বুকে চিনচিনে ব্যথা হওয়ায় পাজরের ক্ষত সামলাতে হাফ ডজন কোডেইন ট্যাবলেট গিলে নিল শন। মাতাতু’র সাথে হামাগুড়ি দিয়ে তাকিয়ে আছে পাঁচশ ফুট নিচের জঙ্গলের দিকে। এমনিতে উচ্চতা ভীতি থাকলেও এরকম উত্তেজনার মুহূর্তে সবকিছু ভুলে যায় ডোরোবো ট্র্যাকার।
এখন তো খোলা হ্যাচের এতটাই কিনারে চলে গেছে যে কোমর ধরে রেখেছে শন্ যেন আবার টুপ করে পড়ে না যায়। নাকের নিচে পাখির গন্ধ পেলে যেভাবে কেঁপে উঠে শিকারী কুকুর, ঠিক সেভাবেই কাঁপছে মাতাতু।
হঠাৎ করেই কিছু একটা ইশারা করতে, ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ারকে হাঁক দিল। শন, “দশ ডিগ্রি বামে ঘুরে যান।”
ইন্টারকমে পাইলটকে জানিয়ে দিল ইঞ্জিনিয়ার।
মাতাতু’র কথা মতো পশ্চিমে ঘুরে গেলেও নিচে তাকিয়ে চোখে পড়ার মতো কিছুই দেখতে পেল না শন। একইরকম পাথুরে একঘেয়ে বনানী।
কিন্তু দু’মিনিট পরেই আবারো মাতাতু’র ইশারা মতো নির্দেশ দিল শন। “পাঁচ ডিগ্রী ডানে ঘুরে যাও।”
বাধ্য ছেলের মতো ঘুরে গেল অ্যালোয়েট। নিজের যাদু দেখাচ্ছে মাতাতু। পাঁচশ ফুট উপর থেকে গাছের চাঁদোয়া ভেদ করে কাউকে দেখা না গেলেও ঠিকই টের পাচ্ছে মাতাতু; আর বিগত বছরগুলোতে আরো শ’খানেক সফলতার নজির না থাকলে অন্ধের মতো এরকম বিশ্বাস করত না শন।
মাস্টারের দিকে তাকিয়ে হাসছে মাতাতু; উত্তেজনায় তির তির করে কাঁপছে ঠোঁট; গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে চোখ ভর্তি জল।
“নিচে!” আবারো ইশারা করল মাতাতু।
“ডাউন!” ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ারকে আদেশ দিয়েই রোলান্ড ব্যালানটাইনের দিকে তাকালো শন্।
“হট গানস!” নিজের লোকদেরকে সিগন্যাল দিলেন রোলান্ড। শক্ত বেঞ্চের উপর সোজা হয়ে বসে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হয়ে গেল সকলে। যার যার অস্ত্র তুলে নিয়ে লক অ্যান্ড লোড করে নিল প্রত্যেকে।
খটখটে শুকনো মাটির ছয় ফুট উপরে চক্কর কাটতে লাগল হেলিকপ্টার। একসাথে লাফিয়ে নামল শন আর মাতাতু। ক্লিয়ার করে ফেলল ড্রপ জোন।
কাভার দিয়ে কাঁধে এফ এন ঝুলিয়ে চারপাশে ঝোঁপ দেখে নিচ্ছে শন। হ্যাচওয়ে থেকে নেমে এলো একের পর এক স্কাউট। নাক ঘুরিয়ে চলে গেল শূন্য হেলিকপ্টার।
সেকেন্ডের মাঝেই সৈন্যরা যার যার পজিশন নিয়ে নিল হাতমুঠি করে শন’কে সিগন্যাল দিলেন রোল্যান্ড, “গো!”
