এরপর উঠে দাঁড়িয়ে কু’র দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন শাসা গানওয়েলের পাশে হাঁটু গেড়ে পাশ দিয়ে ছেড়ে দিল বোনিতো। মুক্তি পাবার সাথে সাথে ডারকন লাইন নিয়ে পালিয়ে গেল বোনিতো। হারিয়ে গেল গভীর নীল মহাসমুদ্রের মাঝে।
ফাইটিং চেয়ারে পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন শাসা। ফিন-এর টাইকুন রীল মেরিন গ্রেড অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি হয়েছে। পাঁচ কিলো ওজনের রীলটাতে জড়ানো আছে এক কি.মি’র বেশি ডারকনলাইন। হিস হিস শব্দে রীল থেকে ছুটে যাচ্ছে লাইন। বোনিততর সাথে সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে সমুদ্রের বুক। টেনশন কমাতে আঙুলের ডগা দিয়ে লাইন স্পর্শ করলেন শাসা।
প্রতি পঞ্চাশ গজ পরপর সিল্কের সুতা দিয়ে মুড়ে রাখা হয়েছে লাইন। একশ গজ ছাড়ার পর রীলের লিভার টেনে দিলেন।
এরই মাঝে লাইনকে সেপারেট রাখা আর মারলিন গেঁথে গেল টেনে তোলার জন্য বিশ ফুট লম্বা আউটরিগার বের করে আনল নৌকার ত্রু। কিন্তু চিৎকার করে উঠলেন শাসা,
“না, এটাকে আমিই ধরবো।”
ফাঁদের গভীরতা আর ড্রপ ব্যাকের সম্পর্কে জানার জন্য এর চেয়ে ভালো আর কোনো উপায় নেই। তবে এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য। অভিজ্ঞতা আর সামর্থ্য।
খুব সাবধানে রীল থেকে একশ ফুট লাইন বের করে ডেকের উপর পেঁচিয়ে রেখে দিলেন শাসা। তারপর সে বনহুর’র স্টার্নে গিয়ে চিৎকার করে ডাকলেন স্কিপারকে “আলিজ!”
স্পিপার গিয়ার লিভার এনগেজ করে দিতেই প্রপেলার অলসভাবে ঘোরা শুরু করল। ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগোতে লাগল লে বনহুর।
ধীরে ধীরে হাঁটার গতিতে বেড়ে চলল স্পিড। শাসা’র হাতে ধরা লাইনের ওজনও বেড়ে গেল। বেল্ট বাঁধা কুকুরের মতো বোটটাকে অনুসরণ করছে বোনিতো। পানিতে লাইনের অ্যাংগেল দেখে গভীরতা আন্দাজ করে নিলেন শাসা। তিনি মাছের অবস্থাও বলে দিতে পারবেন লেজের বাড়ি, টার্ন কিংবা ডাইভ দেখে।
মিনিট খানেকের মাঝেই হাতে ঝি ঝি ধরে গেলেও পাত্তা দিলেন না শাসা। বরঞ্চ ব্রিজে ডেকে পাঠালেন এলসা’কে : “তোমার কালা যাদু আরেকবার দেখাও তো পাখি।”
“এটা শুধু একবারই কাজ করে।” মাথা নাড়লেন এলসা।” বাকিটা এবার নিজের কাজ নিজেই সামলাও।”
শাসা’র নির্দেশে উত্তর দিকে টার্ন নিল লে বনহুর।
মোড় ঘোরার অর্ধেকে শাসা’র হাতের লাইন টান টান হয়ে পড়ায় দ্রুত সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন শাসা।
“কী হয়েছে?” আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন এলসা।
“বোধহয় কিছু না।” স্বীকার করলেন সমস্ত মনোযোগ দিয়ে লাইনটাকে ধরে আছেন শাসা।
আবারো টান পড়লেও এবার বদলে গেল বোনিতো’র আচরণ। সমানে খাবি খাচ্ছে, ডাইভ দিচ্ছে, ঘুরে যেতে চাইছে; কিন্তু সামনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে লে বনহুর।
“অ্যাটেনশন!” নাবিকদেরকে সতর্ক করে দিলেন শাসা।
“কী হচ্ছে?” আবারো জানতে চাইলেন এলসা।”
“কিছু একটা বোনিতো’কে ভয় দেখাচ্ছে” উত্তর দিলেন শাসা, “নিচে মাছটা কিছু দেখেছে।”
ঠিক যেন উপলব্ধি করতে পারছেন গভীর মহাসমুদ্রের নিচে দানবীয় ছায়া দেখে আঁতকে উঠা ছোট্ট মাছটার ভয়। কিন্তু বোনিতো’র হাবভাব দেখে হয়ত সাথে সাথে চলে যাবে মারলিন। মিনিট কেটে গেল। তারপর আরেক মিনিট। উত্তেজনায় শক্ত হয়ে বসে আছেন শাসা।
হঠাৎ করেই আঙুলের ফাঁক গলে চলে যেতে শুরু করল লাইন। মুহূর্ত খানেকের জন্য বিশাল মাছটার ওজন অনুভব করলেন শাসা।
মাথার উপর দু’হাত তুলে গর্জন করে উঠলেন, “স্ট্রাইক! স্টপ ইঞ্জিনস?”
