বেক এনগেজ করতেই প্যাচানো লাইন খানিকটা থেমে গেল। ফটবোর্ডের উপর পা দিয়ে আটকে রাখলেন শাসা। তাড়াতাড়ি চিৎকার করে স্কিপার মাটির্নকে ডাকলেন, “আলেজ গো!”
থ্রটল খুলে দিতেই কালো তেলতেলে ডিজেলের মেঘ একজস্ট থেকে বের হতে লাগল। লাফ দিয়ে আগে বাড়ল লে বনহুর।
বোটের শক্তি আর গতিকে কাজে লাগিয়ে মাছের ভেতরে বঁড়শিটাকে গাঁথার চেষ্টা করলেন শাসা।
“আরেতেজ ভওস! “বঁড়শিটা বিধে গেছে বুঝতে পারলেন শাসা। “স্টপ?” চিৎকার করতেই থ্রটল বন্ধ করে দিলো মার্টিন।
পানির ভেতর স্থির হয়ে রইল লে বনহুর। এখনো ব্রেক থাকায় আটকে আছে রীল।
নিচে হঠাৎ করেই নড়ে উঠল মারলিন।
“এইরে চলে যাচ্ছে!” গর্জন করে উঠলেন শাসা। রীলের রডটা ভেঙে গেছে। আর লাইন ছুটে যাওয়াতে ভড়কে গেছে মাছটা। কোথাও কোনো গণ্ডোগোল হয়েছে বুঝতে পেরে পাগলের মতো দৌড় শুরু করেছে মারলিন। আরো একবার ঝাঁকুনির চোটে নিজের সিট থেকে লাফিয়ে উঠলেন শাসা। বিশাল ফিন-এর পর্যন্ত সহ্য করতে পারল না; ধোঁয়া উঠল রীলের ভেতর থেকে। বীয়ারিভের গ্রিজ গলে গলে পড়তে লাগল।
শরীরের সমস্ত ভার দিয়ে চেয়ারে চেপে বসে রইলেন শাসা। দুই হাত দিয়েও ধরে রাখতে পারছেন না রীল। কসাইয়ের চাকু’র মতই ধারাল ড্যাকরন লাইন- অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে উঠেছে; যে কোনো মুহূর্তে আঙুল কেটে যেতে কিংবা মাংস থেলে যেতে পারে।
কিন্তু বিনা বাধায় ছুটে যাচ্ছে মারলিন। সেকেন্ডের মাঝে পানির ভেতর উধাও হয়ে গেল আধা কি.মি. লাইন।
“হতচ্ছাড়া চায়নাম্যান বাবার বাড়িতে ফিরে যাচ্ছে” দাঁত কিড়মিড় করে উঠলেন শাসা, “মনে হচ্ছে জীবনেও থামানো যাবে না!”
হঠাৎ করেই দু’ভাগ হয়ে গেল মহাসমুদ্রের সাদা জল দেখা দিল মারলিন। মনে হলো সবকিছু স্লো মোশন হয়ে গেছে। লাফ দিয়ে ঠিক যেন আকাশে উঠে গেল মারলিন। সাবমেরিনের মত গা থেকে ছিটকে পড়ল পানির ফোয়ারা। লে বনহুর থেকে পাঁচশ গজ দূরে থাকলেও মনে হলো যেন গোটা আকাশ ঢাকা পড়ে গেল।
“আরেব্বাস, কত বড়! আর্তচিৎকার করে উঠল মার্টিন। শাসা’ও জানেন কথাটা কতটা সত্য-এত বড় মারলিন আগে আর দেখেননি। নীলের ছটায় যেন স্বর্গও আলোচিত হয়ে উঠল।
একইভাবে সমুদ্রের বুকে আঁছড়ে পড়ল মারলিন। চারপাশে শক ওয়েভ ছড়িয়ে চলে গেল, নিজের রাজসিক স্মৃতি রেখে।
রীল থেকে ছুটে যাচ্ছে লাইন। ভারী ব্রেক দেয়া থাকলেও কিছুতেই আটকানো যাচ্ছে না।
‘টার্নি! টর্নি!” ধাতস্থ হতেই আতঙ্কের চিৎকার জুড়ে দিলেন শাসা। স্কিপারের উদ্দেশ্য বলে উঠলেন, “টার্ন অ্যান্ড চেস হিম!”
