কিন্তু তার আগেই কোমরের কাছে ধরা এফএন থেকে ফায়ার করল শন্। গুলি গিয়ে লাগল গেরিলা’র মুখে। টসটসে পাকা একটা তরমুজের মতো করে বিস্ফোরিত হয়ে গেল পুরো চেহারা। অসাড় আঙুল থেকে পড়ে গেল তোকারেভ।
আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ এক মুহূর্ত মৃতদেহটার দিকে তাকিয়ে রইলেন রোল্যান্ড। ঝাঁকি খাচ্ছে লোকটার পা; ভয়ংকরভাবে ফুলে উঠা চোখ দু’টোতে দেখছেন নিজের মৃত্যুযন্ত্রণা।
দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে শনে’র দিকে তাকালেন।
“তোমার কাছে ঋণী হয়ে গেলাম। আস্তে করে বলে উঠলেন রোল্যান্ড। “যখন ইচ্ছে চেয়ে নিও।” এরপরই অন্যদিকে ঘুরে চিৎকার করে স্কাউটদেরকে বিভিন্ন আদেশ দিলেন। মাথার উপর ঘুরতে থাকা অ্যালোয়েট থেকে নেমে এলো সবুজ রঙা বডি ব্যাগস।
***
৭. আগ্নেয়গিরির কালো লাভা
এখন চার মাইল দূরত্ব হলেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আগ্নেয়গিরির কালো লাভা দিয়ে তৈরি লে মর্ন ব্রাব্যান্ট পর্বত মালার সুউচ্চ চূড়া। মরিশাস দ্বীপের চারপাশে বসে চলা স্বচ্ছ নীল জলের প্রবাহ এমন এক সমৃদ্ধিশালী মেরিন লাইফের সৃষ্টি করেছে যে দুনিয়া জোড়া মৎস্য প্রেমিদের কাছে এ জায়গা “হটস্পট।” ছিপ দিয়ে মাছ ধরার জন্য এমন দ্বিতীয়টি নেই।
শাসা কোর্টনি সবসময় দ্বীপের পূর্ব-পরিচিত ক্রু আর একই বোটংকেই চার্টার করতে পছন্দ করেন। ইঞ্জিনে প্রপেলার আর হাল মিলিয়ে পানিতে প্রতিটি নৌকার আছে নিজস্ব এক ছন্দ, যা মাছের ঝাককে আকর্ষণও করতে পারে আবার তাড়িয়েও দিতে পারে।
লে বনহুর এরকম একটি ভাগ্যবান নৌকা। এর স্কিপারের চোখ দুটো ঠিক সামুদ্রিক পাখি গ্যানিটের মতোই শ্যেন। এক মাইল দূর থেকে দেখলেও চিনে ফেলে দশ কিলো ওজনের মার্লিন।
কিন্তু আজ কী যে হয়েছে, টোপের মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে কেটে গেছে দুই ঘণ্টা।
ভারত মহাসাগরের চারপাশে আজ থিকথিক করছে মাছের আঁক। জেলেদের জীবনে এ এক ট্র্যাজেডি মাখা দিন; যখন আশেপাশে ঘুরে বেড়ায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত ছোট ছোট মাছ। লে বনহুর ক্রুদের ফেলে রাখা পালক লাগানো বঁড়শিটা এগুলোর নজরেই পড়ছে না, ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে ঝকের মাঝে ঢুকে পড়া দানবীয় মাছগুলোর হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য।
ডেকের পনের ফুট উপরের ঝুলন্ত ব্রিজে দাঁড়িয়ে নিচের স্বচ্ছ পানি পরিষ্কারভাবেই দেখতে পাচ্ছেন শাসা। লে বনহুরের পাশ দিয়ে ছোটাছুটি করা মাছের ঝাঁক দেখে প্রায় আকুতির মতো করে বলে উঠলেন, “আমাদের একটা দরকার শুধু, একটা টোপ ফেলার মাছ। গ্যারান্টি দিচ্ছি যে মার্লিন ধরা পড়বেই।
তাঁর সাথে পাশেই ব্রিজের রেইলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এলসা পিগটেলি। পরনে রক্তলাল সংক্ষিপ্ত বিকিনি; মোলায়েম দেহতত্ত্ব দেখে মনে হচ্ছে যেন সদ্য ওভেন থেকে বের করে আনা হানি ব্রেড।
“দেখো!” এলসার চিৎকার শুনে একেবারে সময় মতো মাথা ঘোরালেন শাসা। লে বনহুরের পাশে চক্কর কাটছে একটা মার্লিন। পানি কেটে এত দ্রুত বেগে চলে গেল যে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল বোনিত ঝক। সূঁচালো মুখটা পুরোপুরি একটা বেস বল ব্যাট। ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া গায়ের রঙ ইলেকট্রিক ব্লু আর লাইল্যাক হয়ে যেন আকাশের নীলের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
“কত্ত বড় আর সুন্দর!” হা হা করে উঠল শাসার অন্তর।
কামানের গোলার মতো পানি কেটে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে বিশাল মার্লিন।
“একটা টোপ!” মনে হলো যেন তছনছ হয়ে গেছে জীবন; এমনভাবে মুষড়ে পড়লেন শাসা।
“আমার পুরো রাজ্য দিয়ে দেব একটা টোপ পেলে।”
দিগন্তে ছড়িয়ে থাকা আরো আধ ডজন নৌকার অবস্থাও এক জাহাজের রেডিও’তে শোনা যাচ্ছে স্কিপারদের হতাশা ভরা কণ্ঠস্বর। কারো কাছে কোনো ফাঁদ নেই; অথচ সুইসাইডের জন্য অপেক্ষা করছে মার্লিন।
“আমি কী করব?” জানতে চাইল এলসা, “তুমি কী চাও আমি আমার যাদু দেখাই?”