খানিক দূরত্ব বজায় রেখে একসাথে আগে বাড়ল শন আর মাতাতু। ছড়িয়ে পড়ে কাভার দিল স্কাউটেরা সকলেরই সবকটি আঙুল ট্রিগারে প্রস্তুত। ফানেলা আকৃতির খাড়া পাথরের ঢালে পথ দেখিয়ে নিয়ে এলো মাতাতু। বহু শতাব্দীর ঝড়-জল এসে তৈরি করে দিয়েছে প্রাকৃতিক সিঁড়ি। আর হাতির পাল নিয়মিত যাতায়াত করা’তে মাটিও প্রায় সমান হয়ে গেছে।
আঙুল ভাঁজ করে পূর্ব দিকে এগিয়ে যাবার জন্য শনের মতো দক্ষ ট্র্যাকারই প্রয়োজন এখন।
সূর্যের আলোয় আড়াআড়িভাবে এগিয়ে যাচ্ছে শন। পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে নিচে; মাটির দিকে। জানে ওকে কাভার দিচ্ছে বিশ্বস্ত স্কাউটেরা; শন্ নিজে ওদেরকে ট্রেনিং দিয়েছে।
কিছু একটা খুঁজে পেতেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল সারা দেহে। গোলাকার একটা পাথর নিজ জায়গা থেকে খানিকটা সরে পড়েছে। তবে তৎক্ষণাৎ মাতাতু’কে ডাকল না শন।
“আগে আমি চেক করে দেখি; নয়ত সপ্তাহভর ক্ষেপাতে থাকবে পিচ্ছি। শয়তানটা?”
তার মাথার সমান সাইজের বোল্ডারটা আঙুলের টোকা দিতেই নড়ে উঠল। তার মানে এরই মাঝে অন্য কেউ এসেও একটাকে নাড়িয়ে গেছে। হুইসেল দিতেই আলাদীনের দৈত্যের মতো এসে হাজির মাতাতু। কিছুই বলতে হয়নি, যা দেখার দেখে বুঝে গেল মাতাতু।
নিজেদের পায়ের ছাপ ঢাকতে সন্ত্রাসীর দল পাথরের বোল্ডারগুলোকে ব্যবহার করলেও কেউ একজনের ভারে জায়গা থেকে খানিকটা সরে গেছে একটা পাথর।
ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে আগে বাড় মাতাতু। শখানেক কদম গিয়েই সাদা বালিতে দেখতে পেল পায়ের ছাপ। নির্ঘাৎ পা হড়কে পড়ে গিয়েছিল আহত কেউ। রঙের এই তারতম্য শুধু দক্ষ কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে বালির আর্দ্রতা, সূর্যের তাপ, হাওয়ার গতি আর সবচেয়ে বড় কথা সময়।
“দুই ঘণ্টা” ঘোষণা করল মাতাতু। বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিল শন।
“আমরা ওদের চেয়ে দুই ঘণ্টা পিছিয়ে আছি।” রোলান্ডকে রিপোর্ট করল শন।
“কিভাবে বুঝতে পারল?” বিস্ময়ে মাথা নাড়ছেন রোল্যান্ড। “এখানে নিয়ে এলো তারপর সময়টাও ঠিকঠাক বলে দিল। পনের মিনিটে আট ঘণ্টার কাজ এগিয়ে দিয়েছে। কিভাবে শন?”
“বাজি ধরুন” একমত হলো শন।
“ও হচ্ছে একটা চকলেট মোড়া যাদুকর। অলৌকিক সবকিছুই ওর জানা আছে।”
“আবারো কি স্প্রিং হেয়ার খেলতে হবে?” রোল্যান্ড সোয়াহিলি না জানায় ভাষান্তর করে দিল শন।
খুশি খুশি মাথা নাড়ল মাতাতু। কর্নেলের প্রশংসা পেয়ে তো বেজায় খুশি।
“মাটিতে অনুসরণের জন্য চারজন রেখে যান।” পরামর্শ দিল শন। “জলের রেখা ধরে গেলে উপরে গিয়ে পায়ের ছাপ খুঁজে পাবার জোর সম্ভাবনা আছে।”
রোলান্ডের আদেশ পেয়ে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে গেল চারজন স্কাউট। হেলিকপ্টার আসতেই চড়ে বসল শসহ বাকি সৈন্য।
আবার উত্তরমুখে উড়ে চলল অ্যালোয়েট। কিন্তু দশ মিনিট যেতে না যেতেই শনের হাত ধরে টান দিল মাতাতু, “টার্ন! টার্ন ব্যাক!”
শনের আদেশ মতো আকাশেই ঘুরে গেল হেলিকপ্টার, খোলা হ্যাচ থেকে প্রায় ঝুলে কেবল এপাশ ওপাশ মাথা নাড়াচ্ছে আর এই প্রথমবারের মতো দ্বিধা দেখা গেল ডোয়রীবো ট্র্যাকারের চোখে।