সর্বশক্তি দিয়ে মারলিনের পিছু নিল লে বনহুরের ইঞ্জিন। বাতাস আর ঢেউ কেটে সাদা ফোয়ারা ছিটিয়ে তরতর করে এগোচ্ছে লে বনহুর।
চেয়ারে বসে সমানে এপাশ ওপাশ করছেন শাসা। শক্ত করে চেয়ারের হাতল ধরে রাখলেও স্থির থাকতে পারছেন না। এদিকে লে বনহুর ফুল থ্রটলে ছুটতে লাগলেও লাইন থামছে না। তাদের চেয়েও দশ নট গতিতে এগিয়ে আছে মারলিন। অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলেন শাসা।
“শাসা!” ব্রিজ থেকে ভেসে এলো এলসার চিৎকার “মারলিন ঘুরে গেছে।” উত্তেজনায় ইতালি ভাষা বলছেন এলসা।
“স্টপ!” স্কিপারের উদ্দেশ্য হাঁক ছাড়লেন শাসা।
কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে ঘুরে গিয়ে নৌকার পেছন দিকে ছুটতে শুরু করল মারলিন।
কোন এক ভাবে পানির ভেতরে লাইন ফাঁস দিয়ে ফেলেছে মারলিন। ঠিক সময়ে ব্যাপারটা দেখতে পেয়েছেন এলসা।
মারলিন নৌকার নিচে আসার আগেই ফাসটাকে খুলতে চাইছেন শাসা। হ্যাঁন্ডেল ঘোরাতে লাগলেন। আস্তে আস্তে ভেজা লাইন উঠে আসছে নৌকার উপরে। লাইনের গিটও উপরে উঠে এসেছে আর একই সময়ে নৌকার নিচে এসেছে মারলিন। আবারো টান টান হয়ে গেল লাইন।
কিন্তু মরিয়া হয়েও রীল আর লাইন টানতে পারছেন না শাসা।
“টার্ন নাউ।” কোন মতে আদেশ দিলেন। খোলা বুক থেকে টপটপ করে ঝড়ে পড়ছে ঘাম। এলসা’র এঁকে দেয়া লিপস্টিকের নকশা ধুয়ে মুছে শটর্সের উপর পড়তে লাগল।
“টার্নং কুইকলি! কুইকলি!”
দ্রুত গতিতে বিপরীত দিকে ছুটে যাচ্ছে মারলিন আর লাইনটা টাইট হতেই লে বনহুরকেও ঘুরিয়ে নিল স্কিপার। রডের মাথায় মাছটার পুরো ওজন পড়াতে ঝড়ে কাত হয়ে থাকা উইলো গাছের মতো বেঁকে গেল রড।
এতক্ষণ কষ্ট করে যতটুকু লাইন গুটিয়ে এনেছিলেন তার সবটুকুই আবার পানিতে টেনে নিয়ে গেল মারলিন। হতাশা ভরে তাকিয়ে রইলেন শাসা।
ঘণ্টা খানেক কেটে গেলেও থামল না এই পিছু নেয়া। ড্যাকরন লাইনের উপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। রীলের উপর চেয়ার রেখে তার উপরে দাঁড়িয়ে পড়লেন শাসা।
বালতি থেকে নোনা জল নিয়ে শাসা’র কাঁধে ছিটিয়ে দিল এক ত্রু। কোমরের কাছে হার্নেসের নাইলন’কে পেঁচিয়ে নিয়েছেন শাসা; ফলে টাইট হয়ে বসে যাওয়া জায়গাটার চামড়া কেটে রক্ত বের হতে লাগল। মাছটার ছোটার সাথে সাথে গম্ভীর হচ্ছে ক্ষত।
দ্বিতীয় ঘণ্টা হলো আরো বিভীষিকাময়। মারলিনের ছোটার গতি একটুও ক্ষীণ হলো না। শাসা’র মাথা বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝড়ে পড়ছে। ব্রিজ থেকে নিচে নেমে এলেন এলসা; হার্নেস আর শাসা’র রক্তাক্ত কোমরের মাঝে কুশন। রেখে একমুঠো সল্ট ট্যাবলেট খাইয়ে দিলেন; সাথে দু’ক্যান কোক। মুখের উপর ক্যান ধরতেই ঢকঢক করে খেয়ে নিলেন শাসা।
