবোই!”
বঁড়শিযুক্ত লাঠি হাতে থাকা ক্রু’র দিকে তাকিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন-স্কিপার। স্টানের গায়ে ধাক্কা দিচ্ছে মারলিন। রেলিং এর কিনারে দৌড়ে গিয়ে চকচকে বঁড়শিটা মারলিনের পিঠে ছুঁড়ে মারবে –এমন সময় টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ালেন শাসা। সীসার মতো ভারী পা দুটোতে যেন কোনো শক্তিই নেই। কিন্তু ঠিক সময় মতো ধরে ফেললেন নাবিকটার কাধ।