বাধ্য ছেলের মতো গিয়ার লিভার নিউট্রাল করে দিল স্কিপার। পানির মাঝে স্থির হয়ে গেল লে বনহুর। লাইনটাকে তুলে পরীক্ষা করলেন শাসা। জীবনের কোনো চিহ্নই নেই-মার্লিনের এক আঘাতেই মৃত্যুবরণ করেছে বোনিতে।
কল্পনার চোখে যেন পুরো দৃশ্যটাই দেখতে পেয়েছেন শাসা। বোনিতো’কে। মেরে চারপাশে চক্কর দিচ্ছে মার্লিন। এখন প্রয়োজন হচ্ছে লাইনটাকে একেবারে নাড়াচাড়া না করা; যেন ভয় পেয়ে পালিয়ে না যায় মার্লিন।
সেকেন্ডগুলো যেন হয়ে উঠল অনন্তকাল।
“মার্লিন নিশ্চয়ই আরেকবার চক্কর মারতে আসছে।” কিছুই না ঘটাতে নিজেই নিজেকে উৎসাহ দিচ্ছেন শাসা।
স্কিপার কিছু একটা বলতেই খেঁকিয়ে উঠলেন।
হঠাৎ করেই আঙুলের নিচে কেঁপে উঠল লাইন। স্বস্তির চোটে চিৎকার দিয়ে উঠলেন শাসা,
“ওই তো আছে! এখনো আছে।”
হাততালি দিয়ে উঠলেন এলসা, “মাছটাকে খেয়ে ফেল মার্লিন, মিষ্টি মাছটাকে খেয়ে ফেল।”
মাঝে মাঝেই আলতোভাবে দুলে উঠছে লাইন। আঙুলের ফাঁক দিয়ে আরো কয়েক ইঞ্চি ছেড়ে দিলেন শাসা। মানস চক্ষে দেখতে পাচ্ছেন বোনিতো’কে গিলে খাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মারলিন।
“ও যেন বঁড়শিটা না দেখতে পায়।” মনে মনে প্রার্থনা করে ফেললেন শাসা। বোনিতো’র মাথার ভেতর গেঁথে যাওয়া হুক এতক্ষণ মার্লিনের পেটে চলে যাওয়ার কথা; কিন্তু যদি তা না হয়-আর ভাবতে চাইলেন না শাসা।
খানিকক্ষণ কেটে যাবার পর আবার নড়ে উঠল লাইন।
“টোপটা গিলে ফেলেছে” উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন শাসা। ডেক থেকে আড়কাঠের উপর দিয়ে একের পর এক লাইন চলে যাচ্ছে পানিতে।
সুইভেল চেয়ারে বসে ঝাঁকুনি খেলেন শাসা। ফিন-এর রীলের হার্নেশ চেয়ারের সাথে পেঁচিয়ে আরেকটু হলেই পাঁচশ ফুট নিচে ফেলে দিচ্ছিল তাঁকে। শুধু নিজের ব্যালান্স আর শক্তির ভারে টিকে গেলেন শাসা। নতুবা হাজার পাউন্ডের বেশি ওজনের মাছটা মেরিন ডিজেল ইঞ্জিনের মতো টেনে নিয়ে জাহাজের পাশ দিয়ে টুপ করে শাসা’কে পানিতে ফেলে দিলেও কেউ টের পেত না।