“ঠিক হবে কিনা জানি না” হেসে ফেললেন শাসা, “কিন্তু আমি রাজি, দেখাও তোমার যাদু সুন্দরী!”।
পার্স খুলে লিপস্টিক হাতে নিলেন এলসা। “এ্যাবড়া কা জ্যাবড়া, এ্যাবড়া কা জ্যাবড়া!” ভক্তি ভরে মন্ত্র উচ্চারণ করে শাসা’র নগ্ন বুকে রক্তরাঙা হায়ারোগ্লিফিক আঁকলেন এলসা; আপন মনেই বিড়বিড় করতে লাগলেন কোনো মন্ত্র।
“ওহ ইয়েস! আই লাভ ইট।” অট্টহাসি দিয়ে উঠলেন শাসা, “আমার মনে হচ্ছে সত্যিই কাজ হবে! কী বলো?”
“তোমাকে বিশ্বাস করতেই হবে।” সাবধান করে দিলেন এলসা, “নতুবা যাদু কাজ করবে না।”
‘বিশ্বাস করছি বাবা!”
হঠাৎ করেই নিচ থেকে শোনা গেল এক নাবিকের চিৎকার। ছোট্ট একটা বঁড়শিতে আটকা পড়েছে মাছ।
হাসি মুছে গেল শাসা’র মুখ থেকে; মুহূর্তখানিক অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন এলসা’র দিকে। “ধুত্তোরি, তুমি তো দেখছি সত্যি একটা ডাইনি।” বিড়বিড় করতে করতে সিঁড়ির দিকে দৌড়ে গেলেন শাসা।
তড়পাতে থাকা বোনিতো’কে আদর করে হাতের মাঝে ধরে রেখেছে এক ক্রু। বুকের কাছে ঝাপটে ধরে রাখায় সুবিধে করতে পারছে না মাছটা। স্বস্তি পেলেন শাসা; চোয়ালের কাছে আটকে আছে বঁড়শি। ফুলকার কোনো ক্ষতি হয়নি।
বঁড়শিটা খুলে ফেলে ক্রু’কে আদেশ দিলেন, “টার্ন হিম!” উল্টো করেই ধরতেই সাথে সাথে স্থির হয়ে গেল বোনিতো/ টুনি মাছ।
সার্জনের মতো করে টোপ ফেলার যন্ত্রপাতি মেলে বসলেন শাসা। কাপড়ে ফুল তোলার লম্বা হুক নিয়ে সাবধানে ঢুকিয়ে দিলেন বোনিতো’র চোখের গহ্বরে। আইবলটা একপাশে সরিয়ে দিলেও একটু’ও কোনো ক্ষতি করল না হুক। মাছের খুলি ভেদ করে বিপরীত দিকের চোখের একই অংশ দিয়ে বের হয়ে এলো সুই। ১২০ পাউন্ড ড্যাকরন লাইন দিয়ে আটকে দিলেন বোনিতো’র চোখ। এরপর তুলে নিলেন বিশাল ১২/০ মারলিন হুক। কয়েকবার ফাঁস লাগিয়ে গিটের মতো আটকে দিলেন বোনিতো’র চোখে, জীবিত মাছের দৃষ্টিশক্তিও অক্ষুণ্ণই রইল বলা চলে।
